সিনেমা হলের গলি

সিনেমা নিয়ে এই হিপোক্রেসির শেষ কোথায়?

বাহুবলি রিলিজের পর Film Companion এর রিভিউতে বলা হয়েছিল- প্রভাস কে এই সিনেমাতে অনেকটাই “গড” বা ঈশ্বরের ভূমিকাতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এরকম আবার হয় নাকি কেউ? আবার আজকে কবির সিং রিলিজের পর বলা হচ্ছে- এই ধরনের ক্যারেক্টার সমাজকে শেষ করে দিবে, নারীদের কোনো সম্মান দিচ্ছে না এই ধরনের ক্যারেক্টার, জাতি আজ কোথায়?

প্রশ্ন হচ্ছে, বাহুবলির মতো “ভাল” ক্যারেক্টার দেখালেও সমস্যা আবার কবির সিং এর মতো “ফ্লড” ক্যারেক্টার দেখালেও সমস্যা- তাহলে দেখাবটা কী সিনেমাতে?

সিনেমাকে সবসময় শিক্ষামূলক হতে হবে আর পৃথিবীর যাবতীয় শিক্ষা সিনেমা থেকেই নিতে হবে, এমনটা কবে থেকে হওয়া শুরু করল? সিনেমার ক্যারেক্টার সবাই ভাল হলেই কি পৃথিবী থেকে যাবতীয় পাপাচার দূর হয়ে যাবে? মানুষ আর অন্যায় করবে না? তাহলে বিখ্যাত কিছু সিনেমা বা গান আমরা “হালাল” উপায়ে রিশ্যুট করে দেখতে পারি। যেমন-

১। শাহরুখ খান- আসসালামুওয়ালাইকুম স্যানোরিটা! বাড়ে বাড়ে দেশ ম্যায় এইসি ছোটি ছোটি বাতে হোতি রেহতি হ্যাঁয়। জাযাকাল্লাহ খায়রান।

২। সালমান খান- (এক থা টাইগারের গান গাইতে গাইতে) মাশাল্লাহ মাশাল্লাহ, ক্যাটরিনা, তোমার রূপ হইসে মাশাল্লাহ। কিন্তু জামাকাপড় নাউজুবিল্লাহ!

এভাবে রিশ্যুট করলে কি কালকে থেকে দুনিয়ার সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে? সিনেমাতে শুধু সাধু সন্ন্যাসীকে দেখাব আমরা, সমাজের কোন নেগেটিভিটি কিছু দেখানো যাবে না? আবার নিজেরাই বলব- সিনেমা সমাজের প্রতিচ্ছবি? আমার খুব প্রিয় একটা সিনেমা হচ্ছে মার্টিন স্করসিসি পরিচালিত রেইজিং বুল। রবার্ট ডি নিরো তার লাইফের অন্যতম সেরা অভিনয় করেছিলেন এই সিনেমাতে।

সিনেমার শুরুর দিকে লাইটিং- আহা! একজন বক্সারের জীবনের সত্যিকারের ঘটনা অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মিত যেখানে রবার্ট ডি নিরো অনেকটাই সেলফ ডেস্ট্রাক্টিভ, স্ত্রীকে সন্দেহ করেন, তার গায়ে হাতে তুলেন- মানে যাতা অবস্থা! সিনেমা রিলিজের পর শুরুর দিকে মিক্সড রিভিউ পেলেও আস্তে আস্তে এটার প্রশংসা বাড়তেই থাকে, এখন এটাকে স্করসিসের ম্যাগনাম ওপাস আর পৃথিবীর নির্মিত অন্যতম সেরা সিনেমার একটা বলা হয়। ফারহান আখতারকে বলা হয়েছিল- কোন সিনেমাটা আপনার জীবন বদলে দিয়েছিল? তিনি এই সিনেমার নাম বলেছিলেন।

এখন এই সিনেমা পছন্দ করার “অপরাধে” ফারহানের এরপরের সমস্ত সিনেমাকে কি ফিল্ম কম্প্যানিয়ন এই বলে ধুয়ে দিবে যে ফারহান “নারীদের উপরে অত্যাচার করা সিনেমা পছন্দ করে! পিডা শালারে!” না, সেটা করবে না, কারণ এটা হলিউডের সিনেমা। হলিউড করলে সব মধু, তখন উল্টো এক্সট্রা ইনফো জানাবে যে এই সিনেমার জন্য নিরো অস্কার পেয়েছিলেন!

