রিডিং রুমলেখালেখি

কবি নজরুল কেন এত আনন্দের সাথে নিজেকে কাফের ঘোষণা করেছিলেন?

“আজ আমি এই মজলিসে আমার আনন্দবার্তা ঘোষণা করছি। আজ আমি দেখছি এখানে মুসলমানের নতুন অভিযাত্রা শুরু হয়েছে। এত দিন আমি মনে করতাম আমি একাই কাফের। কিন্তু আজ দেখে আমি আশ্বস্ত হলাম যে, আনোয়ারুল কাদীর প্রমুখ গুণী ব্যক্তি দেখছি আস্ত কাফের, এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর আমি চাই না”- কাজী নজরুল ইসলাম। কবি নজরুল কেন এত আনন্দের সাথে নিজেকে কাফের ঘোষণা করছেন? সেটা জানার আগে চলুন একজন শিক্ষকের সাথে পরিচিত হওয়া যাক।

আপনার বয়স এখন কত? যার কথা বলছি তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র চার বছর। এই চার বছরেই তিনি জন্ম দিয়েছিলেন এক নতুন যুগের। মাত্র ২৩ বছর বয়সে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে অকাল মৃত্যুর আগে তিনি আমূল বদলে দিয়ে গেলেন ভারতবর্ষের, বিশেষ করে বাঙালির চিন্তা পদ্ধতির ইতিহাস। মানুষটির নাম হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। কলকাতার এক ফিরিঙ্গি পরিবারে জন্ম তাঁর। ১৮২৬ সালে তিনি কলকাতার হিন্দু কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। চার বছর শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়টুকুতেই তিনি ছাত্রদের যুক্তিবাদী চিন্তায় দীক্ষিত করেন। পরিণত হন জীবন্ত কিংবদন্তীতে!

কলকাতার রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি স্বাভাবিক ভাবেই। সে সময় কলকাতার সুবিধাপ্রাপ্ত অংশটিই পড়াশুনার সুযোগ পেত। এদের পিতারা ছিলেন সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত ক্ষমতাবান অংশ। তাদের ছেলেরা এই মাথানষ্ট শিক্ষকের পাল্লায় পড়ে বিগরে যাচ্ছে, ধর্ম-আচার- সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এটা স্বাভাবিক ভাবেই সমাজের গাত্রদাহের কারণ হবে। ডিরোজিও তাঁর ছাত্রদের নিয়ে পাঠচক্র করতেন, সেখানে আলোচনা হত আধুনিক যুক্তিবাদী দর্শন নিয়ে। তিনি তাদের পড়তে দিতেন টমাস পেইনেরেই ‘এইজ অফ রিজন’, ‘কমনসেন্স’, ‘রাইটস অফ ম্যান’। ডিরোজিও নিজেও ছিলেন সুলেখক এবং কবি।

হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও
হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও

তাঁর ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ছাত্ররা পরিচিত হয় ‘ইয়ং বেঙ্গল’ নামে। ইয়ং বেঙ্গলরা নিজেরা সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে পরিণত হয়েছিল সমাজের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে। যদিও এরা যেহেতু ছিল বয়সে তরুণ এবং নতুন নতুন শিখেছিল যুক্তিবাদী দর্শন- তাই অনেকাংশেই তাদের প্রচার এবং প্রকাশ ছিল কিছুটা উগ্র। সমাজকে আলোকিত করার থেকে সমাজকে আঘাত করাই ছিল তাদের স্বাভাবিক তারুণ্যের বৈশিষ্ট্য। যেমন ইয়ং বেঙ্গলরা উন্মুক্ত ভাবে গরুর মাংস রান্না করে সেটা খেয়েছিল বলে কথিত আছে, এটা নিঃসন্দেহে সেই সময়ের অতিরক্ষণশীল সমাজের জন্য ছিল বিশাল আঘাত!

যদিও ডিরোজিও এই বাড়াবাড়ি উচ্ছলতার থেকে বেশি চেয়েছিলেন তরুণদের যুক্তিবাদে আলোকিত করতে, বুদ্ধির মুক্তি ঘটাতে। ইয়ং বেঙ্গলরা যাই করুক, তারাই যুক্তিবাদের প্রচারণা চালায়, পত্রিকা প্রকাশ করে এবং এদের অনেকে লেখনীর মাধ্যমে ধর্ম সংস্কারকে যুক্তির আঁচড়ে ক্ষত বিক্ষত করে। ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গলই দলগত ভাবে এই অঞ্চলের প্রথম বুদ্ধি মুক্তির আন্দোলন। সমসাময়িক সময়ে রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও তাঁদের কাজ এবং লেখনীর মাধ্যমে যুক্তিবাদ এবং ধর্মের উপরে মানবতার প্রচার ও প্রসার ঘটানোতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে গেছেন। যদিও এসব মুক্ত বুদ্ধির আন্দোলন থেকে বঙ্গীয় মুসলমান সমাজ ছিল বহু বহু দূরে।

