সিনেমা হলের গলি

‘বাংলাদেশকে যা চেনার, আমি চিনে নিয়েছি’

অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোন দাবী দাওয়া
এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকে চাওয়া;
মূহুর্ত যায় জন্মের মতো অন্ধ জাতিস্মর,
গত জন্মের ভুলে যাওয়া স্মৃতি বিস্মৃত অক্ষর…

এই গানটা তিনি লিখেছিলেন, সুরও দিয়েছিলেন। গানের কথাগুলোর সাথে কেমন মিলে গেল তার জীবনের একটা অধ্যায়! তবে সেটা না মিলে গেলেই ভীষণ ভালো হতো। অন্তত গুণী এই শিল্পীর সামনে নিজেদের বাংলাদেশী বলে পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ হতো না।

যার কথা বলছি, তার নাম কবীর সুমন। পশ্চিমবঙ্গের কিংবদন্তী শিল্পী-সুরকার। বাংলাদেশ নামের দেশটার প্রতি যিনি মনের গহীন কোণে এতগুলো বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিলেন একটা গোপন অভিমান। কয়েকদিন আগে, সময় টেলিভিশনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে খুলে দিলেন মনের দুয়ার, আর সেই খোলা দ্বার দিয়ে বেরিয়ে এলো অভিমানের দল। স্পষ্ট ভাষায় কবীর সুমন জানিয়ে দিলেন, কখনও বাংলাদেশে আসার ইচ্ছে নেই তার! কেন এই অভিমান? কত বিশাল সেই অভিমানের পাহাড়? সেই উপেক্ষা, অবহেলা আর কষ্টের গল্পটা শোনা যাক কবীর সুমনের মুখেই।

“তখন আমি সুমন চট্টোপাধ্যায় ছিলাম। পরে আমি নাম পরিবর্তন করে কবির সুমন হয়েছি। ১৯৯৬ আর ১৯৯৮ সালে দু’বার, আমি দুটো সঙ্গীত সফর করেছি বাংলাদেশে। দুবারই ঢাকায়, এবং প্রথমবারে চট্টগ্রামেও গিয়েছিলাম। পাঁচটা পাঁচটা করে মোট দশটা শো হয়েছিল দুই সফরে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমাকে ওই শো-গুলো করে চলে আসতে হয়েছিল। এই শো থেকে প্রাপ্ত টাকাটা আমরা তুলেছিলাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্যে।”

“আমি একজন ভারতীয় শিল্পী। বাংলাদেশকে আমি ভালোবাসি, আমার দেশ যদি বাংলাদেশ হতো, আমার খুব ভালো লাগতো। ভারত আমার নিজের দেশ, এই দেশ আমায় খাওয়ায়, এই দেশ আমায় জল দেয়, অসুখ হলে চিকিৎসা দেয়। আলাদা কোন গর্ব আমার ভারতের জন্যে নেই। কিন্ত যে সঙ্গীতটা শিখেছি, সেটা এই মাটিতেই তো শিখেছি। ভারতের একজন শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আমন্ত্রণে আমি দুটো সফরে গিয়েছি, সেখানে গান করেছি, এবং তার বিনিময়ে আমি একটা পয়সাও পারিশ্রমিক নেইনি।”

“সেই দুটো সঙ্গীত সফর থেকে মোট কত টাকা উঠেছে আমি জানি না। প্রবাসী বাঙালীদের একটা পত্রিকায় বলা হয়েছিল, সংখ্যাটা নাকি প্রায় ৫২ লক্ষ টাকা, তোলা হয়েছিল সেই বিশ বছর আগে। একা আমি গান গেয়েছিলাম কিন্ত, আর কেউ ছিল না। এটা আমার ভাবতে খুব গর্ব হয়।”

“এরপরে যখন আমার একবার বাংলাদেশে যাওয়ার কথা উঠলো, আমার সন্তানসম কিছু ছেলেমেয়ে চেষ্টা করলো আমার একটা অনুষ্ঠান আয়োজন করার, ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে। ওরা সব নিয়ম মেনে, সরকারী সব ফীস-টিস দিয়ে হল বুক করলেন, আয়কর ইত্যাদি দিয়ে কাগজপত্রও সব পুরোপুরি তৈরি করা হয়েছিল। আমি ঢাকায় গিয়ে জানতে পারলাম, যে আমাকে ওখানে গান গাইতে দেয়া হবে না। বাংলাদেশের কারা যেন ওখানে পিকেটিং করছেন যে, কবীর সুমন ভারতের শিল্পী, তাকে এখানে গান গাইতে দেয়া হবে না!”

