মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

কাশ্মির ইস্যু ও আমাদের মায়াকান্না!

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত করে কাশ্মিরকে দ্বিখণ্ডিত করে কেন্দ্রশাসিত একটা প্রদেশে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেছে, আগামীকাল সেটা সংসদে পাশও হয়ে যাবে। কাশ্মির ভালো নেই, ভূস্বর্গ নামে যে জায়গাটাকে সবাই জানে, সেখানকার মানুষগুলো ভালো নেই- এটা সবাই জানে। তবে কাশ্মিরকে নিয়ে খুব বেশি হাহাকার করারও কিছু দেখছি না আসলে। ৩৭০ ধারা বিলোপের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কাশ্মিরের সবশেষ স্বকীয়তাটুকুই কেড়ে নেয়া হলো শুধু, এর বেশিকিছু নয়। কাশ্মিরকে তো এই বিজেপি সরকার সহ, ভারতের বিগত সরকারগুলো প্রতিনিয়তই গলাটিপে মেরেছে, এ আর নতুন কি!

৩৭০ ধারা নিয়েই যেহেতু মূল আলোচনা, শুরুতে একটু জেনে নেয়া যাক, এই ধারাটা আসলে কি, কি আছে এখানে? সংবিধানের এই ধারাটা কাশ্মিরকে ভারতের বিশেষ রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কাশ্মিরের নিজস্ব পতাকা ছিল এতদিন, ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়ার ফলে সেটা আর থাকবে না। কাশ্মিরের প্রতিরক্ষা, বিদেশ, অর্থ এবং যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনও বিষয়ে জম্মু-কাশ্মীরে হস্তক্ষেপের অধিকার ছিল না কেন্দ্রীয় সরকারের, এখন থেকে তারা কাশ্মিরের সব ব্যাপারেই নাক গলাতে পারবে। অবশ্য সেটা এতদিন ধরেও গলানো হয়েছে, আইনগুলো বহাল ছিল শুধু কাজীর কেতাবেই।

কাশ্মিরের নাগরিকেরা দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবিধা ভোগ করতেন এতদিন, তারা কাশ্মিরের নাগরিক ছিলেন, পাশাপাশি ভারতেরও। এখন থেকে তারা শুধু ভারতীয় নাগরিক হিসেবেই গণ্য হবেন। কাশ্মির এখন থেকে আর মূখ্যমন্ত্রী নয়, সরাসরি দিল্লি থেকে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে শাসিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর বাছাই করা দুজন বিশেষ প্রতিনিধি কাশ্মির ভেঙে ভাগ হওয়া দুটো অংশ (জুম্মু-কাশ্মির এবং লেহ) শাসন করবেন।

ধারা ৩৭০ এর কথা এলে ৩৫-এ অনুচ্ছেদের কথাও আসবে। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদটিও কাশ্মিরী নাগরিকদের কিছু বাড়তি সুবিধার জোগান দিতো, এখন থেকে সেটিও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এতদিন কাশ্মিরের স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া আর কেউ কাশ্মিরে জমি কিনতে পারতেন না, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলতে পারতেন না, এমনকি জুম্মু-কাশ্মির প্রদেশের সরকারী কোন চাকুরিতেও কাশ্মিরের বাইরের কেউ আবেদন করতে পারতেন না। এখন থেকে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের বাসিন্দারাও কাশ্মরে এসে জমিজমা কিনতে পারবেন, চাকরির জন্যে আবেদন করতে পারবেন।

