ইনসাইড বাংলাদেশরক্তাক্ত একাত্তর

সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্র: জুয়েলের শেষ অপারেশন

১৯ আগস্ট, ১৯৭১

রামপুরা বিল। ওপারে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন। কোনোভাবে উড়িয়ে দিতে পারলেই ঢাকার বেশিরভাগ এলাকা অন্ধকার হয়ে পড়বে। এপারে বাড্ডার পিরুলিয়া গ্রাম থেকে দুটো নৌকায় বিদ্যুৎ স্টেশন রেকি করতে যাচ্ছে ১০ জন গেরিলা। অন্ধকারে হঠাৎ একটা নৌকার আকার নড়ে উঠতে দেখা গেল। হাঁক এল, কে যায়?

কাছে আসতেই বোঝা গেল, নৌকা ভর্তি পাকিস্তানী মিলিটারি। কমান্ডারের নির্দেশে সবার স্টেনগান পাটাতনের নিচে রাখা ছিল, কেবল বদিউল আলম ছাড়া। এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে কোলের উপর রাখা স্টেন তুলে ব্রাশফায়ার করল বদি, খালি হয়ে গেল পুরো ম্যাগাজিন। উল্টে যাওয়া পাকি নৌকা থেকেও জবাব এল, আগুনের ফুলকি আর বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধে হঠাৎ ভরে গেল জায়গাটা। ব্রাশফায়ারের পরেই বদি পড়ে গিয়েছিল পানিতে, তোলার পর দেখা গেল ওর কিছু হয়নি। পাকিদের গুলিতে ফুটো হয়ে যাওয়া নৌকার সবাইকে ২য় নৌকায় তোলা হয়েছে, এমন সময় হঠাৎ অবাক গলায় বলে উঠলো জুয়েল, আমার আঙ্গুলে যেন কি হইছে রে…

পেন্সিল টর্চ জ্বালিয়ে দেখা গেল, ডানহাতের তিনটা আঙ্গুল দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে। রক্তে জায়গাটা একাকার, মনে হয় গুলি আঙ্গুল ভেদ করে বেরিয়ে গেছে।

বাড্ডায় ফিরে আসে ওরা। জুয়েলকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে আজাদ, ‘জুয়েল, খুব ব্যথা লাগতেছে’?

সদারসিক হাস্যজ্বল জুয়েল হাসিমুখে জবাব দেয়, হেভি আরাম লাগতেছে। দেশের জন্য রক্ত দেওয়া হইল, আবার জানটাও রাখা হইল। কইয়া বেড়াইতে পারুম, দেশের জন্য যুদ্ধ কইরা আঙ্গুল শহীদ হইছিল… হা হা হা…

আজাদ জুয়েলের সাথে হাসিতে যোগ দিতে পারে না। ভয়ংকর যন্ত্রনায় বারবার কুঁকড়ে যাওয়া জুয়েলের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব অসহায় বোধ করে। ওর হাতের রক্তপাতটা তো এখনও বন্ধ হল না। ও আবার ব্যাট ধরতে পারবে তো?

ডাঃ আজিজুর রহমান জুয়েলের ব্যান্ডেজ বাঁধা আঙ্গুলগুলো দেখে আঁতকে ওঠেন। ব্যান্ডেজ খুলে ড্রেসিং করবার সময় ক্রমেই খারাপের দিকে যেতে থাকা আঙ্গুলগুলোর দিকে চেয়ে তার ভাবনাটা জুয়েল ধরতে পারে। মিনতির সুরে বলে, দেশ স্বাধীন হইলে আমি ন্যাশনাল টিমের হয়ে ওপেনিংয়ে নামুম, ক্যাপ্টেন হমু। আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার, প্লিজ… অসাধারণ পুল খেলতো ছেলেটা, সুইপ, স্লগ সুইপে ওর জুড়ি মেলা ভার ছিল। দাঁড়াতে দিত না বোলারকে, নাকের জল-চোখের জল একাকার হয়ে যেত বেচারা বোলারের । বল জিনিসটা যে পেটানোর জন্য,এটার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ছিল তার ব্যাটিং …

স্বাধীন বাংলাদেশের হয়ে এভাবেই খেলার স্বপ্ন ছিল ছেলেটার … ওপেনিংয়ে নামবে, পিটায়ে তক্তা বানাবে পাইক্কাদের। আহত হবার পর আলমের বাড়িতেই আসমা ওর ছোট বোন আসমা জুয়েলের ভাঙ্গা তিনটা আঙ্গুল ড্রেসিং করতো প্রতিদিন, অসম্ভব কষ্ট হতো ছেলেটার, তাই গল্পে ভুলিয়া রাখত ওরে… একদিন জিজ্ঞাসা করছিল, জুয়েল, রকিবুল হাসান তো অল পাকিস্তান টিমে চান্স পাইল। তুমি পাইবা না?

