মনের অন্দরমহলরিডিং রুমসিনেমা হলের গলি

হুমায়ূন আহমেদকে লিখা নুহাশ হুমায়ূনের চিঠি!

বাবা হুমায়ূন আহমেদকে ২০১২ সালের জুলাই মাসে চিঠিটি লিখেছিলেন নুহাশ হুমায়ূন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিঠিটি আর পাঠাতে পারেননি তিনি। তার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন নুহাশের প্রিয় বাবা। তাঁর অব্যক্ত কথাগুলো বাবার সাথে শেয়ার করতে না পারার দুঃখের তীব্রতা কিছু কমতে পারে- এই আশায় তিনি পরবর্তীতে তাঁর ফেসবুক ওয়ালে প্রকাশ করেন চিঠিটি।

বাবা,
আশা করি তুমি ভালো বোধ করছ। আমার শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না, টাইফয়েড হবার কারণে পাকস্থলী বেশ ভোগাচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে প্রায় কিছু না খেয়ে কাটিয়েছি, অন্যদিকে জাউ নামের এক অখাদ্য বিছানায় শুয়ে খেতে খেতে সেই ভালো খাবারের কথা ভাবছি যা সুস্থ হলে খেতে পারব। এরমধ্যে একবার গলদা চিংড়ি খাবার শখ হয়েছিল, সেই থেকে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ল।

মা ও তোমার বিচ্ছেদ হবার পর আমার খুব খারাপ সময় যাচ্ছিল, সব সময় আশায় আশায় ছিলাম তুমি আমাদের মাঝে ফিরে আসবে। বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হবার পর বুঝলাম দরজা চির জীবনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। রসায়নের পরিভাষায় যাকে বলে- আগুন জ্বলে উঠা, সেটি প্রত্যক্ষ করলাম। তখন আমার ভয় হয়েছিল তোমার সাথে আমার দূরত্ব বাড়বে এবং তুমি আমাকে তোমার ছেলে হিসেবে দেখবে না।

বিচ্ছেদের কয়েকদিন পর তুমি আমাকে ফোন করলে। ফোনে বললে যে সেদিন তুমি বাজার থেকে বিশাল বড় বড় কিছু গলদা চিংড়ি কিনে এনেছ আর সেটি রান্না করে আমাকে নিয়ে খেতে চাও তোমার বাসায়। শীতল যুদ্ধের সময় এটা যে সম্ভব না তা আমরা জানতাম। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ হলো না।

আধা ঘন্টা পর বাসার ইন্টারকম বেজে উঠলো। দারোয়ান আমাকে জানালো যে- মস্ত বড় এক গলদা চিংড়ি নিয়ে আমার বাবা গেটের বাইরে অপেক্ষা করছে। বিস্মিত, হতভম্ব আর খানিকটা উত্তেজিত আমি নিচে নামলাম। তুমি বললে, “বাবা, আমি আসলেই এটা তোমার সাথে খেতে চেয়েছি, তবে এই মূহুর্তে তা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আমি তোমাকে এইটুকু নিশ্চয়তা দিচ্ছি- যেভাবেই হোক, আমি সব সময় তোমার পাশে থাকব এবং কোনো একদিন আমরা আবারও একসঙ্গে ভালো খাবার খাব। তবে এখন তোমাকে এটা নিতে হবে।” এই বলে তুমি আমার হাতে জীবন্ত গলদা চিংড়িটি ধরিয়ে দিলে। বড় চোখ আর লিকলিকে লম্বা পা-অলা বিদঘুটে প্রাণীটি আমার মনে আশার আলো জ্বালালো। আশাটা করেছিলাম- পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, তুমি সব সময় আমার কাছে থাকার চেষ্টা করবে।

আমার মনে হয় তোমার জন্য আমি কিছুই করতে পারিনি। অন্তত আমার যতটুকু করা উচিত ছিল, তাও করতে পারিনি। যখনই তোমাকে আমি ফোন করতাম, সাধারণত তুমি কথা বলার অবস্থায় থাকতে না। আবার যখন কথা বলতাম আমরা, তখন আমি নিজেকে ঠিকমত প্রকাশ করতে পারতাম না। তোমার মতো কথক তো আমি নই।

সার্জারী করার আগে তুমি যখন ঢাকাতে ফিরে আসলে, তোমাকে দেখতে গিয়ে খুব কষ্ট হতো আমার। প্রত্যেকবারই গেটে দাঁড় করাতো দারোয়ান। বাবার সাথে দেখা করার জন্য দারোয়ানের কাছে ছেলের জবাবদিহিতা- এর চাইতে কষ্টকর, অপমানকর কিছু ছিল না আমার কাছে।

কিন্তু এর কোনোটাই ছুতো নয়, সত্যি বলতে তোমার কাছে আরো থাকার দরকার ছিল আমার। আমি সব কিছু বদলাতে চাই। আমি তোমাকে জানাতে চাই যে আমি সত্যিই তোমাকে মিস করি। আমি তোমাকে জানাতে চাই- আমি যেরকমটা চাই, আমার মতো করে তোমাকে না পাওয়ার কষ্ট এখনো আমাকে পোড়ায়। আমার এই চিঠিটা তোমার জন্য গলদা চিংড়ি।

তোমার ছেলে, নুহাশ।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button