এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

কলকাতা, আসাম ও ত্রিপুরার বন্ধুদের সমীপে…

ভারতের হারে বাংলাদেশীদের উল্লাসের বিপরীতে ভারতীয় বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া পড়লাম। বেশিরভাগ প্রতিক্রিয়াই ছিল ক্রিকেটীয়। “নিজেরা ৮ নাম্বার হয়ে টেবিলের এক নাম্বার দলের পরাজয়ে হাসে, নির্লজ্জ জাতি” কিংবা রেন্ডিয়া ডাকার বিপরীতে তাদের বলা “কাংলাদেশ” আমাকে খুব একটা আহত করেনি। ইটের জবাবে পাটকেল আসে, তার জবাবে আসে গ্রেনেড। নিয়ম এটাই, এখানে হার্ট হবার কোনো কারণ নেই।

আমাদের কারো কারো সেলিব্রেশন ক্রিকেট ছাপিয়ে যেমন রাষ্ট্রে আঘাত করেছে, ভারতীয় বন্ধুদের প্রতিক্রিয়াও ক্রিকেটীয় ট্রল-তাচ্ছিল্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই চর্চা গত একদিনের না, ফেসবুক আসার পর থেকে নিয়েই ভারতীয় বন্ধুদের লেখা বা মন্তব্য পড়ে বুঝতে পারলাম তারা বাংলাদেশ ব্যাপারে কিছু স্থায়ী চিন্তা নিয়ে ঘুরেন। সেগুলোর জবাব দিতেই লিখছি আজকে।

অনেক ভারতীয় মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে ভারত নামক মহান রাষ্ট্র নিতান্ত করুণা বশত জন্মদান দিয়েছে এবং মায়ের মমতায় সুরক্ষা দিয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। এই ধারণা একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমাকে যথেষ্ট আহত করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন রক্ত বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জেনোসাইডের প্রতিদানে এই দেশ এখন স্বাধীন। সেই যুদ্ধে ভারতের সাহায্য ছিল এবং ভারত সাহায্য না করলে স্বাধীনতা যুদ্ধটা ৯ মাসে শেষ হতো কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু ৩০ লাখ প্রাণকে উপেক্ষা করে আপনারা যখন কৃতিত্বটা এককভাবে নিজেদের দিকে টেনে নেন তখন মনে হয় আপনাদের হয়তো রক্তের রং চেনা নেই।

ভারত সরকার ও ভারতের জনগণ বাংলাদেশের এক কোটি মানুষকে খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে যে সাহায্য করেছে সেটাকে আমি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতিরূপ হিসেবে দেখি। একজন বাংলাদেশী হিসেবে এই একটা কারণেই আমি ভারত রাষ্ট্র ও তার জনগণের কাছে চির কৃতজ্ঞ।

বাংলাদেশও কিন্তু বসে নেই। ভারত এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল নয় মাস। আমরা দশ লাখ রোহিঙ্গাকে দুই দশক ধরে খাদ্য আশ্রয় দিচ্ছি। আশ্রয় ব্যাপারে ভারতের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা নিমকহারামী, কিন্তু আপনারা এদেশকে কর্পদহীন, ভিক্ষুক প্রজাতি ভাবলেও কিন্তু আমাদের ঢের আপত্তি আছে। আমরা ৪৮ বছর আগে পাওয়া সেবার পে অফ ভালোভাবেই করছি, সামর্থ্যের চেয়েও বেশি করছি।

আগেই বলেছি ভারতের সামরিক সাহায্য না পেলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু সামরিক সাহায্যকে শরনার্থী আশ্রয়দানের মতো নিঃস্বার্থ ও মহান ভাবতে আমি নারাজ। প্রাচীন বা মধ্যযুগের কথা বলতে পারব না, আধুনিক যুগে পৃথিবীর কোনো সামরিক সাহায্য নিঃস্বার্থ ছিল না। আপনারা আমাদেরকে সাহায্য করেছেন, বিনিময়ে চির রাইভাল পাকিস্তান ভেঙেছে। যে ভূমিখণ্ড ২৪ বছর ধরে ছিল সবচেয়ে বড় শত্রুর দখলে সেটা ছায়া দখল হয়ে গেল এই সাহায্যের মাধ্যমে- এই সত্যটাকে অস্বীকার করবেন কীভাবে? তাছাড়া বিভিন্ন মুভি, সরকারি প্রজ্ঞাপনে আপনারা ৭১ এর যুদ্ধের পুরোটাকেই পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতের জয় হিসেবে প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের ত্যাগ আর রক্তকে রাখেন উহ্য…তারপর বাংলাদেশ কেন আপনাদের সামরিক সাহায্যকে স্বীকার করবে বলুন তো?