— (জুয়েলের সাথে রসিকতায় কে পারবে?) আরে, কী যে বলো মেজপা। আমারে এইবার নিউজিল্যান্ডের এগেইনেস্টে নিল না বইলাই তো আমি অল পাকিস্তানই ভাইঙ্গা দিতাছি। খালি দেশটা স্বাধীন হইতে দাও, আমরা বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম বানামু। এইটাতে আমি ঠিকই চান্স পামু, দেইখেন।

— তা তো পাইবাই। ওপেনার ছাড়া টিম হইব ক্যামনে? কিন্তু পাকিস্তান টিমেও মনে হয় চান্স পাইতা…

— আরে আবার পাকিস্তান!! পাকিস্তানরে তো বোল্ড করে দিতেছি… একেবারে মিডিল স্ট্যাম্প উপড়ায়ে ফেলতেছি। উফ… আস্তে মেজপা, ব্যথা লাগে তো…

— সরি। তোমার আঙ্গুল তিনটা যে কবে ভালো হবে…

— হ, শালার এই আঙ্গুল তিনটা নিয়াই টেনশনে মরতাছি। কচু ভালো হয় না ক্যান? কবে যে আবার ব্যাট ধরতে পারুম… সাধ মিটাইয়া পিটাইতে পারুম…

একটাবার যদি ওরে ব্যাট হাতে পিটাইতে দেখতে পারতাম… একটাবার…

যন্ত্রণা… বড় যন্ত্রণা…

*

দেশটা স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীন দেশের হয়ে আর ওপেনিংয়ে ব্যাট করতে নামার সুযোগ হয়নি অবিভক্ত পাকিস্তানের অন্যতম সেরা ওপেনার আব্দুল হালিম খানের। ১৯৭১ সালের ২৯শে আগস্ট আলবদর কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামীর চর বদর সদস্য কামরুজ্জামানের তথ্যে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে আহত জুয়েল, ক্রিকেটার পরিচয় পেয়ে তার ভাঙ্গা আঙ্গুলগুলো মুচড়াতে মুচড়াতে একেবারে ভেঙ্গে ফেলেছিল পাকি মেজর। ক্র্যাকপ্লাটুনের অন্য সবার সাথে জুয়েলকেও মেরে ফেলা হয় সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে, সার্বিক তত্ত্বাবধান আর নেতৃত্বে ছিল আলবদরের সর্বেসর্বা জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ।

*

জুয়েলের স্বপ্নে দেখা সেই স্বাধীন বাংলাদেশে আজ ৪৪ বছর পর পাকিস্তানের অসংখ্য সমর্থক দেখতে পাওয়া যায়। চাঁদতারা পাকিস্তানি পতাকা গালে-মুখে এঁকে, পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে পাকিস্তান জিন্দাবাদ শ্লোগান তোলে শহীদ জুয়েলের উত্তরসূরি প্রজন্ম, পাকিস্তানী ক্রিকেটার আফ্রিদির শয্যাসঙ্গী হবার অবদমিত বাসনায় শীৎকার দিতে থাকে কিছু আপু, শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের শহীদ জুয়েল স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম গণহত্যা চালানো পাকিস্তানীদের মুসলমান ভাই হিসেবে বুকে টেনে নিতে চায় প্রজন্মের আধুনিক সন্তানেরা। ৩০ লাখ শহীদের চাপ রক্ত, চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম, শহীদ জুয়েলের ভাঙ্গা তিনটা আঙ্গুল, ভয়ংকর মোচড়, তীব্র আর্তচিৎকার—এইসব সবকিছু ব্যাকডেটেড ইতিহাস মাত্র। এইগুলা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে বোকারা, প্রজন্ম বোকা না। জুয়েলের মতো তারছিঁড়া পাগলেরা একটা স্বাধীন দেশের জন্য উদ্ভট বোকামি করতেই পারে, নতুন প্রজন্মের আধুনিক এই তরুণদের কি সেই বোকামি করলে চলে?

মাথার ভেতর খালি একটা লাইন ঘোরে,

দেশ স্বাধীন হইলে আমি ন্যাশনাল টিমের হয়ে ওপেনিংয়ে নামুম, ক্যাপ্টেন হমু। আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার, প্লিজ…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button