ডিরোজিও হিন্দু কলেজে যোগদেন ১৮২৬ সালে। এর ঠিক একশ বছর পর, ১৯২৬ সালে, মুসলমান সমাজে প্রথমবারের মত মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ এবং মানবতাবাদের চর্চা শুরু হয়। এ সময় ‘শিখা’ গোষ্ঠী ‘বুদ্ধির মুক্তি’ নাম দিয়ে এই আন্দোলন শুরু করেন। কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হোসেনের নেতৃত্বে জন্ম হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজের। এদের প্রকাশিত পত্রিকার নাম ছিল ‘শিখা’, যার ট্যাগ লাইন ছিল- “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।” কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহার হোসেন চৌধুরী, কাজী আনোয়ারুল কাদীর এই গোষ্ঠীর সাথে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন। যদিও আবুল হোসেনই ছিল এই গোষ্ঠীর মূল পুরোধা। তিনি ইসলাম থেকে প্রেরণা নিয়েছিলেন কিন্তু যুক্তি ও বিচার বিশ্লেষণ পরিহার করেননি। সেই সময়ে বসে তিনি এমন সব উক্তি করেছিলেন যা এখনকার সময়ে তাঁর মৃত্যুর কারণ তো হতই, সেই সময়েও সৃষ্টি করেছিল নানা বিপদের। এমনকি তাঁর দু একটি কথা আমি যদি এই লেখাতে উদ্ধৃত করি, তা আমার বিপদেরও কারণ হতে পারে!

কবি আবুল হোসেন
কবি আবুল হোসেন

১৯২৭ সালে ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে কাজী আবদুল ওদুদ ‘বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য সমস্যা’ এবং কাজী আনোয়ারুল কাদীর ‘বাঙালি মুসলমানদের সামাজিক গলদ’ নামে প্রবন্ধ পাঠ করেন। এই সমাবেশে কলকাতা থেকে এসেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। লেখার শুরুতে উদ্ধৃত বক্তব্যটি তিনি সেখানেই দিয়েছিলেন।

এই আন্দোলনের আরেকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব কাজী মোতাহার হোসেন। যার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনেক্স ভবনের নামকরণ করা হয়েছে। মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় কার্যবিবরণীতে তিনি লেখেন, “প্রত্যেক জাতি এবং প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী আপন ধর্মবিশ্বাসকে শ্রেষ্ঠতম এবং একমাত্র সত্য বলিয়া বিশ্বাস করে। বাস্তবিক পক্ষে ধর্ম মানুষের একটি মূল বৃত্তি, কিন্তু মনে রাখতে হইবে, এই মৌলিক ধর্মবৃত্তি বা প্রেরণা হইতে যে দর্শন, যে থিওরি এবং যে ধর্মকাহিনীর সৃষ্টি হইয়াছে তাহা মানুষ্যরচিত এবং প্রত্যেক দেশের ধর্মবিশ্বাস সেই দেশের জ্ঞানের পরিধি দ্বারা সীমাবদ্ধ।”

শিখা গোষ্ঠীর প্রায় সকলের নামের সাথে আমরা পরিচিত। এদের অনেক উক্তি আমরা রচনায় ব্যবহার করি (অবশ্যই ‘নির্দোষ’ উক্তি), এদের নাম- বইয়ের নাম আমরা বিসিএস বা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সময় মুখস্ত করি, এদের অনেকের লেখা আমরা ক্লাসের বাংলা বইয়ে পড়েছি (সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত রূপে) এবং ঢাবি ছাত্র মাত্রই তো কাজী মোতাহার হোসেনের নাম জানে। কিন্তু তাঁদের চিন্তা ভাবনার সিকি ভাগও আমরা ধারণ করিনা, চর্চা করাতো দূরের ব্যাপার।

বাঙালি মুসলিম সমাজে বা বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলে মুক্তবুদ্ধির চর্চাটা কোন নতুন ব্যাপার নয়। বা ফেসবুক ব্লগের অবদান নয়। আমাদের এখানেই জন্মেছিল এ অঞ্চলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর। বদ্ধ অন্ধকার সমাজের ভিতরে বাস করেও পুরুষতান্ত্রিকতা আর ধর্মকে প্রশ্ন করেছিলেন বেগম রোকেয়া। লিখেছেন, “আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলোকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। ঐ ধর্মগ্রন্থ গুলো পুরুষ রচিত বিধিব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। আরো দেখ, যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ় সেইখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক, যেখানে ধর্মবন্ধন শিথিল সেখানে সেখানে রমণী প্রায় পুরুষের ন্যায় উন্নত।” আমাদের জাতীয় কবি নজরুল (যাকে মোল্লারা ঘোষণা করেছিল কাফের হিসেবে) ঘোষণা করেছিলেন- “মূর্খরা সব শোন, মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন…”

