এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডবিবিধ

জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলানো কেমন অসাম্প্রদায়িকতার নমুনা?

ভারতে দ্বিতীয় মেয়াদে মোদী সরকার ক্ষমতায়। আর এই দ্বিতীয় মেয়াদে বিজেপি ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশটিতে সাম্প্রদায়িক আচরণের মাত্রা বোধহয় বেড়ে গেল। ভারতে হিন্দু-ধর্মালম্বী মানুষরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, অন্যান্য ধর্মালম্বীরা এই দেশটিতে সংখ্যালঘু। বাংলাদেশে যেমন ইসলামধর্মাবলম্বী মানুষরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, বাকিদের বলা হয়ে থাকে সংখ্যালঘু। এরকম দেশগুলোতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর বর্তায়, তারচেয়ে বেশি নাগরিক হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ যারা তাদেরকেও সংযত আচরণ করতে হয়।

কিন্তু, এই মুহুর্তে ভারতে জোরপূর্বক সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন চলছে। এই নির্যাতন নতুন নয়, দেশটিতে যারা ইসলাম ধর্মালম্বী তাদের গো-মাংস খাওয়াকে কেন্দ্র করে এর আগেও ভয়ংকর কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। এবার আরেকটি নতুন ফর্মে দেশটিতে মুসলিমদের উপর নির্যাতনের নতুন স্টাইল শুরু হয়েছে। বিজেপি ক্ষমতা গ্রহণের পর জোরপূর্বক দেশটিতে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেয়ানোর ব্যাপারটি চালু হয়েছে। এতে অংশ নিতে হচ্ছে মুসলিমদেরও। যারা অংশ নিতে চাইছে না, তাদের উপর আক্রমণ হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়।

এই মাসেই এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। দুই একটা উদাহরণ দেয়া যাক। গত ২০ তারিখের ঘটনা। কলকাতায় এক মুসলিম তরুণকে ‘জয় শ্রীরাম’ না বলায় চলন্ত ট্রেন থেকেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় পত্রিকা আনন্দবাজারে এই খবর প্রকাশিত হয়। জানা যায়, তরুণের নাম শাহরুফ হালদার। তিনি পেশায় মাদ্রাসা শিক্ষক। রমজানের ছুটি কাটিয়ে ফিরছিলেন মাদ্রাসায়। দুপুরের দিকে ক্যানিং স্টেশন থেকে শিয়ালদহগামী ট্রেনে উঠেছিলেন সেই মাদ্রাসা শিক্ষক।

জয় শ্রীরাম, ভারত

একই ট্রেনে হিন্দু সংহতি নামক সংগঠনের বেশ কিছু নেতাকর্মী হট্টগোল করছিল। তারা শাহরুফ হালদারকে ভাল নজরে দেখেনি, তাকে গালাগাল করতে থাকে। মাদ্রাসার শিক্ষক প্রতিবাদ জানালে তখন সেখানে বিতর্ক শুরু হয়। হিন্দু সংহতির কর্মীরা তাকে জয় শ্রীরাম বলতে জোর করে। তিনি রাজি না হওয়ায় মারধোর শুরু হয়। একপর্যায়ে পালাতে চাইলেও তাকে আটকে রাখা হয় এবং ধাক্কা মেরে প্ল্যাটফর্মে ফেলে দেয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

অথচ, গত শুক্রবারই আমেরিকার বার্ষিক আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক এক রিপোর্টে তারা ভারতের সংখ্যালঘুর স্বাধীনতাহীনতা নিয়ে কথা বলেছিল। সেই রিপোর্টে বলা হয়, ভারতে মুসলমানদের কোনো ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই। যদিও, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করে, এই প্রতিবেদন সত্য নয়।

প্রতিবেদনের বক্তব্য নাকচ করে দিলেও ভারতে জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর এসব অভিযোগ নিয়ে ভারত সরকারের তৎপরতা কি তা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ফলে ধর্মীয় উগ্রতা ও সহিংস আচরণ এই অঞ্চলটিতে বেড়েই চলেছে। কলকাতার সেই মাদ্রাসা শিক্ষককে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া তো কমই, ‘জয় শ্রীরাম’ না বলার অপরাধে এর চেয়েও ভয়ংকর পরিণতি হয়েছে আরেক তরুণের। ঝাড়খণ্ডের ২৪ বছর বয়সী সেই তরুণের নাম শামস তবরেজ।

জয় শ্রীরাম, ভারত, অসাম্প্রদায়িকতা

তাকে চোর সন্দেহে পোস্টের সাথে বেঁধে গণপিটুনি দেয়া হয়। এই সময় তাকে ‘জয় শ্রীরাম’ এবং ‘জয় হনুমান’ বলতে জোর করা হয়। তাকে মারধোরের একটি ভিডিও চিত্রও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। গুরুতর আহত তবরেজকে হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে। প্রশ্ন ভারত সরকারের কাছে, তবরেজের বড় অপরাধ কোনটা – তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ নাকি ‘জয় শ্রীরাম’ না বলা?

