সিনেমা হলের গলি

জোকার রিভিউ: দেখে না কেউ, হাসির শেষে নীরবতা…

কিছু সিনেমা থাকে, যেগুলো দেখার পরে স্তব্ধ হয়ে অনেকক্ষণ বসে ভাবতে হয়, কি দেখলাম এটা! ভাবনার জগতকে আলোড়িত করার সামর্থ্য সব নির্মাতার থাকে না, সব অভিনেতা মাত্র দুইঘন্টা সময়ের মধ্যে হৃদয়ের মণিকোঠায় জায়গা করে নিতে পারেন না। টোড ফিলিপস এবং জোয়াকিন ফিনিক্সের জুটি সেই কাজটা ভীষণ অবলীলায় করে ফেললো! জোকার দেখে আসার চব্বিশ ঘন্টা বাদেও ঘোর থেকে বেরুতে পারছি না, স্বল্প সময়েই কী অদ্ভুত এক আবেশের জন্ম দিলো সিনেমাটা!

না, এই সিনেমাটা কোন সুপারভিলেনকে নিয়ে নয়। ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া, রাস্তায় মার খাওয়া, সমাজ আর জীবনের কাছে প্রত্যেকদিন গো-হারা হেরে মেট্রোতে চড়ে বাড়ি ফেরা খুব সাধারণ একটা মানুষের গল্প বলেছে জোকার। যে লোকটা দুটো পয়সা কামানোর জন্যে ক্লাউন সেজে রাস্তায় দাঁড়ায়, যাকে উত্যক্ত করাটা দুনিয়ার সবচেয়ে সহজ কাজ, প্রতিটা মূহুর্তে যাকে হাসির পাত্র হতে হয়, সমাজ যার দিকে আঙুল তুলে বলে- ইউ আর আনফিট; সেই মানুষটার গল্প বলেছে জোকার।

জোকারকে আমি-আপনি চিনি দুনিয়ার সেরা অ্যান্টি হিরো হিসেবে। আদর করে কেউ আবার ‘সুপার ভিলেন’ও ডাকে। জোকার মানে ভায়োলেন্স, নৃশংসতা, জোকার মানে ভয় আর আতঙ্কের কড়া একটা মিশ্রণ। অথচ টোড ফিলিপসের জোকারে আপনি সেসব পাবেননই না বলতে গেলে। ফিলিপস আমাদের শুনিয়েছেন অন্যরকম একটা গল্প। ছা-পোষা এক কমেডিয়ানের দুনিয়ার সেরা ভিলেন হবার গল্প। এই জোকারে ভায়োলেন্স নেই, আছে বিপ্লব, জোকার এখানে বিপ্লবের প্রতীক, যে বিপ্লব ধনীর বুকে গুলি চালায়, ক্ষমতাবানের সম্পদে আগুন ধরায়।

সুপার ভিলেন’ জোকারকে খুঁজতে সিনেমা হলে গেলে হতাশ হতে হবে আপনাকে, জোকার এখানে বরং নির্যাতিতের কথা বলছে, ক্ষমতাবানের বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছে। জোকার এখানে প্রতিবাদের নাম, নিপীড়িত জনতার প্রতীক হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আর্থার ফ্লেক নামের মানুষটা চায় তার জীবন যতোটা নিস্তরঙ্গ, মৃত্যুটা এত নিঃসঙ্গ, নিঃস্তব্ধ না হোক। তাই ডাইরিতে সে লিখে যায়, ‘আমি চাই আমার মৃত্যুটা আমার জীবনের চেয়ে বেশি শব্দময় হোক!’ জোকার হয়ে সেই ইচ্ছেটাই পূরণ করতে চায় সে, যে সমাজ তাকে দু পয়সার দাম দেয়নি, তাকে প্রতি মূহুর্তে অবহেলা করেছে, সেই ঘুণেধরা সমাজের কোণে কোণে সে আগুন জ্বালিয়ে দিতে চায়।

সিনেমাটোগ্রাফি দুর্দান্ত, স্ক্রীনপ্লে ভয়াবহ মানের চমৎকার। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর শুনে যদি গায়ে কাঁটা না দেয়, তাহলে আপনি সিনেমাপ্রেমীই নন। জোকার চরিত্রের প্রাণ হচ্ছে তার সংলাপ, সেটা এই সিনেমাতেও বলবৎ। কয়েকটা দৃশ্য তো অদ্ভুত একটা হাহাকার আর উন্মাদনা তৈরি করে বুকের ভেতরে।