আর আপনারা যদি আসলেই “মুক্ত হস্তে স্বাধীনতা দান” প্রকল্প হাতে নিয়ে থাকেন, তবে পৃথিবীর অন্যান্য স্বাধীনতাকামী জাতির দিকে নজর দেয়ার আহবান করছি। কাশ্মিরের কথা বাদই দিলাম। বেলুচিস্তান, ফিলিস্তিন, কাতালোনিয়া… এদেরকে স্বাধীনতা দান করে চির কৃতজ্ঞ থাকতে বাধিত করুন।

তবুও একজন কৃতজ্ঞ বাংলাদেশী হিসেবে ৭১ এ নিহত প্রত্যেক ভারতীয় সেনার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। অনুভব করার চেষ্টা করি ভারতের স্বার্থ বড় এবং চিরস্থায়ী হলেও বাংলাদেশের স্বার্থ তারচেয়েও অনেক বড় ছিল। ভারতের সাহায্য আমাদের জন্য ছিল অপরিহার্য।

স্বাধীনতা বাদ দিয়ে আপনারা সবচেয়ে বড় খোঁটাটা দেন ভারতে চিকিৎসা-পর্যটন বা শপিং করতে যাওয়া বাংলাদেশীদের নিয়ে। ভারতকে ঘৃণা করে ভারতে চিকিৎসা-ঘোরাঘুরি কেন? আপনাদের এমন প্রশ্ন বা ক্ষোভের সাথে আমিও খানিকটা একমত। আমার আপত্তি বাঁধে তখন যখন আপনারা ভাব ধরেন যেন বাংলাদেশের মানুষকে আপনারা ফ্রিতে চিকিৎসা দিচ্ছেন, ফ্রি ভ্রমণ করাচ্ছেন, ফ্রিতে জামা কাপড় দান করছেন।

দেখুন, এটা গ্লোবাল ওয়ার্ল্ড। অর্থের বিনিময়ে সেবা বা সার্ভিস বিশ্বের যে কারো থেকে যে কেউ নিতে পারে। আপনাদের দেশে চিকিৎসা করানোর আগে বাংলাদেশীরা টাকা দিয়েই ভিসার জন্য আবেদন করে, টাকা দিয়েই আপনাদের ইমিগ্রেশন পার হয়, টাকা ব্যয় করে হোটেল রাত কাটায়, ডলার ভেঙে ব্যয়বহুল চিকিৎসা সেরে বাড়ি ফেরে। আমার এমন কোনো তথ্য জানা নেই যেখানে বাংলাদেশী পরিচয় দিলে ৫০% অর্থ দয়াবশত মওকুফ করা হয়, বা হোটেলওয়ালা বিনে পয়সায় রুমের তালা খুলে দেয়। তারচেয়ে বড় কথা যারা চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে তারা ফ্রির চিন্তা না করে গাঁটের টাকা রেডি করেই কাঁটাতারের ওপাশে পাড়ি জমাচ্ছে।

একই কথা পর্যটন বা শপিং এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দুনিয়ার কোনো দোকানদার দোকানের মালামাল বিক্রি করে ভাবে না আমি ক্রেতাকে এই পণ্য দান করেছি বা ক্রেতার পরিবারকে পেলে পুষে বড় করছি। টাকা দিয়ে নাপিতের কাছে শীলসেবা, উবারের পরিবহন সেবা, টেলিভিশনের বিনোদন সেবার সাথে চিকিৎসা বা পর্যটন সেবার পার্থক্য কই? পণ্য বা সেবা বিক্রিকে আপনারা দান হিসেবে কীভাবে ভাবেন সেটাই আশ্চর্যের।

ইন্টারনেট এখন আমাদের হাতের কাছে। আমরা জানি ভারতের হেলথ সেক্টরে বাংলাদেশের কতটা অর্থ গিয়ে জমা হচ্ছে, আমরা খবর রাখি ভারতের পর্যটন খাত থেকে যে আয় হয় তার ১৭% অবদান বাংলাদেশের। কোনো দেশের মানুষ আপনাদের পর্যটনখাতে বাংলাদেশীদের চেয়ে বেশি অবদান রাখছে না।

ভারতের ব্যাপারে আমিসহ সংখ্যাগুরু বাংলাদেশীদের ক্ষোভটা কোথায়, সেটা আপনাদের অজানা নয়। বর্তমান সভ্যতায় কোনো দেশ অপর দেশের মানুষকে সীমান্তে এত বেশি হত্যা করছে বলতে পারবেন?

