রিডিং রুমলেখালেখি

দর্শন পাঠের ইতিবৃত্ত

স্যাপিয়েন্স এর লেখক হারারির একটা সাক্ষাৎকারে দেখলাম, এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “বর্তমানে পড়াশুনা করার জন্য সব থেকে স্মার্ট সাবজেক্ট হতে পারে ফিলসফি।” বাংলাদেশে ফিলসফি নিয়ে একাডেমিক ভাবে কতটুকু পড়াশুনা বা গবেষণা হয় সেটা আমার জানা নেই তবে আমার ধারণা পড়ার বিষয় হিসেবে ফিলসফি কারোরই খুব একটা পছন্দের বিষয় নয়। যারা পড়েন তারা বিসিএস এর বাইরে অর্জিত দার্শনিক জ্ঞান আর কোথাও কাজে লাগান কিনা সেটাও তারাই ভালো জানেন। যাই হোক, একাডেমিক ভাবে না হলেও, ব্যক্তি উদ্যোগে পড়াশুনার চেষ্টা যদি করে, ফিলসফি তার জন্য দারুন একটা বিষয় হতে পারে। এই পড়াশুনা চাকরির বাজারে কাজে না আসলেও ব্যক্তিগত চিন্তার উন্নতিতে কাজে আসবে।

একাডেমিক পড়াশুনার বাইরে যারা সিরিয়াস ভাবে পড়ে তারা হয় চাকরির জন্য অথবা বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য পড়ে। তাই কেউ যদি চাকরি বা বিদেশ গমনের কাজে আসেনা এমন কোন বিষয় নিয়ে সিরিয়াস ভাবে পড়তে যায় তাকে বুদ্ধিমান মানুষেরা নির্বোধ বলেই হয়তো সাব্যস্ত করবেন। একজন প্রথমশ্রেণীর নির্বোধ হিসেবে ধরেই নিচ্ছি, আমার মত নির্বোধের সংখ্যা নিতান্ত সামান্য নয়। তাই নিজের দর্শন পাঠের আলোকে, অন্যান্য আগ্রহী পাঠকদের সাথে দুটো কথা ভাগাভাগি করে নেয়া যেতেই পারে।

আমি নিজেকে দর্শনের পাঠক বলে মনে করি না। মনে করি, দর্শনের ছাত্র। আর আনন্দের বিষয় হচ্ছে, আমার মত ছাত্রদের শিক্ষা দেবার জন্য জগতের শ্রেষ্ঠ চিন্তাশীল মেধাবী শিক্ষকরা রয়েছেন। সেই প্রাচীন গ্রীসের শিক্ষক থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপের শিক্ষকরা তো আছেনই, আছেন ভারতীয় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদরা। প্রশ্ন হচ্ছে, দর্শন পাঠ করা কেন জরুরী?

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের চিন্তার সারবস্তু হল তাদের দর্শন। দর্শন পাঠ করার অর্থ হচ্ছে সেই চিন্তা গুলোর সাথে পরিচিত হওয়া। সেগুলো উপলব্ধি করা এবং নিজেও সেগুলো নিয়ে চিন্তা করা নিজের মত করে। যখন আপনি পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দার্শনিকের চিন্তার সাথে পরিচিত হবেন, নতুন নতুন আইডিয়া আপনার মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলে যাবে। আপনি হয়তো এমন একটি পথ আবিষ্কার করবেন, কোন বিষয়কে দেখার এমন একটা দৃষ্টি অর্জন করবেন – যা হয়তো আগে কখনো কল্পনাও করেননি। অর্থাৎ দর্শন পাঠ একদিকে যেমন আপনাকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম চিন্তা গুলোর সাথে পরিচিত করিয়ে দিবে, একই সাথে আপনার নিজের চিন্তাভাবনাকেও শাণিত করবে। ফলে সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে বা কোন ঘটনাকে বিচার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আপনার সামনে নতুন নতুন পথ খুলে যাবে।

