এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

কাশ্মীর- পৃথিবীর স্বর্গ যেভাবে হলো নারকীয় যুদ্ধক্ষেত্র!

১৮৪৬ সাল। ব্রিটিশরা শাসন করছে ভারতবর্ষ। কিন্তু জম্মু কাশ্মীরের এলাকাগুলোতে ছিল শিখদের প্রতাপ। ব্রিটিশরা ১৮৪৫ সালে শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। গভর্নর হেনরি হার্ডিঞ্জ ঘোষিত শিখদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে শিখরা পরাজিত হয়। শিখদের অধীনস্থ হয়েও গুলাব সিং শিখদের পক্ষে কোনো সাহায্যে এগিয়ে যাননি। ফলে শিখদের পরাজিত করতে সুবিধাই হয় ব্রিটিশদের। সেবছর অমৃতসরে একটি চুক্তি হলো৷ পুরস্কার স্বরুপ, চুক্তির মাধ্যমে জম্মু কাশ্মীর সহ লাদাখ, পুঞ্চ, গিলগিত ও বালতিস্তান অঞ্চলের জমিদারি পান জম্মু অঞ্চলের রাজা গুলাব সিং। ৭৫ লাখ রুপির বিনিময়ে ব্রিটিশরা এই অঞ্চল বিক্রি করে গুলাব সিংয়ের কাছে। অঞ্চলের রাজা হলেন তিনি।

তিনি গোলামিস্বরুপ কথা দিলেন, ব্রিটিশদের শ্রেষ্ঠত্ব মানবেন এবং ব্রিটিশদের বছরে আনুগত্য হিসেবে ১টি ঘোড়া, ১২টি ছাগল ও তিনজোড়া কাশ্মিরী শাল প্রদান করবেন ব্রিটিশ সরকারকে। তারপর থেকে, গুলাব সিংয়ের অধীনে পুরো অঞ্চলকে কাগজে কলমে বলা হয়, ‘জম্মু এন্ড কাশ্মীর’ রাজ্য। সংক্ষেপে প্রচলিত হয়ে যায় কাশ্মীর নামে। যদিও, জম্মু এবং কাশ্মীর দুইটি আলাদা অঞ্চল। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে সমতলে ছোট ছোট পাহাড়, উপত্যকা সমৃদ্ধ অঞ্চলের নাম জম্মু। আর কাশ্মীর হলো, হিমালয়ের মধ্যে মাঝারি পর্বত সমৃদ্ধ একটি উপত্যকা। কাশ্মীরের সাধারণ জনতা অবশ্য গুলাব সিংয়ের শাসনে সন্তুষ্ট ছিল না কখনো। তাদের উপর বিভিন্ন সময়ে যে নির্যাতন হয় তা আরেকটি ইতিহাস।

একশো বছর পর। ১৯৪৭ সাল। এখন এই অঞ্চলের রাজা হরি সিং। শুরু হলো, দেশভাগের ডামাডোল। দেশভাগের সময় কাশ্মীর নিয়ে ঝামেলা তৈরি হলো। ব্রিটিশদের অধীনে বিভিন্ন স্টেটকে অপশন দেয়া হলো দেশভাগের সময়। তারা ভারতে যাবে নাকি পাকিস্তানে? দেখা গেল সবগুলো ভুখন্ড, ধর্মের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্তানে বিভাজিত হলো।

রাজা হরি সিং

কিন্তু কাশ্মীর, হায়দারাবাদ, জুনগর স্বাধীন থাকতে চাইলো। হায়দারাবাদ ও জুনগর হিন্দু অধ্যুষিত কিন্তু শাসক মুসলমান। জনগণ ভারতে থাকতে চাইলো। ভারতীয় বাহিনী অধীনস্হ করে নিলো এই দুটি এলাকাকে৷ পরে গণভোটের মাধ্যমে ভারতীয় বাহিনীর এই একশন বৈধতা পায়। জনরায় পড়ে ভারতের পক্ষে। অন্যদিকে কাশ্মীর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শাসক হরি সিং হিন্দু। ভৌগলিকভাবেও এই অঞ্চল ভারত, পাকিস্তান উভয় অংশেই পড়ে। এই জটিলতার মধ্যেও এখানে কোনো গণভোট হলো না। কাশ্মীরের ভাগ্য অমীমাংসিত হয়ে রইলো।

