খেলা ও ধুলা

দল থেকে বাদ দেয়ার কারণটা কেউ ইমরুলকে বলে না…

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ভাগা খেলোয়াড় কে? এই প্রশ্নটা ইমরুল কায়েসকে করা হলে তার মুখে একটা হাসি দেখবেন আপনি। করুণার হাসি কিনা ঠিক জানিনা, তবে সেই হাসিতে অপ্রাপ্তি আর না পাবার বেদনা যে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে, একদল বেদনা চাপা পড়ে যায় সেই মুচকি হাসির নিচে, সেটা বোঝার জন্যে মনোবিদ হতে হয় না। টিম কম্বিনেশন হোক, কিংবা অন্যদের দারুণ কোন পারফরম্যান্স অথবা দলের ব্যর্থতা, দল থেকে কাউকে বাদ দেয়ার কোপটা সবসময় সবার আগে ইমরুলের গায়েই পড়ে। দল হারলে বলির পাঁঠা বানানোর জন্যে তার চেহারাটাই নির্বাচকদের চোখে ভেসে ওঠে বোধহয় প্রথমে। নিউজিল্যান্ড সিরিজের দল ঘোষণাতেও সেই জিনিসটারই দেখা মিললো আরেকবার।

গত বছরের অক্টোবর মাসটা ইমরুল কাটয়েছেন স্বপ্নের মতো। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে তিন ম্যাচে দুই সেঞ্চুরীতে করেছিলেন ৩৫৯ রান, তিন ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশের আর কোন ব্যাটসম্যান কখনোই এত রান করতে পারেননি। যে ম্যাচে ইমরুল সেঞ্চুরী করতে পারেননি, সেটাতেও তার নামের পাশে ছিল নব্বই রান! ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পরের সিরিজে দুটো ম্যাচে সুযোগ মিললো, রান পেলেন না। ফলাফল? বাদ!

ইমরুল কায়েস, বাংলাদেশ বনাম জিম্বাবুয়ে

মানুষটা ইমরুল বলেই অবাক হন না এসবে। ক্যারিয়ারজুড়েই তো এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তাকে, ভবিষ্যতে আবার দলে ঢুকে রান করলেও যে জায়গা নিশ্চিত হবে না, সেটাও জানেন তিনি। সাকিব-তামিমদের মানের প্রতিভা নেই তার, ব্যাটে আহামরি স্ট্রোক নেই, সবচেয়ে বড় কথা, তারকাসুলভ কোন ইমেজ নেই তার, নেই বিশাল ফ্যান-ফলোয়ার। সাকিবিয়ান বা মাশরাফিয়ানের মতো করে বাংলাদেশে কেউ নিজেকে ‘ইমরুলিয়ান’ বলে পরিচয় দেয় না। বরং একটু খারাপ করলেই তাকে নিয়ে কথা ওঠে, একটা ক্যাচ মিস করলেও তাকে শুলে চড়ানো হয়।

দল থেকে ইমরুল বাদ পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে না অনলাইনে, ম্যাচের পর ম্যাচ মাঠে পানি আনা-নেয়া করে কাটালেও কেউ বলে না ইমরুল কেন দলে নেই। তবে সেসব নিয়ে ইমরুল কায়েস নিজেও মাথা ঘামান বলে মনে হয় না। চুপিসারে তিনি নিজের কাজটাই করে যান, যেটা তার করার কথা। প্রতিদিন হয়তো পারেন না, তবে চেষ্টা তো করেন। 

ইমরুল কায়েস, বাংলাদেশ বনাম জিম্বাবুয়ে

আড়াইশো ওভার কিপিং করার পরে তামিমের সঙ্গে ওপেন করতে নেমে ৩১২ রানের রেকর্ড জুটি গড়ে তিনি টেস্ট বাঁচিয়ে দেন, মাশরাফির বিদায়ী টি-২০ ম্যাচে তামিমের জায়গায় সুযোগ পেয়ে ঝড় তোলেন, হুট করেই ডাক পেয়ে দেশ থেকে আরব আমিরাতে ছুটে যান, সেখানে গিয়েও প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে ৭২ রানের একটা ইনিংস খেলে দলকে সম্মানজনক স্কোর এনে দেন!