বেগম রোকেয়া
বেগম রোকেয়া

এই যদি হয় আমাদের পূর্বসূরীদের দেখানো পথ, তাঁদের যুক্তিবাদী চিন্তা চেতনার সাহসী প্রকাশ, সেখানে আমাদের অবস্থাটা কতটা নীম্নগামী সেটা ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে। অথচ আমরা যেন যাত্রা করেছি উল্টো পথে। হুমায়ুন আজাদ স্যার থেকে শুরু করে অভিজিৎ দা এবং আরো অনেক নিকটজনকে, অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিভাবানকে হারাতে হয়েছে আমাদের, কেবলমাত্র মুক্তচিন্তার ‘অপরাধে’। ক্রমাগত নৃশংস হত্যা আর সরকারের প্রবর্তিত বিভিন্ন দমনমূলক আইন আমাদের কলম থামিয়ে দিয়েছে। এখন ব্লগ ফেসবুকে আগের মত দারুন সব লেখা দেখা যায়না। আবেগ সুড়সুড়ি দেয়া স্বস্তা লেখার লেখকরা আমাদের ভবিষ্যতের লেখক সমাজের তারকা। সুন্দর ভাষায় তারা লেখে অপযুক্তি, অপবিজ্ঞান, অন্ধ ক্ষতিকর বিশ্বাস আর পুরুষতান্ত্রিক লেখা। অথচ হায়, আমাদের চিন্তার জগৎটা আরো পরিপক্ক হতে পারতো স্রেফ আমরা যদি আমাদের পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করতাম। কেবল অনুসরণ করতাম নজরুল, রোকেয়া, আরজ আলীক মাতুব্বরদের।

জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ‘মুক্তিবুদ্ধি চর্চা’ নামে প্রবন্ধে লিখেছেন, “যে কোনো বিশ্বাস, অন্ধ হলেও, মানুষের মনে শান্তি ও সাহসের যোগান দিতে পারে কিন্তু তা হয় ক্ষণস্থায়ী, ভঙ্গুর এবং প্রবঞ্চক। সমাজকে এগিয়ে যেতে হলে মানুষকে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দিতেই হবে। কোনো কিছু প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়, এটা আন্তরিক ভাবে মানতে হবে।” তিনি আরো লেখেন- “যখন বিশ্বাস এবং বিচারবুদ্ধির মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় তখন মানুষ কী করবে? শান্তি ও স্বস্তির খোঁজে সে কি অন্ধবিশ্বাসের শৃঙ্খলে নিজেকে বন্দী করে বুদ্ধির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে? অথবা সে কি অজ্ঞেয়বাদী হয়ে উঠবে? আপাতত সে এই পৃথিবীতে মানুষের মঙ্গল নিয়েই ভাববে ও তার জন্য কাজ করবে।বৃহত্তম সংখ্যক মানুষের সর্বোত্তম কল্যাণসাধনের জন্য কাজ করাই হবে তার আদর্শ।” (২০০৪)

কবীর চৌধুরীর শেষ কথাটুকুও যদি আমরা মেনে চলি তাহলে আমাদের মধ্য থেকে অনেক বিদ্বেষ, অনেক সমস্যা দূর হবে। আমাদের চিন্তা হবে স্বচ্ছ, সৃষ্টি হবে আত্মবিশ্বাস। আমাদের সবার আগে চর্চা করতে হবে সহনশীলতার। এই উপমহাদেশের মানুষের অগ্রগতির পথে সব থেকে বড় বাঁধা হয়ে আছে ধর্ম বিশ্বাসের বাড়াবাড়ি, ধর্মান্ধতা এবং মৌলবাদ। যুক্তিবাদ চর্চা এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানবিকতার চর্চা ছাড়া এই অঞ্চলের মানুষের উন্নতির দ্বিতীয় কোন পথ খোলা নেই। এই চর্চা ছাড়া বড়জোর আমরা পয়সা ওয়ালা বর্বর হতে পারবো, কিন্তু সেটাই যদি হব- তবে মানুষ হয়ে জন্মানো কেন?

সূত্র এবং আরো পড়ার ইচ্ছা থাকলে-

১। ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্ট ও ডিরোজিও- বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত,
২। শিখা পত্রিকা সংকলন- বাংলা একাডেমি,
৩। শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ- কবীর চৌধুরী-কথা প্রকাশ,
৪। সংস্কৃতি কথা- মোতাহার হোসেন চৌধুরী। এছাড়াও আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন- এদের প্রত্যেকের প্রবন্ধ সংকলন সহজলভ্য।

আরও পড়ুন-

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button