ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

যুবলীগ চেয়ারম্যানের এতো জ্বলছে কেনো?

ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে পদচ্যুত করার সময়েই প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুবলীগে যারা অবৈধ কাজকর্ম করে বেড়ায়, তারাও রেহাই পাবে না। তাদের ব্যাপারেও দল কঠোর অবস্থানে যাবে। আর তারপর পরই দেখা গেলো, কি চমৎকার সব দৃশ্য। ঢাকা শহরকে ‘লাস ভেগাস’ বানানোর কারিগরদের ধাওয়া করতে শুরু করলো র‍্যাব, পুলিশ। ধরা পড়লো, ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের এক তথাকথিত প্রভাবশালী নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া ওরফে ‘ল্যাংড়া খালেদ’।

ঢাকায় এভাবে ক্ষমতার দাপটে ক্লাবগুলোকে ক্যাসিনো বানিয়ে দিনের পর দিন কিভাবে জুয়ার আসর জমেছে, তা বিস্মিত করেছে অনেককে। বিশেষ করে, সংখ্যাটা এবং ক্যাসিনোর বিস্তারটা এরকম বিস্তৃত তা হয়ত অনেকের ভাবনার বাইরেই ছিল। এরকম যখন অবস্থা, তখন র‍্যাব-পুলিশের এই অভিযানকে বরং প্রশংসা করার কথা। যদিও যে স্কেলে এসব অবৈধ ক্যাসিনোর বিস্তার ঘটেছে, তাতে ব্যবস্থা আরো আগেই নেয়া উচিত ছিল – এমনটাও মনে করেন অনেকে। কিন্তু, একই সাথে আগে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে এখন ব্যবস্থা নেয়া যাবে না, কোনোদিন এসবের বিচার করা যাবে না – এসব ভাবনাও তো সঠিক নয়।

ক্যাসিনো থেকে জব্দ করা মদের বোতল

যুবলীগের চেয়ারম্যান পদে বসে থাকা ওমর ফারুক চৌধুরী ওইভাবেই ভাবেন। প্রাথমিকভাবে তিনি যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তা দেখে মনে হয়েছে, জুয়াবাজ, ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক, অবৈধ অস্ত্রধারীকে গ্রেফতার করায় তিনি হতাশ হয়েছেন। যেন তারই সাজানো বাগানের একটা নষ্ট ফুল ছিঁড়ে ফেলায় দুঃখে কাতর তিনি। তার প্রতিক্রিয়ার ভাষা ছিল ভয়ংকর ক্রুদ্ধতায় ভরা।

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “আপনারা বলছেন ৬০টি ক্যাসিনো আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আপনারা ৬০ জনে কি এত দিন আঙুল চুষছিলেন? তাহলে যে ৬০ জায়গায় এই ক্যাসিনো, সেই ৬০ জায়গার থানাকে অ্যারেস্ট করা হোক। সেই ৬০ থানার যে র‌্যাব ছিল, তাদের অ্যারেস্ট করা হোক।”

যুবলীগের চেয়ারম্যান ভাগ্যিস প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতার করার দাবি তুলেননি, এটাই অনেক। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর কানে যুবলীগের অপকর্মের খবর যাওয়ার পরপরই তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কথার ইঙ্গিতে স্পষ্ট হয়েছিল যে, এবার যুবলীগের ভেতরেও শুদ্ধি অভিযান চালানো হবে। এমনকি, প্রধানমন্ত্রী গতকালও বলেছেন, ছাত্রলীগের পর এখন যুবলীগকে ধরেছি।

তাহলে, এখন যুবলীগ চেয়ারম্যান কি তার এসব হুংকার দিয়ে প্রকারান্তে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তেরও বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখাচ্ছেন না? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও গ্রেফতার হতে হবে, একটা জুয়াবাজকে ধরার জন্যে এমন দাবি কে করেছে কবে!

যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী
যুবলীগ চেয়ারম্যান জনাব ওমর ফারুক চৌধুরী

জনগণও প্রশ্ন করতে পারে যুবলীগ চেয়ারম্যানকে, প্রধানমন্ত্রীও তো জবাবদিহি চাইতে পারেন যুবলীগের চেয়ারম্যানের কাছে যে, তার সংগঠনের নেতারা এমন বেপরোয়া ক্ষমতার চর্চা করে যুবসমাজকে নষ্ট করছে, ক্যাসিনো বসিয়ে মদ খাচ্ছে, জুয়া খেলছে, চাঁদাবাজি করে বেড়াচ্ছে, টর্চার সেল খুলে বসেছে- তখন যুবলীগ চেয়ারম্যান কি আঙুল চুষছিলেন? লাগাম টেনে ধরেন নি কেন? যদি এই প্রশ্ন যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে করা হয়, তিনি কি জবাব দেবেন তখন?