দর্শন পাঠ অনেকটা মস্তিষ্কের ব্যায়ামের মত। প্রশ্ন করতে পারেন, দর্শন পাঠের ফলে ক্রিটিক্যাল থিংকিং এর ক্ষমতা যদিও বা বৃদ্ধি পায়, তাতে লাভ কী? দর্শন পাঠ কি কোন মানুষের নৈতিক উন্নতির নিশ্চয়তা দেয়? উত্তর হচ্ছে, না দেয় না। কিন্তু পড়াশুনার কোন পথটি নৈতিক উন্নতির নিশ্চয়তা দেয়? কোনটিই না। সেদিক থেকে দর্শন যদিও বা নৈতিক উন্নতির নিশ্চয়তা দেয় না কিন্তু সে নৈতিকতার কিছু বিষয়ের শিক্ষার দায়িত্ব নেয়। দর্শন পাঠ করে এসব চিন্তার কিছুটা যদি আসলেই কেউ নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারে, নি:সন্দেহে সে নৈতিক ভাবে অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকবে। একই কথা বলা যায়, বৈষয়িক বিষয়ের ক্ষেত্রেও। দর্শন পাঠ আপনাকে চাকরি পেতে সাহায্য করবে না, কিন্তু কঠিন সময়ে জটিল সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে । বিশেষ করে যারা ক্রিয়েটিভ কাজের সাথে যুক্ত- তাদের জন্য দর্শন পাঠ অত্যাবশ্যক। একজন শিল্পী বা একজন লেখক বা একজন স্থপতির কাজ করার ক্ষেত্রে নিজস্ব দর্শন তৈরি করা জরুরি। দর্শন পাঠ এই কাজে তাকে সাহায্য করবে।

কিছুদিন আগে এক শ্রদ্ধেয় বামপন্থী ফেসবুক-বুদ্ধিজীবী আমাকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, আমার বই পড়া আর মলত্যাগ করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই! কারণ আমি রুশো হবস ম্যাকিয়াভেলি পড়েও ‘ফ্যাসিস্ট সরকার’কে সমর্থন দিচ্ছি। যাইহোক, ওনার একটি অনুবাদ বই এবার আমি কিনেছি। প্রাঞ্জল অনুবাদ, ভালো লেগেছে। যদিও তার ভাষায়, এই বই পড়া আর মলত্যাগ সমার্থক! যাইহোক, এখানে উনি যে বিষয়টি ভুল ভাবে চিন্তা করেছেন, সেটা হচ্ছে দর্শন পাঠ কাউকে একটি নির্দিষ্ট মতবাদের দিকে চালিত করে বলে উনি ধরে নিয়েছেন। যেহেতু তিনি নিজে বামপন্থী, তার মতে সমাজতান্ত্রিক মতবাদই একমাত্র আদর্শ মতবাদ। কিন্তু আমার কাছে সেটি মনে নাও হতে পারে। সব ধরণের মতবাদ বা দর্শন পড়ার পর আমার নিজের যে দার্শনিক চিন্তা তৈরি হবে, সেটা সম্পূর্ণ আলাদা কিছু হতে পারে, আবার অন্য যেকোন চিন্তার সাথে মিলে যেতে পারে। কাজেই, দর্শন পাঠ কোন নির্দিষ্ট মতবাদ বা রাজনৈতিক পক্ষ সৃষ্টির নিশ্চয়তা দেয় না। তবে ‘আমার মতবাদই সঠিক’- মনোযোগ সহকারে দর্শন পাঠ করলে অন্তত এই ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হবার কথা নয়।

লিটল হিস্টোরি অফ ফিলসফি, দর্শন পাঠ

অনেক কথাই হল। এবার দেখা যাক, একাডেমিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া দর্শন পড়তে চাইলে কীভাবে পড়া যেতে পারে। বাংলা ভাষায় বেশ কিছু চমৎকার বই পাওয়া যায় এখন। কেউ যদি ধারাবাহিক এবং সামগ্রিক একটা ধারণা পেতে চান তাহলে তার জন্য সব থেকে ভালো হবে কাজী মাহবুব হাসানের অনুবাদে ‘এ লিটল হিস্ট্রি অফ ফিলোসফি’ বইয়ের বাংলাপাঠ – ‘দর্শনের সহজ পাঠ’। এই বইটিতে সক্রেটিস থেকে শুরু করে পিটার সিংগার পর্যন্ত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দার্শনিকদের পরিচয় এবং তাঁদের দর্শনের সংক্ষিপ্ত-সার, সহজ ভাষায় আলোচিত হয়েছে। এই বইটির প্রতিটি অধ্যায় আপনার মস্তিষ্ককে আলোড়িত করবে। বইটি আমি প্রথমে একটানা পড়ে ফেলেছিলাম। এখন সময় নিয়ে আবার পড়ছি। মাহবুব হাসানের প্রাঞ্জল অনুবাদ বইটিকে সহজপাঠ্য এবং উপভোগ্য করে তুলেছে। বইটি প্রকাশ করেছে দিব্য প্রকাশ। যারা দর্শন পাঠ শুরু করতে চান বা অন্তত বিশ্বসেরা চিন্তাবিদদের চিন্তার সাথে পরিচিত হতে চান, তাদের জন্য এটি আদর্শ।

