ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর: যে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে…

অনৈতিক ও অপরাধমূল কাজে জড়িত থাকা সহ বেশ কয়েকটি অভিযোগের ভিত্তিতে পদত্যাগ করতে হয়েছে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে বেশকিছু অভিযোগ থাকলেও, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে পার্সেন্টেজ চাওয়ার কারণটাই সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে এখানে। মূলত এই অভিযোগ ওঠার পরেই দুজনের ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

মজার বিষয় হচ্ছে, ছাত্রলীগের সাজানো সংসার ওলট পালট করে দেয়ার সূত্রপাতটা হয়েছিল ঢাকা থেকে বেশ খানিকটা দূরে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই ঘটনার সঙ্গে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ বা শোভন-রাব্বানী, কারো কোন সম্পর্কই ছিল না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের একেবারে সাদামাটা একটা আন্দোলন যে এত তীব্র রূপ নেবে, সেটার ফলাফল যে এমন বিধ্বংসী হবে, সেটা কারো জানা ছিল না।

ঘটনার সূত্রপাত আগস্টের শেষদিকে। এবছরের মে মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প’ নামের ১৪৪৫ কোটি টাকার একটি মেগা প্রোজেক্ট হাতে নেয়া হয়েছিল মে মাসে, পাঁচটি নতুন হল নির্মাণ সহ বেশকিছু স্থাপনা নির্মাণের কথা ছিল এই প্রোজেক্টের আওতায়। এই উন্নয়ন কাজের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রায় ১১শ গাছ চিহ্নিত হয় কেটে ফেলার জন্যে, ছাত্রদের আন্দোলনের শুরুটাও সেখান থেকেই। তারা চাইছিল গাছগুলোকে রক্ষা করেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হোক। কিন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের কথায় কান দেয়নি। তড়িঘড়ি করে শুরু হয় গাছ কাটার কাজ।

তিনদফা আল্টিমেটাম দেয়ার পরেও কাজ না হওয়ায় জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা পথে নামলো, আন্দোলনে নেতৃত্ব দিল বামপন্থী সংগঠনগুলো। মানবন্ধন করা হলো, কেটে ফেলা গাছে কাফন জড়িয়ে মিছিল বের করলো ছাত্ররা, প্রদর্শিত হলো পথনাটক।

এরইমধ্যে কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলো, উন্নয়ন কাজের প্রথম কিস্তির ৪০০ কোটি টাকা থেকে জাবি ছাত্রলীগকে দুই কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন ভিসি- এই সংবাদ পাবার পরে আরও ফুঁসে উঠলো ছাত্ররা। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরে ছাত্রদের সেই আন্দোলনে যোগ দিলেন শিক্ষকদের একাংশও। শুরু হলো ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ নামক আন্দোলনের।

এবার আসা যাক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের প্রসঙ্গে। জাহাঙ্গীরনগরের ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম অভিযোগ করেছেন, ছাত্রলীগ নেতা শোভন এবং রাব্বানী তার কাছে উন্নয়ন কাজের ৪-৬ শতাংশ দাবী করেছেন, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ প্রায় ৮৬ কোটি! তিনি রাজী না হওয়ায় তাকে হুমকিও দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি, এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি অভিযোগ করেছেন, প্রধানমন্ত্রীও অভিযোগটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন।

অভিযোগ অন্যপাশ থেকেও আছে। শুরুতে যখন পার্সেন্টেজ সংক্রান্ত অভিযোগ উঠলো, তখন গোলাম রাব্বানী বলেছিলেন, উপাচার্য্য অন্যায়ভাবে জাহাঙ্গীরনগর ছাত্রলীগকে দুই কোটি (কিংবা ১.৬০ কোটি) টাকা দিয়েছেন শুনেই তারা সেখানে গিয়েছিলেন। পরে যদিও ডেইলি স্টারের কাছে রাব্বানী স্বীকার করেছেন যে তারা উন্নয়ন কাজের একটা শেয়ার দাবী করেছিলেন, তবে সেটাকে তিনি ‘ন্যায্য দাবী’ বলেই উল্লেখ করেছেন।

জাবি ছাত্রলীগকে দেড়-দুই কোটি টাকা দেয়ার বিষয়টা নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে, গোলাম রাব্বানীও তার বক্তব্যে বারবার এই প্রসঙ্গ এনেছেন। যদিও ভিসি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শুরু থেকেই। রাব্বানী আরও অভিযোগ করেছেন, জাহাঙ্গীরনগরের এসব উন্নয়ন কাজের তদারকি করছেন ভিসির স্বামী এবং ছেলে, তারা বড় অঙ্কের কমিশনও পাচ্ছেন এই উন্নয়ন কাজ থেকে। ঘটনার শুরু থেকেই জাবি ছাত্রলীগ ভিসির পক্ষে কথা বলছে, এমনকি তারা সরাসরি রাব্বানীকে মিথ্যুক বলেও অভিহিত করেছে, তখনও রাব্বানী ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে ইস্তফা দেননি!

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম

ভিসি ফারজানা ইসলাম শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবী করে আসছিলেন, তার পক্ষে একদল শিক্ষক আন্দোলনও করছেন। কিন্ত আন্দোলনকারীদের বক্তব্য একটাই- সব অভিযোগ যদি ভিত্তিহীনই হবে, তাহলে তদন্ত কমিটি কেন গঠন করা হচ্ছে না? কেন সত্যিটা সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে না? উপাচার্য তার অনুগত শিক্ষক ও কর্মচারীদের দিয়ে বারবার বলাচ্ছেন যে লুটপাট ও টাকা ভাগাভাগির বিষয়টি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক। কিন্তু তারা একবারও বলছেন না যে এই দাবির প্রেক্ষিতে তদন্ত করা হোক। তিনি (উপাচার্য্য) যদি অভিযুক্ত না-ই হয়ে থাকেন তবে তদন্তের মুখোমুখি হতে সমস্যা কোথায়?

খুব সাধারণ একটা আন্দোলন, যেটা শুরু হয়েছিল একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছ রক্ষার জন্যে, সেটাই দেশের রাজনীতির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে, দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্রসংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে এই আন্দোলনের কারণেই। যেটা হয়তো মাসখানেক আগেও কেউ ভাবতে পারতেন না। সেই অভাবনীয় ঘটনাটাই ঘটেছে, এই গল্পটা এখনও শেষ হয়নি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর আন্দোলনের জালে আর কোন কোন মাছ ধরা পড়ে, সেটা এখনও দেখা বাকী…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button