সিনেমা হলের গলি

কার্তিক কলিং কার্তিক- এক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের গল্প!

সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। আমার অনেক পছন্দের সিনেমার ধরণ। তবে হলিউডের সাইকো (১৯৬০), মেমেন্তো (২০০০), দ্য সিক্সথ সেন্স (১৯৯৯), দ্য ম্যাশিনিস্ট (২০০৪), ফাইট ক্লাব (১৯৯৯) এর মতো সাইকোলজিক্যাল সিনেমা বলিউড পাড়ায় দেখিই নি বলা চলে। বলিউডে যেসব সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার আছে সেগুলাতে স্পর্শ আছে হলিউডের। ছায়া আছে ভিনদেশী মৌলিক গল্পের। তবে ‘কার্তিক কলিং কার্তিক’ দেখে থেমে গিয়েছিলাম!

আগ্রহ

২০১০ এর শুরুর দিকের ঘটনা। টিভিতে এই সিনেমার দুইটি গানের প্রোমো দেখে ভিন্ন আমেজ পেলাম।

১. ‘উফ তেরী আদা’ গানটিতে দীপিকা পার্টিতে নাচার জন্য ফারহানকে ডাকে। কিন্তু ফারহানের কেন যেন ‘রোমান্স’ অবশ ছিল। সে দীপিকার ডাকে সাড়া দেয় না। দীপিকা একায় নাচতে থাকে। এর ফাঁকে ফারহানকে কাছে আনার জন্য জাল দিয়ে মাছ ধরার মতো করে একটা অভিনয় করে। এই বিষয়টা খুব মজা লেগেছিলো।

২. ‘হ্যায় ইয়া’ গানে ফারহান আখতার দীপিকাকে ডেটে নিয়ে যেতে ভিন্ন ভিন্ন সব পন্থা অবলম্বন করেন। অবশেষে দীপিকা রাজি হয়ে যায়। সে ডেটের একটা দৃশ্য ছিল- দীপিকা বিড়ি ফুঁকাচ্ছে, পাশে বসা ফারহান দীপিকার মুখ থেকে বিড়ি নিয়ে ফেলায় দিলো। এরপর দীপিকা লিপস্টিক নিয়ে ঠোঁটে লাগাচ্ছে, অন্যমনষ্ক ফারহান আবারো বিড়ি ভেবে ফেলায় দিলো। দুইজনের এক্সপ্রেশন দেখার মতো ছিলো। আর আমার এক্সপ্রেশন, “আরে বাহ! মজার তো।”

গানের দৃশ্যগুলোর পর সিনেমার নাম আসতো ‘কার্তিক কলিং কার্তিক’। সিনেমার নাম দেখেই আমার ভাবনা- কি আর হবে? দুই জমজ ভাই থাকবে। একজন আর একজনকে কল করবে! তারপরেও সিনেমা দেখার আগ্রহ পাই মিস্টার ফারহান আখতার বলে। কেননা ২০০৮ সালে ‘রক অন’ ও ২০০৯ সালে ‘লাক বাই চান্স’ এর মতো ভিন্নধারার দুইটি বলিউড সিনেমা দিয়েছিলেন। দুই খানাই পছন্দের সিনেমার তালিকায় আছে। তাই, ফারহান যে ভিন্নধর্মী কিছু দিবেন সেই বিশ্বাসেই এই সিনেমা দেখতে বসা।

দেখা শুরু করলাম ‘কার্তিক কলিং কার্তিক’। সিনেমা শেষ করলাম আমি কিছুটা হা করে। ইন্টারনেটে খোঁজা শুরু করলাম, এটা কোন সিনেমার ছায়া অবলম্বনে তৈরী? স্ক্রিপ্ট যে বড্ড শক্তিশালী, পারফেক্ট সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। অনেক খুঁজেও কিছুই পেলাম না। পরে জানলাম, ইহা একটি মৌলিক সিনেমা। ভাল লেগেছে বিষয়টা।

কার্তিক কলিং কার্তিক, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, দীপিকা, ফারহান আখতার

২ ঘন্টা ১৫ মিনিটের গল্পের স্পর্শ

আপনি কাউকে ‘না’ করতে পারেন না? 
আপনি চুপচাপ, যার দরূণ সবাই কি আপনাকে ব্যবহার করছে? 
আপনি লজ্জায় পছন্দের মানুষকে ভালোবাসার কথা জানাতে পারছেন না? 
আপনাকে সাহায্য করবে কে? 
আপনাকে বদলাবে কে?

উপরের ঘটনাগুলো সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র কার্তিকের নিত্যদিনের ঘটনা। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন না কার্তিক। দোকানদার থেকে বাড়িওয়ালা, সবাই যেন তার অন্তর্মুখী স্বভাবের ফায়দা নেয়। এভাবে আর কত? একদিন সিদ্ধান্ত নেন সুইসাইড করবেন! কিন্তু সেই রাতেই কার্তিকের ল্যান্ডফোনে একটা কল আসে। ওপাশ থেকে একজন বলে, “আমার নাম কার্তিক”।

এখন দুইটা কার্তিক হয়ে গেলো। আসুন সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র কার্তিককে (ক-১) নাম দেই আর ফোন করা কার্তিককে (ক-২) নাম দেই। কার্তিক (ক-২) বলে তার কথা মতো চললে বদলে যাবে জীবণ দুনিয়ায় বিপর্যস্ত কার্তিকের (ক-১) জীবণ। শুরু হলো পরিবর্তনের গল্প।