পাকিস্থান আশা করেছিল এই রাজ্যটি তাদের সাথে থাকবে। ভারতও আশা করেছিল রাজ্যটি থাকবে তাদের সাথে। ফলে, ভারত এবং পাকিস্থান উভয়পক্ষ কাশ্মীর রাজ্যের দাবি করে। নিজেদের নিয়ন্ত্রণ চায় এই রাজ্যে, কাশ্মীরকে নিজেদের অধীনে রাখবার দাবি জানায়। এই জম্মু এবং কাশ্মীর অঞ্চলের দখল সমস্যা যে যুগের পর যুগ অমীমাংসিত থেকে যাবে তা কে জানত! রাজা হরি সিং চেয়েছিলেন স্বাধীন থাকতে। কোনো অংশেই যুক্ত না হতে।

কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি চুক্তিপত্র পাঠানো হয়। যার নাম ‘স্ট্যান্ডস্টিল’ চুক্তি। চুক্তিতে প্রস্তাব রাখা হয়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবার আগে এই অঞ্চল ভারত পাকিস্তান কারো সাথে যুক্ত হবে না। পাকিস্তান এই চুক্তিতে সম্মত হয়ে স্বাক্ষর করে কিন্তু ভারত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে না। ফলে একটা সংঘাত অনিবার্য তা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়।

দেশভাগের পর ভারত – পাকিস্তান নামক দুইটি স্বাধীন দেশ সৃষ্টি হলো। কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধলো বিভিন্ন এলাকায়৷ কাশ্মীরকেও সেই দাঙ্গা ছুঁয়ে যায়। এমনই এক অবস্থায় দেশভাগের পর অক্টোবর মাসে পাকিস্থানের নর্থ ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট থেকে উপজাতি পাঠানরা কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিতে আসে। স্ট্যান্ডস্টিল চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্থান সরাসরি আক্রমণের অধিকার রাখে না। তাই তারা পাঠানদের দিয়ে আক্রমণ করায়। প্রত্যক্ষ সমর্থন অবশ্য ছিল পাকিস্তানের নিয়মিত বাহিনীরও। ফলে পাকিস্থান জম্মু কাশ্মীরের কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে সমর্থ হয়। বর্তমানে যাকে তারা আজাদ কাশ্মীর বলে, সেই জায়গাটি তখন তারা নিয়ন্ত্রণে নেয়। এখানে রাজার ডিফেন্স ব্যবস্থা দূর্বল ছিল বলে পাকিস্থানি পাঠানরা এই অঞ্চলকে টার্গেট করে এগোয়। ধীরে ধীরে তারা শ্রীনগরের কাছে চলে আসে। যেখানে থাকতেন রাজা নিজেই!

রাজা হরি সিং চিন্তিত হয়ে পড়েন। রাজ্য হাতছাড়া না হওয়ার জন্য তিনি কি করবেন? এমনিতে রাজা হরি সিংয়ের খুব একটা জনপ্রিয়তা ছিল না তখন। জনপ্রিয় ছিলেন রাজ্যের মুসলিম নেতা শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। শেখ আবদুল্লাহর সমর্থন ছিল ভারতের প্রতি। শেখের সমর্থন নিয়ে রাজা হরি সিং ভারতের সাথে শর্তসাপেক্ষে যুক্ত হবার চুক্তি করেন। ইন্সট্রুমেন্ট অব একসেশন অনুযায়ী শর্ত থাকে যে, ভারতের অধীন হলেও রাজা অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব ভোগ করবেন। চুক্তির পর কাশ্মীরে পাকিস্থানি পাঠানদের আক্রমণ ঠেকাতে এগিয়ে আসে ভারতীয় সেনারা।

পাকিস্থান সেইসময় জম্মুর কিছু জেলা, কাশ্মীরের সামান্য অংশ, গিলগিত ও বালতিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে গিলগিত ও বালতিস্তানকে নর্দান এরিয়ায় যুক্ত করার মাধ্যমে এই এলাকা দুটিকে পাকিস্তানের অধীনে নেয়া হয়। অবশিষ্ট অংশকে তারা নাম দেয় আজাদ জম্মু এন্ড কাশ্মীর/ আজাদ কাশ্মীর। রাজনৈতিকভাবে পাকিস্থান জম্মু এন্ড কাশ্মীরের তাদের অংশকে ‘আজাদ’ বলে থাকে। তাদের সংবিধানে এই অংশের ব্যাপারে কোনো উল্লেখ নেই। তাদের অংশের ‘আজাদ’ এর জন্য আলাদা প্রধানমন্ত্রী সহ বিভিন্ন ব্যবস্থা আছে। যদিও এই অঞ্চলের পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে পাকিস্থাননির্ভর। গণমাধ্যমে একারণে এই এলাকাটিকে ‘পাকিস্থান শাসিত কাশ্মীর’ বলা হয়।