তিনি এই অভিযানের পেছনে ষড়যন্ত্রর গন্ধ পাচ্ছেন। বিরাজনীতিকরণের লক্ষণ দেখছেন। তিনি তার দক্ষিণ যুবলীগের ইউনিটকে শ্রেষ্ঠ ইউনিটও বলে সাফাই গেয়েছেন ইন আ সেন্স সংগঠনের প্রোগ্রামে দক্ষিণ যুবলীগ বেশি সক্রিয় থাকে। প্রকারান্তে, তার প্রাথমিক যে প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল তাতে মনে হয়েছে, এরকম দুঃখ তিনি অনেকদিন পাননি।

প্রধানমন্ত্রী যেখানে যুবলীগের এসব লাগামহীন অপকর্ম নিয়ে মন্তব্য করেন এইভাবে যে, এরা শোভন-রাব্বানীর চেয়েও খারাপ, তখন যুবলীগের চেয়ারম্যানের হুংকার, আঙ্গুল চুষছেন বলে তীর্যক স্বরে চেঁচানোকে হাস্যকর লাগে খুব। যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী অন্যদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার আগে, নিজের সংগঠনের লাগাম টানলে নিশ্চয়ই আর যার কাছেই হোক, প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হতো না।

খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া
দক্ষিণ যুবলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ ভূঁইয়া

ওমর ফারুক চৌধুরী এমন একজনের গ্রেফতারের পর ওমন হুংকার ছেড়েছেন যে লোকের অতীত রেকর্ডও খুব বাজে। ১৯৮৭ সালে ফ্রিডম মানিক ও ফ্রিডম রাসুর নেতৃত্বে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে হামলা হয়। এ দুই নেতার হাত ধরেই গ্রেফতার হওয়া খালেদের উত্থান। ১৯৯২ সালে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে পড়ার সময় এই খালেদ জড়িত ছিল ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে। ছাত্রদলের হয়ে ছাত্রসংসদের নেতা হয় খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া।

শুধু তাই নয়, বিএনপি যখন ক্ষমতায় তখন মির্জা আব্বাসের ভাই মির্জা খোকনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এই খালেদের। গণমাধ্যমে এসেছে, দুবাইয়ে আত্মগোপন করা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ হতো। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সিঙ্গাপুরে হোটেল মেরিনা বে’তে জিসান, খালেদ ও যুবলীগের ওই শীর্ষ নেতার মধ্যে ক্যাসিনো এবং ঢাকার বিভিন্ন চাঁদার ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে বৈঠক হয়।

খালেদ মতিঝিল, শাহজাহানপুর, খিঁলগাও এসব এলাকায় টেন্ডারবাজি করে বেড়ান। খিলগাঁও কাঁচাবাজারের সভাপতির পদটিও দীর্ঘদিন তিনি ধরে রেখেছেন। শাহজাহানপুরে রেলওয়ের জমি দখল করে দোকান ও ক্লাব নির্মাণ করেছেন। খিলগাঁও-শাহজাহানপুর হয়ে চলাচলকারী লেগুনা ও গণপরিবহন থেকে নিয়মিত টাকা দিতে হয় খালেদকে। প্রতি কোরবানির ঈদে শাহজাহানপুর কলোনি মাঠ, মেরাদিয়া ও কমলাপুর পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।

খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া
ছবি- বাংলা ট্রিবিউন

ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে এরকম গডফাদারসুলভ লাইফস্টাইল যার, সেই খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া ওরফে ল্যাংড়া খালেদ গ্রেফতার হওয়ার পর যুবলীগের চেয়ারম্যানের প্রতিক্রিয়া একটু দৃষ্টিকটুই ঠেকেছে। যুবলীগের চেয়ারম্যান যেসব যুক্তি দেখিয়েছেন এসব মেনে চললে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তো কোনো অপরাধীকেই আর গ্রেফতার করার এখতিয়ার রাখে না।

প্রধানমন্ত্রীও নির্দেশনা দিলে তারা অবাধ্য হয়ে তখন বলবে, পারবো না ম্যাডাম গ্রেফতার করতে।
কেন?
ওই যে এতোদিন কেন গ্রেফতার করিনি এজন্যে আমাদের গ্রেফতার হতে হবে এরকম হুমকি আসবে, তাই…

যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী বিবিসির সাথে সাক্ষাৎকারে সুর কিছুটা নরম করলেও এখনো তার সেই একই প্রশ্ন, কেন এতোদিন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বাংলাদেশ সেই দেশ যেখানে যুদ্ধপরাধীদের বিচার কর‍তেও বিয়াল্লিশ বছর লেগেছে। তার আগে সেই যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে দেশের পতাকাও ঝুলেছে। এখন তাই বলে কোনোদিন তাদের বিচার হবে না – এই প্রশ্ন যদি তারা তুলে তাহলে শুনতে কেমন লাগতো?

সত্যি বলতে এতোদিন কেন এমন অভিযান হয়নি, আইনের লোকরাও কি জড়িত কিনা এসব প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনেও আছে। এই প্রশ্নগুলো মীমাংসা করার পদক্ষেপ হিসেবে তদন্ত করতে হবে স্ট্রিক্টলি। সেই দাবি আমাদেরও। কিন্তু, আগে কেন অভিযান হয়নি, এতোদিন হলো না কেন এসব প্রশ্ন তুলে আজকের অভিযানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে আঙ্গুল তোলা মানায় না কারো।

যুবলীগ চেয়ারম্যান আবার এই দাবিও করেছেন, তার সংগঠনের অনেকে যে ক্যাসিনো পরিচালনা বা জুয়ার সাথে জড়িত বলে যে অভিযোগ উঠছে এসব বিষয় নাকি তার জানা ছিলো না। এই না জানাটাই তার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। সংগঠন প্রধান হিসেবে এরকম ব্যর্থতা নিয়ে উনি অন্যদের দিকে আঙ্গুল তুলে বেড়াচ্ছেন, খুব না জ্বললে কি এমন হবার কথা?

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button