কার্তিকের (ক-২) কথা মতো চলতে শুরু করলেন কার্তিক (ক-১)। অফিসের বস থেকে বাড়িওয়ালা সবাই ভিন্ন কার্তিকের (ক-১) ছোঁয়ায় বদলাতে বাধ্য হলেন। ভালোবাসার মানুষ সোনালীকে (দীপিকা) কাছে পেলেন। হ্যাপি এন্ডিং! লা লা লা! চাইলে এই গল্পটুকু দিয়েই সিনেমা বানানো যেত কিন্তু এই সিনেমা যে অন্যরকম, আর দশটা বলিউড সিনেমা থেকে আলাদা। সবকিছু যখন ঠিক তখনই গল্পে শেন ওয়ার্নের স্পিনের মতো বড় টার্ণ। থ্রিলিং মজা তো কেবল শুরু।

কার্তিক (ক-২) প্রতিদিন ভোর ৫ টায় কল করে কার্তিককে (ক-১)। সে জানায়, কোনোদিন যদি কার্তিক (ক-১) কাউকে কার্তিকের (ক-২) কথা বলে, তাহলে জীবণ আবার আগের মতো করে দিবে! কিন্তু একদিন সোনালীকে কাছে পেয়ে আবেগে সব বলে ফেলে কার্তিক (ক-১)। ঘটনা মোর নেয় অন্য দিকে। কার্তিকের (ক-১) জীবণ আবার পূর্বের মতো হয়ে যেতে থাকে। প্রতি রাতের ফোন কল যেন কার্তিকের (ক-১) জীবণকে অতিষ্ট করে ফেলে। সে (ক-১) সিদ্ধান্ত নেয়, এমন এক জায়গায় চলে যাবে যেখানে কেউ তাকে চিনে না, যেখানে থাকবে না কোনো টেলিফোন, আসবে না কোনো কার্তিকের (ক-২) কল! সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রেম-ভালোবাসা, চাকরী সব ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যায় কার্তিক (ক-১)। কিন্তু এরপরেও কি কার্তিকের (ক-২) কাছ থেকে কার্তিকের (ক-১) মুক্তি মিলবে?

সিনেমার ‘তারা’

এই সিনেমার লিখার পাশাপাশি পরিচালনা করেছেন বিজয় লালবানী। সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক এই স্ক্রিপ্ট। যা আপনাকে সিনেমার শেষ দৃশ্য পর্যন্ত ধরে রাখবে। সাথে থ্রিলিং আর টুইস্ট তো আছেই।

সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে একদম যুথসই ছিলেন ফারহান আখতার। অন্তর্মূখী কার্তিকের চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে মোবাইল ফোন বন্ধ করে বাসায় নিজেকে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন তিনি। কিছুদিন এক স্কুলের কক্ষেও ছিলেন। সিনেমায় একটি দৃশ্য ছিল, কার্তিক একবারেই রুবিক’স কিউব সমাধান করে। শুধুমাত্র এই দৃশ্যটির জন্যই রুবিক’স কিউব সমাধান করা শিখেছেন ফারহান। এছাড়া সোনালী চরিত্রে মানিয়ে নিয়েছিলেন দীপিকা। বাকি ছোট ছোট চরিত্রে (রাম কাপুর, ভিপিন শর্মা, শেফালি শাহ) যারা ছিলেন, তারা ছিলেন ঠিকঠাক।

সিনেমার যে দুইটা গানের দৃশ্যের কথা শুরুতে বলেছিলাম, সিনেমা দেখতে গিয়ে সেগুলা যেন ভুলেই গিয়েছিলাম দুর্দান্ত সব দৃশ্যের কারণে। সিনেমাটোগ্রাফি এক কথায় অসাধারণ। ‘ম্যায় মাধুরী দীক্ষিত বান্না চাহতা হু’ সিনেমার সাত বছর পর ‘কার্তিক কলিং কার্তিক’ -এ সিনেমাটোগ্রাফিতে ফিরেছিলেন সানু ভারগেজ।

থ্রিলার সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছিল একদম পারফেক্ট। যা দৃশ্যগুলোকে আরো প্রাণবন্ত করেছে। মিউজিকের দায়িত্বে ছিলেন সংকর-এহসান-লয়। অন্যদিকে সিনেমার গানগুলো লিখেছেন জাবেদ আখতার। ‘উফ তেরী আদা’, ‘হ্যায় ইয়া’ গান দেখে সিনেমা দেখতে বসেছিলাম। সিনেমা শেষ করে টানা শুনেছি কৈলাশ খেরের ‘ক্যায়সি হ্যায় এ উদ্দাসি’। এই গান শুনলে চুপ করে এক দিকে তাকায় থাকতে ইচ্ছে করে।

২০ কোটি বাজেটের সিনেমাটি বক্সঅফিসে আয় করেছিল ২৬ কোটি। কিন্তু কিছু সিনেমাকে আয় দিয়ে বিবেচনা করাটা যে বড্ড বোকামী! ‘কার্তিক কলিং কার্তিক’ নিয়ে বলিউড গর্ব করতে পারবে, যেমনটা পারবে আর এক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘নো স্মোকিং’ (২০০৭) নিয়ে।

একটা কথা না বললেই নয়! আমার কাছে এই সিনেমা একটু বেশিই গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব জীবনে প্রভাব ফেলেছে। আগে কাউকে সহজেই ‘না’ করতে পারতাম না। এই সিনেমা দেখে কৌশল শিখেছি। আপনি এই সমস্যায় ভুগলে কিংবা বলিউডের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের স্বাদ পেতে চাইলে আজই দেখে ফেলুন ‘কার্তিক কলিং কার্তিক’। আর আগে দেখে থাকলে অনুভূতি জানাতে ভুলবেন না।

কৃতজ্ঞতা- ফেসবুক গ্রুপ ‘জাস্ট বলিউড’

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button