মতামত

যেমন খুশি তেমন সাজো!

কিছুদিন আগে একটি খবর চারদিকে ভাইরাল হলো। একজন কৃষক মনের দুঃখে নিজের ফসলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে। ধান কাটার পারিশ্রমিকের তুলনায় ধানের দাম কম। তাই কষ্টের ফসল ঘরে তোলা কৃষকের জন্য অনেকটা খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি টাইপ অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। তাই মনের ক্ষোভে তিনি এই কাজ করেন।

মধ্যস্থ ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেট ইত্যাদি জটিলতর বিষয় কৃষককে ন্যায্য মূল্য বঞ্চিত করে যাচ্ছে বছরের পর বছর। এখানে সরকারের স্বদিচ্ছা আছে ধরে নিলেও আমরা দেখতে পাই, কৃষকরা আসলে বেশিরভাগ সময়ই ন্যায্য মূল্য পেতে দূর্ভোগ পোহান। এখানে একজন কৃষক জমিতে আগুন জ্বালিয়েছেন, এটা মূল সংকট নয়। এটা নিয়ে রাজনীতি করার কিছু নেই। সমস্যার গভীরে গিয়ে আমাদের ভাবা উচিত। শহরে বসে আমরা যতই আর্তনাদ করি, ফেসবুকে ঝড় তুলি তাতে করে কৃষকের সমস্যা কতটুকু সমাধান হয় আমার জানা নেই। আমরা শর্টটাইম সমাধান নিয়ে বেশি চিন্তিত। আবেগ দিয়ে বেশি ভেবে ফেলি৷ তাই রাজনীতিবিদরা বিবৃতি দিয়ে কাজ সারেন। বিরোধী দল নতুন ইস্যু খুঁজে পেয়ে খুশিতে একটু সরকার বিরোধী বক্তব্য চালাচালি করেন।

আমাদের খাদ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিয়েছিলেন সেই ঘটনা নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সরকারকে বিব্রত করতেই ঘটানো হয়েছে। আবার মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, আগুন দেয়ার ঘটনা নাকি বাংলাদেশে ঘটেইনি। তার দাবি উক্ত ঘটনা পাঞ্জাবের। বিএনপিও এই ইস্যুতে সরকার বিরোধী বিবৃতি দিয়েছে। তারা অবশ্য এমনিতে আজকাল বিবৃতি নির্ভর, মিডিয়া নির্ভর রাজনীতিতে অভ্যস্থ। ভাল কি আর আশা করা যাবে! এতে করে যা হয়, মূল ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে রাজনীতির বাক বিতন্ডা বাড়ে। আর কিছু না।

কৃষক আগুন লাগিয়েছেন জমিতে, এটা সাময়িক কোনো সমস্যাকে এড্রেস করে না। মূল কথা হলো, কৃষকের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির সংকটটি অনেক পুরানো। এটা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু কেউ স্বীকার করতে চান না। ফলে কালো চক্র ঘুরতেই থাকে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, গোলাম রাব্বানী
image source- Facebook

তবুও, একটা দিক লক্ষ্যণীয় এই ঘটনায় ছাত্ররা ইতিবাচক কিছু ভূমিকা নিয়েছে। প্রতিবাদের পাশাপাশি তারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের ধান কেটে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু, এটাও নিশ্চয়ই সমাধান না। তবুও, এই উদ্যোগকে প্রতীকী অর্থে ইতিবাচকভাবে দেখি৷

মূল ধারার ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নামক সংগঠনটিও দেরিতে হলেও কৃষকদের পক্ষে একটি ভূমিকা নিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটিকেও ইতিবাচক হিসেবেই দেখা উচিত। কিন্তু, কৃষককে সাহায্য করার উসিলায় সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা যে বেশভূষা ধারণ করেছেন তা সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসির খোরাক হয়েছে।

ছোটবেলায় স্কুলে দেখতাম ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতা হতো। অনেকে খুব শখ করে অনেক কষ্ট করে বিভিন্ন রুপ ধারণ করত। কেউ শিক্ষক, কেউ ঘটক, কেউ জামাই বউ সাজতো। কেউ কেউ সাজতো ভিক্ষুক, কৃষক। সাদা গেঞ্জি, লুঙ্গি, মাথায় কৃষকের একধরণের বিশেষ টুপি পড়ে তারা কৃষক সাজতো। ব্যাপারটাকে রিয়েলিস্টিক করতে গেঞ্জিটা একটু ময়লা করে দুই একজায়গায় ছিঁড়ে নিত। বাংলার কৃষককে রিপ্রেজেন্ট করার কি দুর্দান্ত আইডিয়া!

অনেকদিন পর ছাত্রলীগের ক্ষেতের মধ্যে ফটোসেশান দেখে ছোটবেলার ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতার কথা মনে পড়ে গেল। সাজসজ্জায় তা যেকোনো ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার মতোই হয়েছে। কোমরে গামছা বেন্ধে, সাদা লুঙ্গির সাথে সাদা গেঞ্জি পড়ে তারা দলবেধে কৃষকের উপকার করতে গেছেন। তারা যে ছাত্রলীগ, জনগণের বন্ধু, কৃষকের আস্থা তা প্রমাণ করতে গেঞ্জিতে নিজেদের সংগঠনের লোগোও ব্যবহার করেছেন। আদি ও আসল ছাত্রলীগ হবার প্রমাণ।

যেমন খুশি তেমন সাজো

এইটুকু পর্যন্তও কোনোরকম হজম করা গেছে। কিন্তু, একদম দলবেঁধে হৈ হুল্লোড় করে তারা যে ফটোসেশানে মত্ত হয়েছেন তা খানিকটা দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে। দেখে মনে হয়, ফ্যাশন হাউজের শ্যুটিং কিংবা কোনো করপোরেট হাউজের ইমোশনাল বিজ্ঞাপনের ফটোসেশান। কত রকম ভঙ্গিমায় বাকা হয়ে দাঁড়িয়ে, হাতে ধানের শীষ নিয়ে ছবি তোলা হয়েছে। দেখে বড় ভাল লাগে। কিন্তু, এটা দিয়ে কি প্রমাণ হয় আসলে?

কৃষকের পক্ষে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে ছাত্রলীগ কিছু সাংগঠনিক বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে। তাদের ইনটেনশন সৎ হলে এটাকে নেতিবাচকভবে দেখার কোনো কারণ নেই। কিন্তু, এটা কয়েকদিনের ফটোসেশান উৎসব না হয়ে গেলেই বাঁচি। সংগঠন, দল, মত নির্বিশেষে সবারই কৃষকের পক্ষে থাকা উচিত। কথা বলা উচিত। সমস্যার উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা করা উচিত।

কৃষকদের সমস্যাকে ব্যবহার করে যার যার পলিটিকাল কারেক্টনেস নিয়ে চিন্তিত না হয়ে, কারেক্ট কাজ করা নিয়ে চিন্তিত হওয়া উচিত…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button