মতামত

এই ‘লস এ্যাঞ্জেলস’এ আসলে কোনো এঞ্জেল নাই, শুধু ডেমন আছে!

যশোরের এক ছোট গ্রাম থেকে উঠে আসা ছেলে, ধরি তার নাম স্বপন। কৃষক বাবার অভাবের সংসারে ৩ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। দুধ, ঘি, মাখন খেয়ে বড় হওয়ার সৌভাগ্য ওর হয়নি। জীবনের প্রতি ধাপে নানা বাধা-বিপত্তি পার হয়ে স্বপনকে লেখাপড়া করতে হয়েছে। মামা-চাচা ছাড়া ইট পাথরের শহরে নিজের যোগ্যতায় চাকরি জোগাড় করতে হয়েছে। বিয়ে করে বৌ নিয়ে ঢাকায় থাকা স্বপনের টাকাতেই তার ভাই-বোন দুইটা লেখাপড়া শিখছে, মানুষের মতো মানুষ হচ্ছে।

ব্যাংকার বাবা এবং স্কুল শিক্ষিকা মায়ের ঘরে জন্মানো ছেলে, ধরি তার নাম আবির। আবিরের বড় হওয়া, বেড়ে ওঠা সবই ঢাকায়। ভালো স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সৌভাগ্য ওর হয়েছে। স্বচ্ছলতার মধ্যে বড় হওয়া আবিরের বাবা-মার হেল্প লাগেনি, সে চাকরি পেয়েছে নিজের যোগ্যতাতেই। কিছুদিনের মধ্যেই তার বিয়ে, এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে। কনভেনশন সেন্টার না পাওয়াতে ডেট পিছাতে হয়েছে বিয়ের। স্বপন আর আবির একই অফিসে চাকরি করে, একই পজিশনেই চাকরি করে। এই দুইজনের অফিসে তাদের মতো আরো অসংখ্য আবির, স্বপনরা চাকরি করেন যাদের উপার্জনের উপরে তাদের পরিবার, পরিজন নির্ভরশীল।

এবার আমরা ধরে নেই যে সেই অফিস ভবনে আগুন লেগেছে। আবির আর স্বপন দুইজনই বের হতে পারেননি অফিস থেকে। ধোয়ায় দম বন্ধ হয়ে অথবা আগুনে পুড়ে তারা দুইজনই মারা গেছেন। স্বপনের স্ত্রী, আবিরের হবু স্ত্রী, তাদের দুইজনের পরিবার সবার স্বপ্নই দম বন্ধ হয়ে বা পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। আগুন ধনী, গরিব কাউকেই মানেনি। সাম্যবাদী আগুন সম্পূর্ণ আলাদা দুইটা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা এই দুইজনের কাউকেই ছাড় দেয়নি। সমানভাবে দগ্ধ করেছে দুইজনকেই। শেষ করে দিয়েছে দুইজনের পরিবারের আবিরমাখা স্বপ্নগুলোকে।

এইরকম আরো বহু স্বপন, আবিররা প্রতিদিন রাজধানীতে বিল্ডিং কোড না মেনে বানানো এমন অসংখ্য ভবনে চাকরি করছে। শিল্প-সাহিত্য না, কোনো উচ্চমার্গীয় জীবন দর্শন না, ফেসবুক-ইন্সটাগ্রামের বর্ণিল ফেইক লাইফের জন্যও না; নিতান্তই জীবনের প্রয়োজনে, বাঁচার তাগিদেই চাকরি করছেন তারা। না, তারা মারা যায়নি। তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। যে মানুষগুলা(!!) এই ভবন বানাইছে, যারা অনৈতিকভাবে এইসব ভবন বানানোর পারমিশন দিছে তারা সবাই মিলে মেরে ফেলেছে এদের।

ঢাকা, প্যারিস, ইবনে বতুতা, লস অ্যাঞ্জেলেস

অনেকের কাছেই সিঙ্গাপুর, লস এ্যাঞ্জেলস মনে হওয়া এই শহরকে মাঝে মাঝে উপর থেকে দেখলে ভিসুভিয়াস বলে ভ্রম হতে পারে। এই ‘লস এ্যাঞ্জেলস’এ আসলে কোনো এঞ্জেল নাই, শুধু ডেমন আছে। এই ডেমনরা ঠিক করে দেবে কে বাসের চাকার তলায় পিষে মরবে আর কে কাবাব হয়ে। এই ডেমনদের মধ্যে অনেকের চেহারাই অবিকল মানুষের মতো; আমার/আপনার মতো। এই জাদুর শহর, প্রাণের শহরে এইসব ডেমনেরা মিলে ঠিক করেছে তারা কাউকেই স্বাভাবিকভাবে মরতে দেবে না।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button