মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

আজ যদি জেসিন্দার জায়গায় শেখ হাসিনা থাকতেন…

ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে খ্রিষ্টান এক জঙ্গীর হামলার পর থেকেই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্দা আরদার্ন মোটামুটি যুদ্ধই ঘোষণা করেছেন, এবং পাশাপাশি নিজের দেশের মুসলিম কমিউনিটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। প্রতিকূলতার সময়ে জেসিন্দা আরদার্নের এই ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিশ্বজুড়েই। নিউইয়র্ক টাইমস আজই একটা কলাম ছেপেছে, যেটার শিরোনাম হচ্ছে- ‘ট্রাম্প নয়, জেসিন্দার মতো নেতাকেই আমেরিকার দরকার!’ কথাটা মোটেও উড়িয়ে দেয়ার মতো কিছু নয়। উগ্রপন্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে নেতা হিসেবে যে কোন বিচারেই জেসিন্দা এগিয়ে থাকবেন। ভালোবাসা আর মমতার যে বিশাল সম্ভার নিয়ে তিনি আক্রান্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, সেটাকে কোন বিশেষণে বিশেষায়িত করা যাবে না বোধহয়।

যাই হোক, আমাদের দেশের মানুষজনও জেসিন্দা আরদার্নের কর্মকাণ্ডে তালিয়া বাজাচ্ছেন, সাধুবাদ জানাচ্ছেন। তবে অবাক করার মতো ব্যাপার হচ্ছে, এদের মধ্যে বড় একটা অংশ জেসিন্দার প্রশংসা করছেন কেবলমাত্র তিনি মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে। আক্রান্তের জায়গায় যদি মুসলমানের পরিবর্তে খ্রিষ্টান বা ইহুদীরা থাকতেন, আজ যদি জেসিন্দা সেই কমিউনিটির লোকজনের পাশেই এভাবে এসে দাঁড়াতেন, তাহলে আমাদের অনেকেই খোঁজও রাখতো না, কেউ কেউ আবার জেসিন্দার এসব কর্মকাণ্ডকে নাটক আখ্যা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না! জ্বী, আমরা তো এমনই।

ভাবুন তো, বাংলাদেশে যদি হিন্দু-বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টানদের ওপর এরকম একটা হামলা হতো, পঞ্চাশজন নিরীহ মানুষকে মেরে ফেলতো কোন উন্মাদ মুসলিম জঙ্গী, তখন আমাদের মধ্যে অনেকেই কি সেই জঙ্গীর কার্যক্রমকে হালাল করার মিশনে নেমে পড়তেন না? জেসিন্দা আরদার্ন আক্রান্ত মুসলিমদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, হিজাব পরেছেন, পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সালাম দিচ্ছেন বলে বাঙালী মুসলমানেরা আজ তার নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে, এই কাজটাই যদি শেখ হাসিনা করতেন, সেই একই মানুষগুলোকেই গালির ফোয়ারা বইয়ে দিতে দেখা যেতো, এমনই হিপোক্রেট আমরা!

গুলশানের হোলি আর্টিজানে হামলা হলো বছর তিনেক আগে, হতাহতের সংখ্যা ছিল অনেক, এদের মধ্যে বিদেশী নাগরিকের সংখ্যাই বেশি। শেখ হাসিনা তখনও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। জেসিন্দা আরদার্ন হিজাব পরে শোকসভায় অংশগ্রহণ করায় যারা তালি দিচ্ছেন, শেখ হাসিনা যদি হোলি আর্টিজানের ঘটনার পরে আক্রান্ত মানুষগুলোর শেষকৃত্যে তাদের রীতিমতোই অংশগ্রহণ করতেন, এখনকার প্রশংসাকারীদের অনেকেই শেখ হাসিনাকে শূলে চড়াতেন।

এমনিতেই আওয়ামী লীগ সরকারকে ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট মনে করা মানুষের অভাব নেই। এদেশের অজস্র মানুষ এই ধারণায় বিশ্বাস করে যে, ভারতের সাহায্য নিয়েই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে আছে, এবং দেশটাও তারা ভারতের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে! ঢাকা শহরের পাবলিক বাসের সিটের পেছনে লেখা থাকে, ‘শেখ হাসিনা ভারতের দালাল, আওয়ামী লীগ মুসলমানের শত্রু’… সেই দেশের ধর্মান্ধরা জেসিন্দা আরদার্নকে নিউজিল্যান্ডের সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াতে দেখে তালি বাজালেও, নিজের দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি একই কাজটাই করতেন, তাহলে গালির তুবড়ি ছুটিয়ে দিতো নিশ্চিত।

পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে জেসিন্দা আরদার্ন স্পিকারকে সালাম দিয়ে বক্তৃতা শুরু করেছেন, পবিত্র কুরআনের বানী উধ্বৃত করেছেন নিজের বক্তব্যে। আচ্ছা, শেখ হাসিনা যদি এরকম পরিস্থিতিতে সংসদে দাঁড়িয়ে গীতা বা বাইবেল থেকে দুটো লাইন উচ্চারণ করতেন, তাহলে কি আমাদের আশেপাশের উন্মাদ ধর্মান্ধরা ধর্মযুদ্ধের ডাক দিয়ে ফেলতো না? মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের নামে পাকিস্তানীরা অপপ্রচার চালাতো, শ্রী তাজউদ্দিন ভারতে গিয়া হিন্দু হইয়াছেন! জেসিন্দার জায়গায় যদি শেখ হাসিনা থাকতেন, আর নিউজিল্যান্ডের জায়গায় ঘটনাস্থল যদি বাংলাদেশ হতো, তাহলে তো শেখ হাসিনাকে হিন্দু বা খ্রিস্টান বানিয়ে দেয়ার মানুষের অভাব পড়তো না! পাকিস্তানীদের ভূতটা তো এখনও অনেকের মধ্যেই রয়ে গেছে!

এরকম হামলা যাতে আর না হয়, সেজন্যে নিউজিল্যান্ডের বিদ্যমান আগ্নেয়াস্ত্র আইনের সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছেন জেসিন্দা আরদার্ন এবং তার সরকার। সেদেশের সাধারণ মানুষও স্বতস্ফূর্তভাবে সাহায্য করছেন এই কাজে, লোকজন নিজেদের অধীনে থাকা লাইসেন্স করা বন্দুক জমা দিয়ে যাচ্ছেন পুলিশের কাছে। বাংলাদেশে যদি শেখ হাসিনার সরকার সংখ্যালঘু (শব্দটা ব্যবহারে আপত্তি আছে, তবুও করছি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই) সম্প্রদায়কে রক্ষার জন্যে এরকম কোন আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করে, তাহলে কি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলো রাস্তায় নেমে রাজপথ গরম করে ফেলতো না এতক্ষণে?

লেখার শেষপ্রান্তে চলে এসেছি, আবার মুদ্রার উল্টো পিঠটার কথাও বলে নেয়া যাক। বিশ্বজুড়েই জেসিন্দা আরদার্ন এবং নিউজিল্যান্ডের মানুষের প্রসংসা হচ্ছে, জেসিন্দা আরদার্ন যেটা করেছেন, সেটা তার কর্তব্য হিসেবেই করেছেন। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, মানুষের বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানোটা তার দায়িত্ব। নিউজিল্যান্ডের কেউ এখনও তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়ার দাবী জানিয়েছেন বলে শোনা যায়নি। কিন্ত আমাদের এখানে এরকম ঘটনা ঘটলে, নোবেলের দাবীতে কেউ কেউ রাস্তায় গড়াগড়ি খেতেন এতক্ষণে। রোহিঙ্গা ইস্যুর সময় এমন চিত্রই আমরা দেখেছি।

শেখ হাসিনা সবসময় বলেন, নোবেল বা অন্যকোন পুরস্কার তার কাছে বাড়তি কোন গুরুত্ব বহন করে না। মানুষের ভালোবাসাটাই তার কাছে মূখ্য। তবে তার আশেপাশে তো তেলবাজের অভাব নেই, এরকম কিছু ঘটলে তারা সারাক্ষণই ‘নোবেল নোবেল’ করে গান ধরতেন, অবিশ্বাস্য সব উপাধিতে ভূষিত করে ফেলতেন প্রধানমন্ত্রীকে, নিজের কাজ আর দায়িত্ব ভুলে গিয়ে লিপ্ত হতেন চাটুকারিতায়, যেমনটা আগেও হতে দেখেছি! ধর্মান্ধ আগাছাদের চেয়ে বরং এসব তেলবাজরা আরও বেশি ভয়ঙ্কর!

আরও পড়ুন- এক কোমল হৃদয়ের প্রধানমন্ত্রীর গল্প

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button