এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

জিন্নাহরা মরে না, ভূত হয়ে বেঁচে থাকে অমিত শাহ’দের রূপে!

১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দম্ভভরে বলেছিলেন- ‘উর্দু, এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা!’ জিন্নাহ’র সেই উক্তির প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল পূর্ব বাংলা, ৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারী তো সেই প্রতিভাদেরই ফসল। পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছিল প্রতিবাদী জনতা, মাতৃভাষার মর্যাদার দাবীতে, নিজের মুখের ভাষাকে রক্ষার দাবীতে। যে হৌরব বিশ্বের আর কোন জাতির নেই, সেটা বাঙালীর আছে, আমরা ভাষার জন্যে বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছি রাজপথে।

জিন্নাহ মরে ভূত হয়ে গেছেন, তার কবরের নামফলকে উর্দুর পাশাপাশি এখন খোদাই করে লেখা আছে বাংলা হরফ। যে বাংলা ভাষার বিরোধীতা তিনি করেছেন আজীবন, মৃত্যুর পরে সমাধীতে সেই বাংলাকে আঁকড়ে ধরতে হয়েছে। জিন্নাহ না থাকলেও তার উত্তরসূরীর অভাব হয়নি। ভারতেই যেমন একজন এসে গেছেন, নাম তার অমিত শাহ। ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা অমিত শাহ সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রবর্তনের। ‘এক রাষ্ট্র, এক ভাষা’- এই মিশনে নেমেছেন অমিত শাহ।

রাজ্যসভায় এক বক্তব্যে অমিত শাহ বলেছেন- ‘‘ভারতে বহু ভাষা আছে। প্রত্যেকটির আলাদা গুরুত্বও আছে। কিন্তু দেশের একটি রাষ্ট্রভাষা থাকা প্রয়োজন, যাকে বিশ্ব স্বীকৃতি দেবে ভারতীয় ভাষা হিসেবে। যদি কোনও ভাষা দেশকে বাঁধতে পারে, তা হচ্ছে হিন্দি। আমাদের প্রাচীন দর্শন, আমাদের সংস্কৃতি, স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে গেলে আমাদের স্থানীয় ভাষাকে শক্তিশালী করতেই হবে। সে ক্ষেত্রে একটাই ভাষা আছে, যা গোটা দেশ জানে… স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে যদি হিন্দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়, তা হলে সংগ্রামের সমগ্র আত্মাটাই বিনষ্ট হয়ে যায়।”

অমিত শাহ’র এই বক্তব্যের পর থেকেই শুরু হয়েছে সমালোচনা। সেই প্রাচীনকাল থেকেই ভারত বহু ধর্মের দেশ, বহু ভাষার দেশ, বহু জাতিস্বত্বা ও সংস্কৃতির দেশ হিসেবে পরিচিত। ভারত স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে, পরের বছর সেদেশের সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন ভীমরাও আম্বেদকর। সেই সংবিধানের কোথাও লেখা ছিল না ‘রাষ্ট্রভাষা’ বিষয়ে, ভারতের কোন রাষ্ট্রভাষাই ছিল না। হিন্দিকে সেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবেও সোয়াশো কোটি মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে বিজেপি সরকার।

অথচ ২০১১ সালের এক আদমশুমারীতে দেখা গিয়েছিল, ভারতের প্রতি দশজন নাগরিকের মধ্যে চারজন হিন্দিতে কথা বলে, বাকী ছয়জনই বাংলা, আসামীজ, তেলুগু বা অন্য কোন ভাষাভাষী। হিন্দি বেল্টের রাজ্য বলতে মূলত মুম্বাই, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ আর হিমাচলকেই বোঝানো হয়। কাশ্মিরের লোকজন কথা বলে উর্দুতে, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ছাড়া আর কোন ভাষাই প্রচলিত নেই, বিহারে বিহারী, আসামে অসমিয়া, আর দক্ষিণ ভারতের একেকটা রাজ্যে একেক ভাষা- সেগুলোর সঙ্গে হিন্দির দূরতম যোগাযোগও নেই। মিজোরাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড বা সিকিমের মতো জায়গার ভাষাও হিন্দি নয়। অথচ সেই হিন্দিকেই রাষ্ট্রভাষা বানানোর জন্যে উঠেপড়ে লেগেছেন অমিত শাহ এবং তার বিজেপি।

দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে হিন্দি ভাষার স্থান নেই বললেই চলে। তারা হিন্দিতে কথা বলে না, এসব রাজ্যে স্কুল-কলেজ বা অফিস আদালতের কোথাও হিন্দি ব্যবহৃত হয় না। ট্যাক্সি চালক থেকে বাসের হেল্পার, অফিসের কেরাণী থেকে মুদি দোকানদার- সবাই স্থানীয় ভাষায় কথা বলে। তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, হায়দরাবাদ, কেরালা বা গোয়া’র মতো রাজ্যগুলোতে দক্ষিণী এসব ভাষাই প্রচলিত, এখানকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে সবকিছুই স্থানীয় ভাষার আধিপত্য। হিন্দির কোন ঠাঁই নেই এখানে। এসব রাজ্যের কয়েক কোটি জনগণ তাদের মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজী ভাষা ব্যবহার করে, হিন্দি নয়।

বিজেপির যুক্তি, হিন্দুস্থান কায়েম করতে হলে হিন্দির বিকল্প নেই। অথচ কোটি কোটি মানুষের মতের বিরুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা যে আত্মঘাতি, দেশকে ভাগ করে ফেলবে ভাষার এই বৈরীতা- সেটা নিয়ে তাদের ভাবনাই নেই। দক্ষিণী সুপারস্টার রজনীকান্ত থেকে শুরু করে শত শত সেলিব্রেটি, ক্রিকেটার, লেখক, সাংবাদিক, বিরোধী রাজনীতিবিদ, এমনকি বিজেপির দক্ষিণী মূখ্যমন্ত্রীরাও হিন্দির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। মাস তিনেক আগে জাতীয় শিক্ষানীতিতে হিন্দি ভাষা জোর করে আরোপ করেছিল সরকার, সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ইংরেজী আর হিন্দি- এই দুই ভাষায় উত্তর দেয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছিল তখন। দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রগুলোর বিরোধিতার মুখে পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসে কেন্দ্রীয় সরকার।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, মোদি-অমিত শাহ জুটি যখন গুজরাটের রাজ্য সরকারে ছিলেন, তখন গুজরাট হাইকোর্ট এক রায়ে জানিয়েছিল, গুজরাটিদের জন্যে হিন্দির বিদেশী ভাষার শামিল, তাদের ওপর জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেয়া যাবে না। তখন সেই রায়কে স্বাগত জানানো অমিত শাহ এখন হিন্দি চাপিয়ে দিতে চাইছেন পুরো ভারতের ওপর, ভারতের মানুষ কি চায়, সেটা শোনার সময় তাদের নেই। ভারত মানে তারা শুধু দিল্লিকে বোঝেন, মুম্বাইকে বোঝেন। এর বাইরেও যে বিশাল একটা ভারত, শতকোটি মানুষ আছেন, সেটা বোঝার চেষ্টা তারা করছেন না। জিন্নাহরা মরে যান, কিন্ত তাদের ভূতগুলো থেকে যায় যুগের পর যুগ- অমিত শাহদের মাধ্যমেই…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button