আপনারা সীমান্ত হত্যার পক্ষে জোর গলায় খুব বেশি কিছু বলেন না জানি, তবে প্রতিবাদও কিন্তু খুব একটা করেন না। বরং ইনিয়ে বিনিয়ে প্রায়শই “ইনফিলট্রেশন” থিওরীতে সীমান্ত হত্যাকে জায়েজ করার চেষ্টা করেন।

ফেলানী

আপনাদের “ইনফিলট্রেশন” ঢাকার মানুষরা গিলতে পারে, আমার মতো যাদের বাড়ি কাঁটাতার ঘেষা, তারা মানবে না। ভারতে অনুপ্রবেশ ঘটে খুবই সত্য, কিন্তু বাংলাদেশে কি ভারতীয় অনুপ্রবেশ ঘটে না?

আপনারা বিএসএফ কর্তৃক “পুশ ইন” এবং বিডিআরের “পুশ ব্যাক” কাহিনী শুনেননি? আচ্ছা শুনতে বা বিশ্বাস করতে হবে না। আমাদের এলাকায় আসুন। আমাদের ইউনিয়নে দুইটা গ্রাম যারা ১৯৯০ এর পর বিভিন্ন সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। এসব গ্রামের শতভাগ মানুষ ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী। আমার অর্ধেক স্বজন ভারতের। ২০০৫ সালের আগে স্রোতের মতো ভারতের মানুষ আমাদের দেশে এসেছে কিছুদিন থেকে আবার ভারতে ব্যাক করেছে। বাংলাদেশের মানুষ এই “ইনফিলট্রেশন” বা “অনুপ্রবেশ” শব্দের সাথেই পরিচিত না এবং এমন অনুপ্রবেশকে কখনো নেতিবাচক চোখে দেখেনি।

বাংলাদেশের মানুষ নেতিবাচক চোখে না দেখলেও আপনাদের দেখার অধিকার আছে। কিন্তু তাই বলে কোন আইনে সীমান্তে গুলি করে মানুষ মারবেন? আপনাদের দেশের আইন সীমান্তে মানুষ হত্যা সাপোর্ট করে? অনুপ্রবেশকারীকে ধরে তাকে আইনের মাধ্যমে শাস্তি দেয়ার কোনো বিধান নেই?

জানি এখানেও ইনিয়ে বিনিয়ে যুক্তি দাঁড় করাবেন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি এমন কাউকে শুইয়ে দেয়া ঠিক আছে- এই যুক্তি খন্ডানো কঠিন।

তবে আমরা, বিশেষত সীমান্তের মানুষজন এমন যুক্তির অসারতা ব্যাপারে খুব ভালোই জানি। আপনারাও জানেন, স্বীকার হয়তো করবেন না। ফেলানী যে নিরাপত্তার জন্য হুমকি ছিলো না সেটা তো প্রমাণিত। সীমান্তে প্রাণ দেয়া বেশিরভাগ মানুষই ফেলানী। সর্বোচ্চ গরু চোরাকারবারী থেকে নিয়ে কৃষক, পথিক নদী বর্ডারে নদীতে গোসলে নামা মানুষ থেকে নিয়ে ঘরে বসে থাকা নীরিহ মানুষজনদের বিএসএফ টার্গেট শ্যুট করে। সিলেট সীমান্তে খাসিয়াদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে বিএসএফের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব ও মদদে বাংলাদেশী হত্যা করা হয়েছে বহুবার। এরা নীরিহ বলেই দেদারসে এদেরকে হত্যা করতে পারছেন। প্রকৃত “আতাংকবাদী” হলে ঠিকই করাচী টু মুম্বাই রুটের মতো করে আপনাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকেই ভারতকে এলোমেলো করে দিতে পারত, বাংলাদেশে এসে করতে হতো বহুল আলোচিত “সার্জিকাল স্ট্রাইক”।