এইদিকে ভারত তাদের অংশের জম্মু এন্ড কাশ্মীরকে আলাদা রাজ্য হিসেবেই নিয়ন্ত্রণ করে। ভারতের সংবিধানে এই রাজ্যের জন্য ৩৭০ ধারা নামক আলাদা ধারা আছে। ভারতের সকল মানচিত্রে অবিভক্ত অর্থাৎ রাজা গুলাব সিংয়ের অধীনে যে গোটা অঞ্চল ছিল সেই জম্মু এন্ড কাশ্মীরকে ভারতের অংশ হিসেবে দেখানো হয়৷ ভারত মনে করে পুরো কাশ্মীর তার এবং পাকিস্তানের অধীনে যে অঞ্চল সেটা পাকিস্তানের দখলকৃত।

মানচিত্রে কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা

উল্লেখ্য, কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ যে পাকিস্তান ভারতে তা নয়, চীনের সাথেও এই নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে কিছুটা৷ যদিও তা আলোচনায় আসে কদাচিৎ। রাজা গুলাব সিংয়ের অবিভক্ত জম্মু এন্ড কাশ্মীরের উত্তর দিকের সীমান্ত নিয়ে বিরোধ আছে চীনের সাথে। চীনের অধীনেও আছে অবিভক্ত জম্মু এন্ড কাশ্মীরের কিছু অংশ, যা মূলত গিলগিত, বালতিস্তান ও লাদাখ অঞ্চলের কিছু এলাকা। সেখানে জনবসতি সামান্য বলে সংঘাত নেই তেমন, তাই এখানকার দ্বন্দ্ব কম আলোচিত।

রাজা গুলাব সিংয়ের অবিভক্ত জম্মু এন্ড কাশ্মীরের মোট আয়তন ছিল ২ লাখ ২২ হাজার ২২৬ বর্গ কিলোমিটার। নিয়ন্ত্রণের হিসাবে ভারতের অধীনে আছে মোট ভূমির ৪৫ ভাগ, পাকিস্তানের অধীনে ৩৬ ভাগ এবং অবশিষ্ট ১৯ ভাগ চীনের অধীনে।

যাইহোক, যুদ্ধে ফিরে যাই। কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনী আসবার পর কঠোর অবস্থান নেয়। পাঠানরা পিছু হটতে শুরু করে৷ ভারতীয় বাহিনী যখন ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে শ্রীনগরে নামলো, ২৪ ঘন্টার মধ্যে পাশের গোগো গ্রামে সহিংসতা হয়। মারা যায় ১২ জন মানুষ। সম্ভবত এটিই কাশ্মীরে ভারত-পাকিস্থান যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা। তবে, এই যুদ্ধের যেন আর শেষ নেই। পাকিস্থানিরা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে হিন্দু নিধন কার্যক্রম চালায়, অন্যদিকে ভারত তাদের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বিভিন্ন সময় মুসলিমদের উপর আক্রমণ চালায়। কাশ্মীর তাই এক রক্তাক্ত প্রান্তরের নাম হয়ে উঠে, এখানে কান পাতলে শোনা যায় কান্নার প্রতিধ্বনি। পাকিস্থান ভারত কিংবা তথাকথিত রাজা কারোই মাথাব্যাথা ছিল না কাশ্মীরের মানুষ নিয়ে, তারা চেয়েছে সবসময় নিজেদের ক্ষমতা। ফলে যে রক্তক্ষরণ ৪৭ সালে শুরু হয়েছে, সেই রক্তের ধারা মৃত লাশের মানচিত্র হয়ে একে বেঁকে শুধু বিস্তৃতই হয়েছে, কমেনি কখনো। এখনো কাশ্মীর তাই অমীমাংসিত এক বিবাধ। লোকে বলে, কাশ্মীর নাকি পৃথিবীর স্বর্গ!

কোথায় স্বর্গ?
কোথায় নরক?
কে বলে তা বহুদূর?
মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক
মানুষেতে সুরাসুর…

মানুষের কারণে একটা স্বর্গও কিভাবে নরক হয়ে যেতে পারে, তার করুণ উদাহরণ হয়ে থাকবে কাশ্মীর। কাশ্মীর বিবাদে কেউ পাকিস্তানের পক্ষ নেয়, কেউ ভারতের পক্ষ নেয়। মানুষের পক্ষ নেয় কোনজনা? যে মানুষগুলো মারা যাচ্ছে তারা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে মানুষের চেয়ে নরক তৈরি করার কাজে বেশি এক্সপার্ট কেউ না, সেই মানুষ কোন স্বর্গের আশায় এতরকম বিভাজন করে!!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button