কাশ্মিরী নারীরা অন্য প্রদেশের পুরুষদের বিয়ে করলে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতেন, ৩৫-এ অনুচ্ছেদে এই বিষয়ে সুস্পষ্ঠভাবে আইন করে দেয়া ছিল। এখন সেই বিধিনিষেধটিও আর কার্যকর থাকবে না। বিজেপি সরকারের ভাষ্যমতে, কাশ্মিরকে ভারতের মূল স্রোতে অন্তর্ভূক্ত করার জন্যেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তবে কাশ্মিরীরা ভারতের মূল স্রোতে অন্তর্ভূক্ত হতে চায় কিনা, সেটা কেউ জানার চেষ্টা করেনি। তাই তো প্যারামিলটারি দিয়ে পুরো উপত্যকা ঢেকে ফেলে, মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে, সাংবাদিকদের ঢুকতে না দিয়ে, বিরোধী নেতাদের গ্রেফতার করে কাশ্মির থেকে কয়েকশো মাইল দূরে দিল্লিতে বসে পাশ করিয়ে নেয়া হচ্ছে এসব আইন।

৩৭০ ধারা বাতিলের ফলে কাশ্মিরে খুব আহামরি কোন পরিবর্তন আসবে না। কাশ্মিরের কিশোরেরা পাথরের জায়গায় হাতে বইখাতা তুলে নেবে না, সেখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতির কোন উন্নতি হবে না। কাশ্মির হচ্ছে বড়সড় একটা মূলার নাম, যে মূলাটাকে দেশপ্রেম আর পাকিস্তান বিরোধীতার মোড়কে মুড়িয়ে সবাই ক্ষমতায় বসতে চায়। আর তাই কাশ্মির ইস্যুটারও কখনও সমাধান হবে না, বদলাবে না কাশ্মিরের সাধারণ মানুষের ভাগ্য।

তবে ক্ষতির মধ্যে যেটা হবে, উত্তর ভারত থেকে দলে দলে পাঞ্জাবী, মাড়োয়াড়ি আর গুজরাটি ব্যবসায়ীরা গিয়ে ভীড় জমাবে উপত্যকায়। সেখানে তারা জমিজমা কিনবে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসবে। আর কাশ্মির যেহেতু ভারতের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ট্যুরিস্ট স্পট, ট্যুরিজমটাকেই তারা উপজীব্য করবে। হয়তো বিশ বছর পরে কাশ্মিরের বুকে কাশ্মিরীরাই সংখ্যালঘু জাতিতে পরিণত হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে আমরা যেভাবে সেখানকার আদিবাসীদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করেছি।

কাশ্মিরের ৩৭০ ধারা খর্বে বাঙালীদের কারো কারো ভীষণ মায়াকান্না দেখতে পাচ্ছি চারপাশে। ভারত কাশ্মিরের সঙ্গে যেটা করেছে, আমরাও একই কাজটাই করে চলেছি পাহাড়ে। পাহাড় আমাদের কাছে বিনোদনের জায়গা, সেখানে আমরা ছুটি কাটাতে যাই। পাহাড় মানে ফেসবুক-ইনস্ট্যাগ্রামের সবুজে ঢাকা ছবি, সঙ্গে দু-লাইনের ক্যাপশন। অথচ সেই সবুজের ভীড়ে হাজারো আদিবাসী পরিবারের কান্না কিংবা তাদের বেদনার্ত নীল দীর্ঘশ্বাসের রঙগুলো আমাদের চোখে ধরা পড়ে না।

এক সাজেককে বিনোদনকেন্দ্র বানাতে গিয়ে কত আদিবাসী পরিবারকে যে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে গহীন অরণ্যে চলে যেতে হয়েছে, তার খোঁজ আমরা ক’জন রাখি? কাপ্তাই লেক থেকে শুরু করে বান্দরবানের নীলগিরি, নীলাচল- সবগুলো ট্যুরিস্ট স্পটে কান পাতলেই আদিবাসীদের দুঃখগাঁথা শোনা যাবে, যদি শোনার মতো কান আর অনুভব করার মতো হৃদয় থাকে। অত্যাচারী এক জাতির অংশীদার হয়ে কাশ্মিরের ওপর কি জুলুম চলছে, সেটা নিয়ে নিউজফিড গরম করাটা হিপোক্রেসি ছাড়া আর কিছুই নয়।

Image Source- Anandabazar Patrika

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button