আমরা ভারতের বাইরে বিকল্প বাজার তৈরি করতে পারিনি। দায়টা ভারতের না, ব্যর্থতা আমাদেরই। তাছাড়া তৃতীয় বিশ্বের মতো অসভ্য বাসভূমে প্রতিবেশী ছোট দেশ থেকে বড় দেশ সুবিধা নেবে এটাই বাস্তবতা। এখানে ভারতের জায়গায় রাশিয়া-মিশর-সৌদি-চীন-ব্রাজিল থাকলে যেমন ব্যাপারটা সেইম হতো বাংলাদেশের জায়গায় ঘানা-উগান্ডা-ইয়েমেন-চাদ-পানামা হলেও ঘটনা ঘটত একই।

ছোটো দেশকে মূলা ঝুলিয়ে লোভ দেখিয়ে তাদের থেকে লাউ-তরমুজ-গাজর কেড়ে নেয়াটাই নীতি। বাংলাদেশীদের খুব দ্রুত এই ব্যাপারে অভ্যস্ত হওয়া উচিত। আমাদের হর্তা কর্তাদের মূলার প্রতি ফ্যালফ্যাল চাহনির জন্যই সুন্দরবন-ফারাক্কা-ট্রানজিট হরণ হয়েছে সেটা স্বীকার করার সময় এসেছে। বেজায়গায় ব্লেইমিং করে লাভ নেই।

পাশাপাশি ভারতীয় বন্ধুদের উচিত বাংলাদেশের ক্ষোভের উৎসটা চেক করা। অবশ্য তাদের যদি সেই সময় আর মানসিকতা থাকে।

এসবের বাইরে আরো কিছু কন্ট্রাভার্সিয়াল বিষয় চলে আসে। উপমহাদেশের ধর্মীয় সেন্সেশনের কারণে ভারতে নিয়মিত বিরতিতে ঘটা মুসলিম হত্যার প্রতিবাদে এদেশের অনেকেই ক্ষোভ দেখায়, ভারতের গোষ্টী উদ্ধার করে। এই ক্ষোভ প্রকাশ ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ থাকছে। বাংলাদেশ তুলসী পাতা না, সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রতিনিয়তই হচ্ছে; যেটার জন্য সংখ্যাগুরুর প্রতিনিধি হিসেবে আমি লজ্জিত, ক্ষুদ্ধ ও ভীষণভাবে হতাশ। তবে আমার দেশের হিন্দু ভাইয়েরাও বোধহয় আমার সাথে একমত হবেন যে সংখ্যালঘু নির্যাতনের তীব্রতা ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে অনেক কম। “আল্লাহু আকবার” বলতে বলতে কাউকে পিটিয়ে মারা বা “আল্লাহু আকবার” না বলায় কোনো হিন্দুকে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলার মতো ঘটনা বাংলাদেশে খুবই বিরল। বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের প্রতিবাদ ভারত ফেসবুকে সীমাবদ্ধ রাখেনি, ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ অভিমুখে লং মার্চ করেছে, ক্ষমতাসীন দলের অনেক জাতীয় নেতা বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ দখলের ঘোষণা দিয়েছেন।

ধর্মীয় ইস্যুটাকে কথা প্রসঙ্গে আনলাম। যার যার দেশের নাগরিককে সুরক্ষিত বা অরক্ষিত রাখা সে দেশের ব্যাপার। অযাচিত নাক গলানো বন্ধ করা উচিত।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এতটাই বিস্তৃত যে পুরো একটা বই লিখেও এই টপিক শেষ করা যাবে না। আপাতত এখানেই থামছি।

ভারত, বাংলাদেশ

আমার অর্ধেক আত্মীয় ভারতীয়, ফেসবুক সূত্রে বেশ কিছু ভারতীয় বন্ধু আছেন। আমি জানি ভারতের হারে বাংলাদেশের উল্লাস দেখে তারা কষ্ট পেয়েছেন, কষ্ট পাওয়া খুব বেশি স্বাভাবিক। ক্রিকেটীয় সেলিব্রেশনের ক্রিকেটীয় জবাবে আমার আপত্তি নেই। তবে জবাবটা যখন জাতি বা রাষ্ট্রে গিয়ে ঠেকে, যেখান আমার অস্তিত্বকে নিতান্তই দান, বেঁচে থাকাকে দক্ষিণা হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা সেটা অবশ্যই মনে কষ্ট দেয়। ক্রিকেটকে ঘিরে উগ্রবাদের যে নীরব ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে সেটাকে নিরুৎসাহিত করা উচিত।

