ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

‘কফি হাউজের আড্ডা’ ও একজন গানপাগল রিকশাওয়ালা

ফেসবুকে স্ক্রল করতেই দুদিন আগে এক ভিডিও চোখে পড়লো। মাথায় ক্যাপ পড়া একজন মানুষ গান গাচ্ছেন, সামনে এক রিকশা। তিনি সম্ভবত এই রিকশার চালক। আশেপাশে অদ্ভুত আলো তৈরি করেছে সড়ক ধারের বাতিরা। সেই আলোয় মানুষটা গাইছেন, নস্টালজিক এক গান। কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই।

rickshaw puller, রিকশাচালক জহুরুল ইসলাম গায়ক কফি হাউজের আড্ডা
জহুরুল ইসলাম যখন ‘কফি হাউজের আড্ডা’ গানটি গাইছিলেন

আহা! সেই পুরানো সুর, একদম পথে প্রান্তরে খোলা গলায় বসে ল্যাম্পপোস্টের আলোর তলায় এই সুর অন্যরকম এক মূর্ছনার সৃষ্টি করলো। এতো মজা করে গাইছিলেন ভদ্রলোক যে, নিজেও গানটা গুণগুণ করতে শুরু করলাম…

নিখিলেশ প্যারিসে, মইদুল ঢাকাতে, নেই তারা আজ কোন খবরে
গ্রান্ডের গিটারিষ্ট গোয়ানিস ডিসুজা ঘুমিয়ে আছে যে আজ কবরে
কাকে যেন ভালবেসে আঘাত পেয়ে যে শেষে
পাগলা গারদে আছে রমা রায়…

যিনি এই গানটা গাইলেন, তিনি এই শহরের একজন রিকশাচালক। তার নাম জহুরুল ইসলাম। আমি অনেক রিকশাচালককেই মনের আনন্দে গান গাইতে শুনেছি। কিন্তু, বলতে দ্বিধা নেই ভিডিও’তে দেখা এই রিকশাচালক মানুষটাকে বেশ ব্যতিক্রম লেগেছে আমার কাছে।

তার কন্ঠে গানটা ভালোই মানিয়ে গেছে। উচ্চারণও প্রায় শুদ্ধ, সুরের জায়গাতেও খটকা বাঁধেনি খুব একটা। নিজের জায়গা থেকে সেরা আবেগ ঢেলে দিয়েই তিনি গানটা গাইছিলেন। বোধহয় একারণে গানটা শুনে মানুষ এতোটা কানেক্টেড ফিল করেছে।

এই রিকশাচালক মানুষটির গান ফেসবুকে ছড়িয়েছে এসএম সুজা নামক এক ব্যবহারকারীর কল্যাণে। তিনি মুহুর্তগুলো ধারণ করছিলেন। গানের তালে তালে গিটার বাজিয়েছিলেন নাজমুল হাসান নামের আরেকজন।

ধানমন্ডির আলমাসের গলিতে বসে এই গানটি গান রিকশাচালক, রাতের শহরে যে সুর নস্টাজলিয়া উশকে দেয়, সোডিয়াম বাতির আলো যে গানে মাখামাখি হয়ে অদ্ভুত আবেশ তৈরি করে।

আরো পড়ুন- নির্মাণ শ্রমিক থেকে কবি – প্রবাসী বাঙ্গালির অবিশ্বাস্য রুপান্তরের গল্প!

জহুরুল ইসলামের বর্তমান নিবাস হাজারীবাগের বটতলা বালুর মাঠ ঘেঁষা এলাহি গ্যারেজে। এখানেই এই রিকশার গ্যারেজ থেকে প্রতিদিন সকালে তার গন্তব্যের শুরু। খানিকটা অন্যরকম তিনি। একটু যেন উদাসীন। গ্যারেজের অন্যরা তাকে শিল্পী বলেই ডাকে। তিনি গানের কারণেই এই বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন সেখানে। চার বছর ধরে আছেন এখানে। কিন্তু, রিকশা চালাতে তার খুব যে ভাল লাগে তা নয়। তবুও জীবিকার তাগিদে না চালিয়ে উপায় কি?