“আমি, এই লোকটা দুটো সঙ্গীত সফর করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্যে টাকা তুলেছিলাম। আমি যদি একটা টাকাও তুলে থাকি, সেটা তো কষ্ট করে তুলেছি। একেকটা শো, অন্তত পৌনে তিনঘন্টা ধরে করেছি আমি। একটা কানাকড়িও তো আমি নেইনি। কোত্থেকে নেবো? এটা তো আমার কর্তব্য! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্যে এইটুকু করতে পারবো না আমি? কিন্ত সেটার প্রতিদান হিসেবে আমাকে ওরা আটকে দিলেন, এবং সেখানে পিকেট করছিলেন তারা। কবীর সুমন নাকি ভারতের! সেই থেকে আমি বাংলাদেশে যাইনি। আর কোনদিন যাবো বলে মনেও হয় না। কেন যাবো? আমি তো ভারতের!”

বাংলাদেশ সরকার ডাকলে কখনও বাংলাদেশে যাবেন? এই প্রশ্নের জবাবে আবারও ক্ষোভ ঝাড়লেন প্রবীণ এই শিল্পী, বললেন- “কেন? কেন যাব? তখন বাংলাদেশ সরকার কি করছিলেন? বা বাংলাদেশের অতগুলো লোক কি করছিলেন? তখন কারো মনে পড়লো না, এই লোকটা ছিয়ানব্বই আর আটানব্বই সালে দু’দফায় এসে গান গেয়ে টাকা তুলে গেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্যে? আমার ভালোবাসার জায়গা থেকেই তো এটা করেছিলাম আমি। বাংলাদেশের মানুষকে আমার সালাম, নমস্কার, বাংলাদেশ আমার ভীষণ আদরের দেশ। কিন্ত যাওয়ার ইচ্ছে নেই।”

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন কবীর সুমন। বাংলাদেশের এই মহানুভবতায় আপ্লুত হয়েছেন তিনি। বারবার সেটা বলেছেনও। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাহায্যার্থে গান গাওয়ার প্রস্তাব পেলে বাংলাদেশে আসবেন কিনা, এই প্রশ্নটাও বাংলাদেশে আসা নিয়ে তার উত্তরে পরিবর্তন আনতে পারেনি। খানিকটা অভিমানের সুরেই বলেছেন- “না, এবারে অন্যান্য শিল্পী আছেন, বাংলাদেশের শিল্পীরা আরও কত বড় শিল্পী, তারা টাকা তুলুক না। আমি আমাদের লাইনের ভাষায় বলছি, দু’বার তো এক ভারতীয় ক্ষ্যাপ মারলো, এবার নাহয় বাংলাদেশীরাই করুক।”

‘একটা অনুষ্ঠানের সব ধরনের অনুমতি থাকার পরেও কিছু ইন্টেলেকচুয়াল মানুষজন আমাকে ‘ভারতীয়’ বানিয়ে দিলেন। আমাকে নাকি শিল্পকলায় গাইতে দেয়া হবে না! দেখুন, আমার বয়স শেষ হয়ে এসেছে, আমি আর বেশীদিন বাঁচবো না, বাচঁতে চাইও না। বাংলাদেশের ভালো হোক, মঙ্গল হোক। কিন্ত বাংলাদেশকে যা চেনার, আমি চিনে নিয়েছি। তবে তারমানে এই নয় যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার কোন বৈরীতা আছে। এই সেদিনও কতদূর থেকে কয়েকজন বাংলাদেশী এখানে এসেছেন আমার গান শুনবেন বলে। এই আবেগ কেবল বাংলাদেশীদের পক্ষেই সম্ভব। বাংলাদেশ আমার বড় আদরের দেশ, কিন্ত যাওয়া বোধহয় আর কখনও হবে না।”

যে মানুষটা বাংলাদেশের জন্যে নিজের দেশ থেকে ছুটে এসেছিলেন, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে টাকা জোগাড় করেছেন এদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্যে, তাকেই আমরা এই বাংলাদেশে গান গাইতে দেইনি। তিনি ভারতীয়, এটা নাকি তার অপরাধ! একারণে তাকে শিল্পকলা একাডেমীতে গাইতে দেয়া হলো না! কিছু অসভ্য মানুষ শিল্পের মাঝেও কাঁটাতারের বেড়া বসিয়ে দিলেন! অথচ ছিয়ানব্বই আর আটানব্বইয়ের সেই দুটো সফরের টাকাগুলো নেয়ার সময় কারো মনে আসেনি যে, কবীর সুমন একজন ‘ভারতীয়’ শিল্পী! আসবে কিভাবে, টাকার তো কোন দেশ হয় না, সীমানা থাকে না!

আমাদের ক্ষমা করবেন কবীর সুমন। আপনার প্রাপ্য সম্মানটা আমরা আপনাকে দিতে পারিনি।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button