খেলার জয় পরাজয়, মন খারাপ-ক্ষোভ-বিবাদের তর্ক কেন রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের জন্ম পরিচয়ে গিয়ে ঠেকবে? ক্রিকেট ক্রিকেটের ভেতরেই থাকুক, রাষ্ট্র থাকুক রাষ্ট্রের কাছে। ভারতের হার ফেলানী হত্যার শোধ না। ফেলানীরা অনেক বড় কিছু, এই ক্ষোভ ব্যাটে বলে মিটবার নয়। টেলিভিশনের সামনে থাকা নীল ও লাল-সবুজ জার্সির ২২ জন মানুষ ৪৮ বছরের অম্ল মধুর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নয়।

বাংলা, আসাম ও ত্রিপুরার বন্ধু ছাড়া এই লেখা যেহেতু অন্য কেউ পড়বে না, আপনাদের তিন রাজ্যের মানুষের কাছে নিবেদন, রেন্ডিয়ার বদলে কাংলাদেশ বলছেন বলুন, ক্রিকেটে আমাদের অবস্থান নিয়ে ট্রল করুন, রুচিতে না আটকালে স্টার স্পোর্টসে আরো বেশি টিভিসি বানান… তবে প্লিজ, বাংলাদেশের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না। দেশপ্রেম আপনাদের চেয়ে হয়তো আমাদের কম, তবে শিকড়কে তো অস্বীকার করা যায় না। আমাদের খারাপ লাগে।

আমার সাথে ঘনিষ্ট বাংলার বন্ধুদের কাছে অনুরোধ, উগ্রবাদের রেডিমেড টোপ গিলবেন না। কাঁটাতারকে উপেক্ষা করে যে ভালোবাসার সম্পর্ক সেটা বেঁচে থাকুক।

আপনারা আমাদের দূরের কেউ নন। জিহ্বা এবং কণ্ঠের কাছাকাছি থাকা প্রিয় মানুষ।

ফুটনোটঃ

বাংলাদেশীদের প্রতি অবেদনঃ

১। বাংলাদেশকে কাংলাদেশ ডাকলে শুনতে আমাদের যতটা খারাপ লাগে, ভারতকে রেন্ডিয়া বললে তাদেরও ততটা খারাপ লাগার কথা। ব্যক্তিগতভাবে আমি রেন্ডিয়া-ফাকিস্তান শব্দগুলোকে অপছন্দ না, ঘৃণা করি। ক্ষোভ প্রকাশের যথেষ্ট কারণ যেমন আছে, ভাষাও ততটা আছে। ভারতকে নিয়ে বেশি ক্ষোভ থাকলে “ফেলানী হত্যাকারী দেশ” বলুন, “গরুর মুত খাওয়া জাতি” শুনলে নিজেরই অরুচি লাগে। অন্তত ভারতীয় কাউকে লিস্টে রেখে এমন ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।

২। ভারতের হারে ৯৯% বাংলাদেশীর মতো আমিও আনন্দ পেয়েছি। আনন্দ পাওয়া আর উল্লাস প্রকাশের সীমানা জানা উচিত। বিশেষত নিজেরা ৮ম হয়ে ১ম হওয়া ছাত্রের পতনে বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিপরীতে কী কী অপমান হজম করতে হতে পারে সেই বিবেচনা মাথায় আছে?

৩। দেশ যখন ধর্ষণ- খুনের প্রাদুর্ভাবে বিনষ্ট, তখন ক্রিকেট থেকে উদ্ভূত জাতীয়তাবাদের এই প্রসঙ্গ নিয়ে লিখে খুব একটা স্বস্তি পাচ্ছি না। দেশকে প্রচুর গালি দিই, দেশ ছাড়ার ইচ্ছেও প্রবল। তবুও “বাংলাদেশ” শব্দটাকে মুছে ফেলার কোনো উপায় নেই। জাতীয়বাদের সংকট চুপ থাকতে দেয় না। আমার লেখা কাউকে বিরক্ত বা বিব্রত করলে স্যরি।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button