মতামত

আপনি ইন্টারনেট চালান ঠিক আছে, কিন্তু ইন্টারনেট যেন আপনাকে না চালায়!

নেটফ্লিক্সে নতুন একটা সিরিজ আসছে ‘ব্ল্যাক মিরর: বেন্ডারস্ন্যাচ’, আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টের অনেকেই দেখছেন। গত ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ রিলিজ হওয়া এই সিরিজটা আর দশটা টিভি সিরিজের মতো না।

সাধারণত কি হয়! একটা কাহিনী নিয়ে একজন পরিচালক সিনেমা/সিরিজ বানান, সেই সিরিজ/সিনেমার কাহিনীতে দর্শক হিসাবে আপনার হাত থাকে না, এটা পুরাপুরিই পরিচালক/স্ক্রিপ্ট রাইটারদের হাতে। কিন্তু এই সিরিজটা এমন না। এখানে সিরিজের বিভিন্ন পর্যায়ে আপনি ঠিক করে দিবেন চরিত্রগুলা কি করবে অর্থাৎ প্রতিটা পর্যায়ে আপনি সিলেক্ট করবেন পরবর্তীতে কি হবে এবং কাহিনী সেইভাবেই আগাতে থাকবে। এইটাকে বলে ‘Narrative Driven Gameplay’। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে এই জিনিস এটাই প্রথম এবং এটা যে খুবই আকর্ষণীয় সিরিজ হিসাবে দর্শকপ্রিয়তা পাবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই।

অবাক হচ্ছিও না। তবে কিছু কথা বলতে চাই।

ধরেন সিরিজের এক পর্যায়ে নায়ক গাড়ি কিনবে। আপনাকে প্রশ্ন করা হলো “নায়ক কোন ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনবে?”। চারটা অপশনঃ অডি, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্জ, টয়োটা। আমি হলে করতাম অডি কারণ আমার ফেভারিট গাড়ি হলো অডি। আপনিও নিঃসন্দেহে এই চারটার মধ্যে আপনার সবচেয়ে পছন্দ যেটা সেই গাড়িটা চুজ করতেন, এইটা কমন এবং স্বাভাবিক হিউম্যান বিহেভিয়র।

এখন আপনি দর্শক হিসাবে যেসব ডিসিশান দিচ্ছেন এই সিরিজে, নেটফ্লিক্স সেগুলা কালেক্ট করে। অর্থাৎ নেটফ্লিক্স চাইলেই এখন আপনার পছন্দের গান, ব্রেকফাস্টের পছন্দের সিরিয়ালের ব্র্যান্ড, পছন্দের গাড়ি, পছন্দের পোশাকের ব্র্যান্ড জানতে পারে। একইসাথে টিভি সিরিজের বিভিন্ন জায়গায় আপনার ডিসিশান মেকিং দেখে বোঝা সম্ভব যে আপনি মানুষ হিসাবে কেমন। যেমন আপনি কি ভায়োলেন্সওয়ালা মুভি পছন্দ করেন নাকি রোমান্টিক কিছু, আপনার প্রেমিকাকে আপনি ফুল উপহার দেন নাকি হীরার আংটি, চাকরিতে বসের সাথে প্রবলেম হলে আপনি রেগে যান নাকি ডিপ্লোমেটিকালি হ্যান্ডল করেন।