জহুরুল ইসলাম, ভাইরাল রিকশা চালক

স্বভাবে একটু দিলখোলা তিনি, মনের মধ্যে অবারিত স্বাধীনতার জোয়ার তার। নিজের মতো করে চলেন। মনের খুশিতে গান গাইতে শুরু করেন যখন তখন। জীবন নিয়েও অভিযোগ নেই। যখন খুব ক্লান্ত হন রিকশা চালাতে চালাতে তখনই কোথাও একটু ব্রেক দেন। বিরতিটা জমে উঠে যখন জহুরুলের গলায় শোনা যায় গান। হাসি খুশিতে আর গানে গানে মুখরিত হয়েই কাটুক না এক জীবন, ক্ষতি কি- এমন একটা জীবন যাপন যেন করেন তিনি!

তিনি এই জীবনযাপনকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন,
“বেশিক্ষণ রিকশা চালাতে ভালো লাগে না। ক্লান্ত লাগে। আমি তো চা-সিগারেট খাই না। এই রিকশার গ্যারেজে রিকশার জন্য দিনে শুধু ১০০ টাকা দিতে হয়। থাকা ফ্রি। তাই বাড়িতে টাকা পাঠানোর মতো আয় হলেই আর অত চালাই না। সুযোগ পেলেই নিরিবিলি জায়গায় বসে গান গাই।”

তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে, বাঘবাটি গ্রামে। পড়ালেখা করেছিলেন এসএসসি অবধি। একসময় তাঁত বোনা পেশায় ছিলেন। কিন্তু, এখন আর ওদিকে কেউ এই পেশায় নেই। তাই সেই কাজ ছেড়ে নতুন কিছু ভাবতে হয়েছে তাকে। পিতাহীন জহিরুলের অসুস্থ মা গ্রামে থাকেন। জহুরুল বিবাহিত, গ্রামে তার স্ত্রী ও তিন সন্তানও থাকে।

তাদের জন্যে টাকা পাঠানোর চিন্তা তো থাকেই মাথায়। ঢাকায় তাই জীবিকার সন্ধ্যানে পথে পথে তিন চাকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো জীবন তার। গানটা শেখা হয়নি কখনো ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও। আর্থিক অসঙ্গতি মানুষের কত স্বপ্ন অপূর্ণ করে রেখে দেয়।

তিনি নিজের গান নিয়ে এভাবে বলেন, “জীবনে তো অনেক কিছু করেছি। কিন্তু বরাবরই গানটা খুব ভালোবাসি। কোথাও গান বাজলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতাম। শেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু আমার গান সবাই পছন্দ করে। ফোন দিলে ছেলেমেয়েরা বলে, বাবা গান শোনাও। আমার বউ পারভীনও আমার গান পছন্দ করে।”

তাতে কি, জহুরুল শুনে শুনেই গান শিখতে চেষ্টা করেন। কিংবদন্তি সব শিল্পীদের গান শুনতে তার ভাল লাগে। মান্না দের এই গানটা কেন যেন তার খুব প্রিয়, এই গানটা প্রায়ই শোনা যায় তার গলায়। গানের সাথে সাথে যেন নিজেও একটু পুরানো দিনে ঘুরে আসেন, মানুষের প্রিয় বলতে আছেই তো কিছু স্মৃতি, যাপিত অসহ্য বর্তমানের আড়ালে খানিকটা আশ্রয় হয় নস্টালজিয়া, পুরানো দিনের বর্ণালী দিনগুলো।

জহুরুল বোধহয় গানে গানে তাই ফিরে যান স্মৃতির পাতায়। তাই অচেনা এক রিকশাচালকের স্ট্রিট লাইটের তলায় বসে গাওয়া গান, আমাদের নস্টালজিয়াও উশকে দেয় ভীষণভাবে। সুরের শক্তি বোধহয় এটাই। জাত, পাত, উঁচু নিচু ভেদাভেদের সীমারেখা চূর্ণ করে দিয়ে সবাইকে এক কাতারে, এক সুরে গেঁথে দেয়….

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button