ভারত দেশ হিসেবে নিজেদের অসাম্প্রদায়িক দেশ বলে পরিচিতি দিতে ভালবাসে। কিন্তু, আপনি সংখ্যালঘুদের ধরে ধরে জোর করে আপনার ভাষা বলাবেন এবং একই সাথে অসাম্প্রদায়িক দাবি করবেন- এমন অসাম্প্রদায়িক হলে সেটা বড়ই আতঙ্কের। ভারত বিশাল দেশ, এই দেশের সংখ্যালঘুদের সংখ্যাও অনেক দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের চাইতেও অনেক বেশি। ধরছি, ভারতে এই মুহুর্তে ২০ কোটি মুসলমান আছে, অনেক মুসলিম প্রধান দেশেও এতো ইসলামধর্মালম্বী নেই। অথচ, এই বিশাল সংখ্যাটা দিনশেষে ভারতের প্রেক্ষাপটে নগণ্য। আর তাই ভারতে এতগুলো মানুষ ‘অসাম্প্রদায়িকতা’র মোড়কে সাম্প্রদায়িক বিষের শিকার হচ্ছে বা হতে পারে বলে ভয় করছে।

হায়দারাবাদের এক রাজনীতিক আসাদুদ্দিন ওয়াইসি এই ঘটনার পর এক টুইট করেন। তিনি লিখেন, “হায়দরাবাদের রাজনীতিক তথা সাংসদ আসাদুদ্দিন ওয়াইসি এই ঘটনাকে নিয়ে টুইট করে জানান, ‘‘সব রকমের গণহত্যাই দেখা যাচ্ছে। প্রথমে এক মুসলিমকে গো-প্রেমীরা হত্যা করল। এরপর শুরু হল সবচেয়ে হাস্যকর অজুহাত, গোমাংস ভক্ষণ, চুরি, চোরাচালান ও লাভ জিহাদ। ‘সব কা বিকাশ’-এর জন্য আমরা ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে খুন হয়ে যেতে পারি।”

ভারতের সংবিধানেও আর্টিকেল ১৪তে আছে, আইনের দৃষ্টিতে সবার সমতার কথা। জানি না, কতটুকু সমতা সবার নিশ্চিত হচ্ছে সেখানে। আর্টিকেল ১৫তে বলা হয়েছে ধর্ম, জাত, পাত, বর্ণ, লিঙ্গ, স্থান, জন্ম — কোনো কিছুই যেন বৈষম্যের কারণ না হয়। বৈষম্যহীনতার যে কথা সংবিধান বলে, সেই একই সংবিধান কি মানে উগ্রপন্থীরা? তারা কোন সংবিধান মোতাবেক চলে আসলে?

মোদীর ম্যাজিকে দেশটিতে বিজেপি আবারো ক্ষমতায় এসেছে সত্য, কিন্তু মোদী ম্যাজিকের তন্ত্র মন্ত্র শুধুই বোধহয় নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য। একটা বিশাল সংখ্যক মানুষ মোদীর আমলে জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকছে, মনের কথা বলা দূরে থাক, মনের বিরুদ্ধেই তাদেরকে বিভিন্ন স্লোগান দেয়ানো হচ্ছে, হতে পারে এই ভয় নিয়ে বেঁচে থাকছে। মোদী আপনি ধর্মীয় গুরু নন, ভারতের সকল মানুষের প্রধানমন্ত্রী — আপনার দেশে সাম্প্রদায়িক ঘটনার আঘাতে তাই আপনারও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়ার কথা। আপনি কি শুনতে পান সংখ্যালঘুদের আর্তনাদ?

বিজেপির দুই কাণ্ডারী, নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ

অবশ্য, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, দেশটির অসাম্প্রদায়িক চরিত্র কতটা হুমকির মুখে। সুপ্রিম কোর্ট একবার বলেছিল, “এখন পর্যন্ত ভারত অসাম্প্রদায়িক দেশ, কিন্তু আমরা জানি না আর কতদিন এমন থাকবে…” এরকম যখন অবস্থা তখন ভারতকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলাটা অসাম্প্রদায়িকতার সংজ্ঞাকেই বদলে দেয়া হয়ে যায়। ভারতের সংবেদনশীল সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক মানুষদেরকে এক্ষেত্রে প্রতিবাদী হতে হবে সবচেয়ে বেশি।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button