এমন না যে নেটফ্লিক্স এইগুলা আগে আইডিয়া করতে পারতো না। আপনার ওয়াচলিস্ট দেখে তারা আপনাকে মুভি সাজেস্ট করে মানে আপনার দেখা মুভিগুলা থেকে তারা বোঝার ট্রাই করে যে আপনার কোন জনরার, কোন ভাষার, কোন অভিনেতাদের মুভি পছন্দ এবং সেইভাবে আপনাকে সাজেস্ট করে। কিন্তু এখন কিছু ব্যাপারে তারা আরো বেশি সিওর হবে আপনার দেয়া ডিসিশানগুলা থেকে। একটা রিকোমেন্ডেশন সিস্টেমের এ্যালগোরিদমের জন্য এই তথ্যগুলা, বিশেষ করে আপনার ইমোশনের ডেটা, অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রশ্ন হলো এতো কথার কারণ কি? কারণ হলো আপনি যে তথ্যগুলা দিচ্ছেন সেটা থেকে নেটফ্লিক্স আপনার ব্যাপারে যেসব তথ্য জানতেছে সেগুলা ইউজ করতে পারে নানাভাবে। সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হলো তারা আপনার বিহেভিয়রের উপর বেজ করে মার্কেটিং করতে পারে। ধরেন আপনি Zara ব্র্যান্ডের পোশাক পছন্দ করেন, আপনাকে নেটফ্লিক্স ঐ কোম্পানির এ্যাড দেখাবে, আপনার ইমেইলে ঐ কোম্পানির এ্যাড পাঠানো হবে। ইমেইলও দরকার নাই, মোবাইল নাম্বারেও ম্যাসেজ দিয়ে কাজটা করা সম্ভব, ভুলে গেলে চলবে না যে কিছুদিন আগেই ফেসবুক যে নেটফ্লিক্সের কাছে ইউজারদের ফোন নাম্বার লিক করছে খবর বের হইছে।অর্থাৎ আপনার ফোন নাম্বার যে নেটফ্লিক্স জানে না, তার গ্যারান্টি নাই।

এখন আপনি বলতে পারেন যে ভাই আমি Zara পছন্দ করি, সেই কোম্পানির মেইল আমাকে দেয়া হচ্ছে; সমস্যাটা কোথায়!! সমস্যাটা হলো ‘ঘরের খবর পরে জানা’। আপনি Zaraর জিনিস পছন্দ করেন এইটা আপনার কাছের মানুষেরা জানবে। কিন্তু এখানে একটা কোম্পানি এই তথ্য জানছে এবং সেটাকে ইউজ করে বিজনেস করছে; এইটা আসলে আপনার প্রাইভেসির জন্য ক্ষতিকর। প্রথম কয়েকদিন হয়তো ভাল্লাগবে কিন্তু তারপরে বিরক্ত হবেন। মোবাইল কোম্পানির ম্যাসেজ দেখে যেমন বিরক্ত হন, এইগুলা দেখেও হবেন।

QUARTZ পত্রিকা এই সিরিজের ব্যাপারে নিউজের হেডিং দিছে “Black Mirror” isn’t just predicting the future—it’s causing it। এইটা সিরিজের কাহিনী হউক এবং আপনার ব্যাপারে হউক, দুই দিক থেকেই সত্য। ১০০ টাকার জিনিস ৪০% ছাড়ে ৬০টাকা দিয়ে কিনে আপনি ভাবতে পারেন ৪০টাকা জিতছেন; কিন্তু একইসাথে আপনি যে ৬০টাকা খরচ করলেন ঐটা কি আসলেই খরচ করার দরকার ছিলো? এটাও মাথায় রাইখেন। এই ডিল/ছাড় জিনিসটা হলো Provocative Marketing, আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না যে ৪০টাকা বাঁচাতে গিয়ে উল্টা আমরা ৬০টাকা খরচ করে ফেলতেছি যেটার দরকার ছিলো না।

ইন্টারনেটে আমরা বিভিন্ন কোম্পানির সার্ভিস ইউজ করি আমাদের দরকারে কিন্তু সেইসব সার্ভিসের প্রোডাক্ট যদি আমরা নিজেরাই হয়ে যাই তাহলে বিপদ। আপনি ইন্টারনেট চালান ঠিক আছে কিন্তু ইন্টারনেট যেনো আপনাকে না চালায় সেটা খেয়াল রাইখেন।

আস্তা লা ভিস্তা।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button