সোফির জগৎ

এরপরে আরো একটি বইয়ের কথা বলা যায় প্রাথমিক শিক্ষার জন্য, সেটি হচ্ছে ইয়েস্তেন গার্ডারের ‘সোফির জগৎ’, যেটির চমৎকার অনুবাদ করেছেন জি.এইচ.হাবিব। এই বইয়ে গল্পের মধ্য দিয়ে দর্শনের ইতিহাস এবং প্রধান প্রধান দর্শন গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সোফি নামের এক কিশোরীর সাথে সাথে আমাদেরও জানা হয়ে যাবে দর্শনের বিচিত্র জগৎ সম্পর্কে। এই দুটি বই ছাড়াও টি জেড লেভিন এর ‘সক্রেটিস থেকে সার্ত্রে: একটি দার্শনিক অন্বেষা’ এবং রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘দর্শন দিগদর্শন’ বই দুটি পড়া যেতে পারে। রাহুল সাংকৃত্যায়নের বইটিতে পাশ্চাত্য দর্শন ছাড়াও মুসলিম দর্শন এবং ভারতীয় দর্শন সম্পর্কে জানা যাবে। ভারতীয় দর্শন অনেক বিশাল এবং বিচিত্র শাখা প্রশাখা সম্বলিত। নতুন পাঠকদের জন্য হয়তো একটু কঠিন হবে। তবে ভারতীয় দর্শনের উপরেও চমৎকার সহজ পাঠ্য বেশ কিছু বই আছে।

ভারতীয় দর্শন

এই বই গুলো থেকে প্রাথমিক এবং সামগ্রিক একটি ধারণা পাওয়া যাবে। এরপর কেউ যদি বিস্তারিত পড়তে চায় তার জন্যেও বইয়ের অভাব নেই। অধিকাংশ বইয়েরই ভালো বাংলা অনুবাদ পাওয়া যায়। প্লেটোর রিপাবলিক, এরিস্টটলের পলিটিক্স উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও রুশো, হিউম, বার্ট্রান্ড রাসেলের বইয়ের অনুবাদ পাওয়া যায়। বার্ট্রান্ড রাসেলের নিজেরই পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসের উপরে বই আছে। চাইলেই খুঁজে পাওয়া যাবে যেকোনো ভালো বইয়ের দোকানে।

আমি জানি, বই পড়ার ধৈর্য্য সবার নেই। কিন্তু ইউটিউবে প্রচুর অসাধারণ সব ভিডিও আছে। Wireless Philosophy, Philosophy Tube, The school of life – philosophy, Crash course- philosophy এই চ্যানেল গুলোতে গেলেই প্রচুর চমৎকার সব ভিডিও পাওয়া যাবে, যা থেকে বেসিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। এছাড়া Ted এরও দর্শনের উপর দারুন সব এনিম্যাটেড ভিডিও আছে।

দর্শন একটি চর্চার বিষয়। আর দর্শন চর্চার কেন্দ্র হচ্ছে মস্তিষ্ক আর ক্ষেত্র হচ্ছে চিন্তা করা। কোন দার্শনিকের ভাবনা বা আইডিয়া গুলো নিজের মত করে চিন্তা করাটাই দর্শন চর্চা। আর যিনি দর্শন চর্চা করবেন তার চিন্তা পদ্ধতি, ভাবনার বিকাশ আলাদা হবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল সমস্যা হচ্ছে আমরা তথ্য জানি কিন্তু চিন্তা করতে শিখিনা। ফলে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি সম্ভব হয় না আমাদের দ্বারা। আমরা ভালো রেজাল্ট করি, উঁচু পদে বসি কিন্তু ভালো মানুষ হতে পারিনা। আমরা তথ্য সর্বস্ব মূর্খ হয়ে প্রকৃত জ্ঞানের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করি। বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ হারারি একারণেই বর্তমান সময়ে স্কুল পর্যায় থেকে দর্শন পাঠের উপরে গুরুত্ব দিয়েছেন, দর্শনকে একাডেমিক ভাবে পড়ার জন্য বর্তমানের সেরা বিষয় হিসেবে মতামত দিয়েছেন।

হারারি
ইয়ুভাল নোয়া হারারি | ইতিহাসবিদ, লেখক

আর দর্শনের সাধারণ একজন ছাত্র হিসেবে আমার মনে হয়েছে- যে দর্শন পড়েনি, তার শিক্ষা জীবন এখনো সমাপ্ত হয়নি। তাই দর্শন পড়ুন, শিক্ষা জীবন সম্পূর্ণ করুন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button