অর্জুন রেড্ডি আমাদের আগে থেকেই দেখা, আমরা জানি এই সিনেমার কাহিনী কী, কবির সিং সেটারই অফিশিয়াল রিমেক- এরপরেও আমি কোন আশা নিয়ে হলে ঢুকি যে এটা জীবন বদলায় দেয়া প্রগ্রেসিভ সিনেমা হবে? নিজের মতের সাথে মিললেই কি সেটা প্রগ্রেসিভ সিনেমা? ভীর কি ওয়েডিং এ যা ইচ্ছে তাই করবে আর এই সিনেমার প্রশংসা করে ফেনা তুলে ফেলবে! লিপ্সটিক আন্ডার মাই বুরখাতে একজন নারী একইসময়ে দুইজন পুরুষের সাথে সম্পর্ক করছে যাকে সরাসরি “চিটিং” বলা যায়, অথচ সেই সিনেমার কত ভাল রেটিং ; আর মেয়েদের পিরিয়ড ইস্যু নিয়ে নির্মিত প্যাডম্যানের মতো সুনির্মিত সিনেমাতে ৫ এ মাত্র আড়াই রেটিং?!

আর আপনার যদি কথা বলতেই হয়, তাহলে সব সিনেমা নিয়ে কেন কথা বলেন না? সাঞ্জু সিনেমাতে রনবির কাপুর অবলীলায় বলে যে- ৩০৮ টা মেয়ের সাথে শুইসি, সেফটির জন্য ৩৫০ লিখে রাখেন। মেয়েদের প্রতি এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তৈরি সিনেমার রিভিউ ক্যান দেন না ফিল্ম কম্প্যানিয়ন? ও আচ্ছা, নিজের জামাই বিধু বিনোদ চোপড়ার প্রোডাকশন হাউজের সিনেমা বলে?! বাহ চুতিয়াগিরি!

অর্জুন রেড্ডি দেখে কেউ তালি দিলে তারা নাকি ভয়ংকর, তাদের কাছ থেকে সাবধানে থাকা উচিত। তাহলে সাইলেন্স অফ দ্যা লেম্ব দেখে বা স্কারফেস দেখে যে আমি হপকিন্স আর পাচিনোর প্রেমে পড়লাম- তারমানে কী আমি সাইকো, না খুনি? জন উইকের মতো সিনেমা তাহলে সাধারণ মানুষদের জন্য রিলিজ নিষিদ্ধ করা হোক, শুধুমাত্র জেলখানায় ভয়ংকর খুনিদের দেখানো হোক, না হইলে তো আমরা সবাই খুনি হয়ে যাব!

প্রশ্ন হচ্ছে- কবির সিং এর মতো ক্যারেক্টারকে গ্লোরিফাই করা হচ্ছে কিনা! সিনেমার কোথাও কী বলা হয়েছে বা কবির বলেছে কিনা- মেয়েদের এভাবেই পিটাতে হয়, এভাবে না পিটালে “পুরুষ” হওয়া যায় না- তাইলে নাহয় বুঝতাম আর নিজেই এই সিনেমার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতাম! নিজেকে শেষ করতে করতে একসময় নিজের ভুল বুঝতে পারা আর এতকিছুর পরেও অন্য কোন মেয়ের সাথে সম্পর্কে না জড়িয়ে একবার যাকে ভালবেসেছে সেই মেয়ের স্মৃতি নিয়েই একটা মানুষ প্রায় জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে আছে আর একইসাথে এটাও দেখানো হইসে যে মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান একটা মানুষের কতটা ক্ষতি করে- এমনভাবে যদি আমি সিনেমাটাকে দেখি, তাহলে কি খুব বেশি ভুল কিছু বলা হবে?

রিভিউদাতারা নাকি সিনেমা দেখেই বুঝে ফেলেছেন যে, ডিরেক্টর আসলে সিনেমাতে কী দেখাতে চেয়েছেন, তিনি কতটা নিচু মনের আর নারীদের প্রতি তিনি কতটা বাজে ধারণা পোষণ করেন। এদের জন্যই নাকি সমাজে এত অন্যায়। তাদের জন্য প্রিয় পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের দুটো উক্তি দিয়ে শেষ করছি-

১। সিনেমার কাজ সমাজ পরিবর্তন নয়!
২। The director is the only person who knows what the film is about!

পুনশ্চ- আপনার কোন সিনেমা পছন্দ না হলে দেখবেন না, কেন পছন্দ হয় নাই ব্যাখ্যা করবেন। কিন্তু দয়া করে “জোর করে” নিজের কিছু ধারণা মানুষের মনে আর মস্তিকে ঢোকানোর চেষ্টা করবেন না। আপনাকে দেখতে তখন অনেকটা স্ক্রু ড্রাইভারের মতো মনে হয়।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button