একটা জায়গায় আর্থার ফ্লেক চেষ্টা করছে তার জুতোটা প্রাণপণে টেনে বড় করার, সমাজের চোখে বেমানান হয়ে থাকতে থাকতে অতীষ্ট হয়ে যাওয়া একটা মানুষের টিকে থাকার অসহ্য লড়াইটাই যেন ফুটে উঠেছে ছোট্ট সেই দৃশ্যে। এমন মেটাফোর ভুরি ভুরি আছে সিনেমায়। চাকরি হারিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেয়ালের ‘ডোন্ট ফরগেট টু লাফ’ থেকে ‘ফরগেট টু’ অংশটা কেটে বাক্যটাকে ‘ডোন্ট লাফ’ বানিয়ে দেয়াটাই যেমন গুজবাম্প এনে দেয় শরীরে!

সোজা কথায় বললে, জোকার ইজ অ্যা ডিস্টার্বিং ফিল্ম। এই সিনেমাটা আপনাকে আনন্দ দেবে না, ধাক্কা দেবে, ভাবাবে, বাধ্য করবে একজন অপরাধীর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে। আর্থার ফ্লেক থেকে জোকার হবার জার্নিটা আপনার চোখের সামনে ঘটছে, আপনি দেখছেন, কোনকিছুর সাতে-পাঁচে না থাকা একটা মানুষ কি করে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। ভয়াবহ একাকীত্ব আর প্রসহনের শিকার হয়ে কীভাবে তার ভেতরের খারাপ মানুষটা ঘুম ভেঙে জেগে উঠছে। আর্থারের অপরাধটাকে লঘু করে দেখার একটা প্রবণতা তৈরি হবে আপনার মধ্যে, তার কীর্তিকলাপকে জাস্টিফাই করতে ইচ্ছে করবে আপনার। এটাই হয়তো চিত্রনাট্যের সাফল্য।

জোকার চরিত্রটাকে কাল্ট ক্যারেক্টারে পরিণত করেছিলেন হিথ লেজার, ক্রিস্টোফার নোলানের দক্ষ পরিচালনা আর হিথ লেজারের হাড়ভাঙা খাটুনী মিলে ঐতিহাসিক একটা রূপ নিয়েছিল, লেজারের অস্বাভাবিক মৃত্যু দর্শকের মনে জোকারকে চিরস্থায়ী একটা আসন তৈরি করে দিয়েছে আরও ভালোভাবে। এমন একতা চরিত্রকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে গেলে বারবার তুলনা করা হবে লেজারের সঙ্গে, কারণ হিথ লেজার আর জোকার তো দুটো সমার্থক শব্দ।

আমি তুলনায় যাবো না, হিথ নিজে যদি জোকারের ব্যাটনটা কারো হাতে তুলে দিতে চাইতেন, সেটার জন্যে জোয়াকিন ফিনিক্সের চাইতে উপযুক্ত কেউ আর হতে পারতেন না, এটা নিশ্চিত! শুধু পাগলাটে ওই হাসিটার জন্যেই ফিনিক্সকে লেটার মার্ক দেয়া যায়, বাদবাদী নম্বরের কথা বাদই দিলাম! চেপে রাখা বেদনা যে হাসিতে ফুটে ওঠে, কষ্টগুলো দাবানল হয়ে বন্দুকের গুলির মতো বেরোয় যে হাসির শব্দে, সেটাকে অগ্রাহ্য করার সামর্থ্য তো আমাদের নেই!

ফিনিক্স যেটা করেছেন, সেটাকে ‘ওয়ান্স ইন অ্যা লাইফটাইম’ পারফরম্যান্স বললে ভুল হবে না খুব একটা। মনে দাগ কেটে যাওয়া এমন দুর্দান্ত অভিনয় কালেভদ্রে চোখে পড়ে। জোকারের হতাশা, ক্রোধ, যন্ত্রণা, গ্লানি- সব এত চমৎকারভাবে নিজের ভেতরে ধারণ করেছেন মানুষটা, দুটো ঘন্টা মুগ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকা যায় পর্দার দিকে। পর্দাজুড়ে তার প্রভাবশালী বিচরণ, বাকীসব যেন জড়বস্তু! ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে কেন আট মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভিয়েশন পেয়েছিল সিনেমাটা, সেটা ফেলিক্সের অভিনয় আর টোড ফিলিপসের সুণিপুণ পরিচালনা দেখলে বুঝে নিতে কষ্ট হয় না মোটেও। জোয়াকিন ফেলিক্স যদি এবছর অস্কারটা না পান, আমি অন্তত ভীষণ হতাশ হবো।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button