ইমরুলকে না নেওয়ার পেছনে যুক্তি দেখাতে গিয়ে প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন বলেছেন ‘এমন না ওকে দূরে ঠেলে দিয়েছি। আশা করি সে ফিরে আসবে।’ ইমরুল এসব স্বান্তনাবানী অনেক শুনেছেন, এসবে এখন আর স্বান্তনা মেলে না। ইমরুলের কথা হচ্ছে, ‘গত ১০ বছর ধরে তো এভাবেই খেলে আসছি। খেলতে হচ্ছে। নিজেও জানি না যে, ভালো খেলার পর পরের সিরিজে খেলতে পারব কি না। নিজেও সেটা আশা করি না। ওভাবেই (ভালো খেলেও বাদ পড়ার জন্যে) মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকি। যখনই সুযোগ পাই, সেভাবেই খেলার চেষ্টা করি। ১০ বছর খেলে ফেলেছি, ওসব আফসোস আর নেই।’

ইমরুলের কিটব্যাগটা সবসময় গোছানোই থাকে। হুটহাট বিকল্প হিসেবে ডাক আসতে পারে, তিনি জানেন। তার কাজ দেশ থেকে উড়ে যাওয়া, ভালো খেলার চেষ্টা করা, দলের হয়ে রান করা। সেই চেষ্টা তিনি প্রতিনিয়তই করে চলেন। বাদ পড়াতে তার কোন আক্ষেপ নেই, নেই কোন ক্ষোভও, একটা দলে সবার সুযোগ হবে না, এটা তিনি ভালোভাবেই জানেন। ইমরুলের আক্ষেপটা অন্য জায়গায়। দল থেকে ছেঁটে ফেলে দেয়ার পরে কেউই তাকে বলেন না কেন তাকে বাদ দেয়া হলো, তার সমস্যাটা কোথায়, কি কারণে তিনি দলে নেই সেটাই তার জানা হয় না। সমস্যাটা ধরিয়ে না দিলে সেটা তিনি সারাবেন কি করে?

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের অধিনায়ক হিসেবে সংবাদ সম্মেলনে এসে উত্তর দিতে হয়েছে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়া সংক্রান্ত প্রশ্নের। চেহারার ওপরে কালো মেঘের একটা স্তর নিয়েই ইমরুল জবাব দিয়েছেন সেসব প্রশ্নের, বলেছেন- ‘কেন বাদ দেয়া হলো, এটা যদি পরিষ্কার করে, তাহলে তা নিয়ে কাজ করতে পারি। আরও বেশি পরিশ্রম করতে পারি। এটা পরিষ্কার হলে বুঝতে পারতাম, কেন দলে থাকছি না, বা কেন বাদ পড়ছি। নিজেও জানি না, হয়তো টিম ম্যানেজমেন্ট চিন্তা করেছেন, একই পজিশনে অনেক ব্যাটসম্যান থাকায় আমাকে দরকার নেই। এই জায়গায় হয়তো আমি নির্বাচকদের ভাবনায় নেই।’

সংবাদ সম্মেলন থেকে ড্রেসিংরুমে ফেরার পথটা খুব একটা লম্বা নয়। সেই পথে হাঁটতে হাঁটতেই ইমরুল প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন- ‘আচ্ছা বলেন তো, ২০১৬ সালে সর্বশেষ নিউজিল্যান্ড সফরের ওয়ানডে সিরিজে আমাদের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ রান কার ছিল?’ জবাবটা তাদের উদ্দেশ্যেই দেই, যারা বলেন ইমরুল ফাস্ট বা বাউন্সি পিচে খেলতে পারেন না, নিউজিল্যান্ডের কণ্ডিশনের জন্যে ইমরুল দলে জায়গা ডিজার্ভ করেন না, এমন থিওরি যাদের কল্পনাপ্রসূত, তাদের জ্ঞ্যাতার্থে জানিয়ে রাখি, ২০১৬ সালের সেই সিরিজে তিন ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান ছিল ইমরুলেরই, ১১৫।

ইমরুল নিজের মনেই স্বগোতক্তি করেন, ‘এভাবে চালিয়ে যাওয়া খুব কঠিন…’ কতটা কঠিন, সেটা আমরা জানি না, ইমরুল জানেন। আমরা শুধু জানি ফেসবুকে ট্রল করতে, ইমরুলকে ভীমরুল বলে ডাকতে, একটা আউট বা ক্যাচ মিসের পরে ইচ্ছেমতো গালাগাল দিতে।

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button