মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

একটি তেলতেলে চিঠি এবং…

অভিনেতা এবং উপস্থাপক শাহরিয়ার নাজিম জয়ের একটা চিঠি গতকাল থেকে ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। চিঠিটা তিনি লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে। চিঠি না বলে অবশ্য এটাকে আবেদনপত্রও বলা যায়। তবে লেখাগুলো পড়ার পরে কেউ চাইলে এটাকে তেলের অফুরন্ত এক ভাণ্ডারও বলতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যে মাটির তলায় যতো তেল সঞ্চিত আছে, তার সবটাই জয় ঢেলে দিয়েছেন তার লেখা এই চিঠিতে, নিজেকে ‘প্রধানমন্ত্রীর আরেক সন্তান’ উল্লেখ করে যে কোন মূল্যে বাগিয়ে নিতে চেয়েছেন পূর্বাচলের একটি প্লট।

চিঠিতে অন্তত পাঁচবার প্রধানমন্ত্রীকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেছেন জয়, তাকে ‘উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ নেত্রী’ ও ‘আদর্শ মা’ উল্লেখ করে লিখেছেন- ‘আপনার সুযোগ্য পুত্রের নামের আরেক পুত্র শাহরিয়ার নাজিম জয়ের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি রইল সালাম।’

‘আমি বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় নায়ক (টিভি, চলচ্চিত্র)। আপনার দোয়ায় গত ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশের জনগণের বিনোদনের অন্যতম উৎস হয়ে আছি টিভি ও সুস্থ চলচ্চিত্রে।’

‘মা, আপনি অত্যন্ত দরদী ও বাংলার মানুষের বিপদের বন্ধু। শুধু তাই নয়। গত নির্বাচনকালীন আপনি যে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন এবং জ্ঞানদীপ্ত আদর্শের ওপর বলিয়ান ছিলেন আমাদের মতো মানুষ আজীবন আপনার নেতৃত্বকে স্যালুট করার অঙ্গীকার করেছে।’

‘মা, আপনার কাছে একজন শিল্পীর আবেদন আমার সমসাময়িক শিল্পীরা পূর্বাচলে ১০ কাঠা/৫ কাঠার প্লট পেয়েছেন। কিন্তু আমি শুটিংয়ের জন্য দেশের বাইরে থাকায় আবেদন করতে পারিনি। পরবর্তীতে ঝিলমিল প্রকল্পে আবেদন করলেও লটারিতে তা পাইনি।’

‘মা, পূর্বাচলে একটা জমি আমার স্বপ্ন ও সন্তানের ভবিষ্যৎ। আমি আপনার কাছে আবদার করলাম। আপনি আপনার এই সন্তানের আবদার ফেলে দিবেন না আমি জানি (ইনশাআল্লাহ)।’

জয়ের সেই চিঠিতে তার ছবির পাশে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সিল দেয়া আছে, এছাড়াও রেফারেন্সে সাক্ষর করেছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়।

চিঠিতে জয় নিজেকে ‘জনপ্রিয় নায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই জনপ্রিয়তার সংজ্ঞা কি, সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। নায়ক হিসেবে টিভি পর্দায় তিনি চলনসই ছিলেন, মন্দের ভালো বলা চলে। সিনেমায় গিয়ে নিজের নাম ডুবিয়েছেন, পাঁচটা সিনেমায় অভিনয় করলেও, ব্যবসাসফল হয়নি কোনটাই। তিনি আবার দাবী করেন, শাকিব খানের কারণেই নাকি তার ক্যারিয়ার বাধাগ্রস্থ হয়েছিল তখন!

অভিনেতা জয়ের চেয়ে বরং উপস্থাপক জয় বেশি জনপ্রিয়। এটিএন বাংলার সেন্স অফ হিউমার অনুষ্ঠান দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি, যদিও অভিযোগ আছে, আমন্ত্রিত অতিথিদের ব্যক্তিগত এবং বিতর্কিত প্রশ্ন করে অযথা বিতর্ক উস্কে দেয়ার একটা প্রবণতা তার মধ্যে থাকে সবসময়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটা প্লটের জন্যে নিজেকে ‘শিল্পী’ হিসেবে দাবী করা একটা মানুষ কিভাবে এত বেপরোয়া হতে পারে? তেলের ভাণ্ডার উজাড় করে দিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে এরকম চিঠি লিখতে পারে কিভাবে? শিল্পীস্বত্ত্বা ব্যাপারটার সাথেই তো এটা পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

জয় তো নাটক বা সিনেমায় অভিনয় করে টাকাপয়সা কম কামাই করেননি। দেশ-বিদেশে অনেক শো করেছেন, এখনও করেন। উপস্থাপনা তো আছেই। তার তো টাকার অভাব হবার কথা নয়। তিনি তো মরণাপন্ন হয়ে যাননি, টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না- এরকম কোন দুর্দশা হয়নি তার। তাহলে ভিখারির মতো এভাবে হাত পাতার মানে কি? কেন এরকম বিতর্কে নিজেকে জড়ানো? কেন সেখানে নিজের সন্তানকে টেনে আনা?

আসল ব্যাপারটা হয়তো স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই নয়। একটা প্লট পাবার জন্যে তিনি এমন আপ্লুত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করছেন, তাকে বারবার ‘মা’ ডাকছেন, আজ শেখ হাসিনার জায়গায় খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকলে স্বার্থোদ্ধারের জন্যে জয় তাকেও মা ডেকে প্লট ভিক্ষা চাইতেন হয়তো। বঙ্গবন্ধু যে চাটার দলের কথা বলে গিয়েছিলেন সাড়ে চার দশক আগে, তারা তো এখন সংখ্যায় আরও অনেক বেশি!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button