সিনেমা হলের গলি

‘আতিক ভাই, এটা আমি করবো না’

বিটিভির প্রোগ্রাম ডিরেক্টর আতিকুল হক চৌধুরীর সামনে বসে আছি আমি, টিভি সেন্টারের অফিসে। আতিক ভাই আমাকে একটা নাটকের স্ক্রীপ্ট দিয়ে বললেন, এটাতে তোমাকে অভিনয় করতে হবে। অমুক চরিত্রটা তোমার। আমি উনার সামনে বসেই সময় নিয়ে স্ক্রীপ্টটা পড়লাম, আমাকে যে চরিত্রটা অফার করা হচ্ছে, সেটার সংলাপগুলোও দেখলাম। তারপর স্ক্রীপ্টটা উনার হাতে দিয়ে বললাম, “আতিক ভাই, এটা আমি করবো না।”

১৯৮০ সালের কথা এটা। আমি তখন ঢাকার মঞ্চ নাটকেও খুব একটা পরিচিত মুখ নই, বিটিভি নামের একটামাত্র চ্যানেল তখন, সেখানেও আমার কোন নাটক প্রচারিত হয়নি তখনও। মোদ্দাকথা, আমি তারকা টাইপের কিছু নই। সেই সময়ের নামজাদা তারকারাও কেউ আতিকুল হক চৌধুরীকে ‘না’ বলার আগে দশবার ভাবতেন। আমার এত ভাবনা চিন্তার দরকার ছিল না, কারণ উনাকে আমি ভালোমতোন চিনতামও না। একজন প্রোগ্রাম ডিরেক্টরের কি ক্ষমতা, আর একজন দারোয়ানের কি ক্ষমতা, সেটাও জানা ছিল না।

‘না’ বলার পেছনে আমার শক্ত একটা যুক্তি আছে। নিজের যুক্তি থেকে আমি কখনোই সরে যাই না। একেকজন অভিনেতা একেকভাবে কাজ করে, একেক রকমের ফিলোসফি মেনে চলে। আমার দর্শনটা হলো, যে চরিত্রটা বা যে সংলাপে আমি নিজে বিশ্বাস করতে পারছি না, সেটা আমি যতো মন দিয়েই করি না কেন, কোনমতেই ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারবো না পর্দায়। একটা চরিত্রের সংলাপ পড়ে আমার মনে হলো, আরে, ওর তো এখন এই কথাটা এভাবে বলা উচিত নয়, এটা তো সিচুয়েশনের সঙ্গে যাচ্ছে না- তখন কাজটা আমি করতে পারবো না, সেই সংলাপটা আমার মুখ দিয়ে ভালো হয়ে বের হবে না কোনভাবেই।

অন্য একটা চরিত্র আমার পছন্দ হলো, সেটা দেখিয়ে আতিক ভাইকে বললাম, এটা হলে আমি করতে পারি। উনি বললেন, এই ক্যারেক্টারের তো একটা মাত্র সিকোয়েন্স! আমি বললাম, এই চরিত্রটা লজিক্যাল। আমি করলে এটাই করবো। অডিশন নিয়েও ঝামেলা হলো। বিটিভিতে তখন সব শিল্পীকেই অডিশন দিতে হয়, আমি বললাম, অডিশন দিতে হলে আমি নেই। আতিক ভাই সেটাতেও রাজী হলেন। বিটিভির ইতিহাসে আমিই বোধহয় প্রথম অভিনেতা, অডিশন ছাড়াই যার নাটক প্রচারিত হয়েছিল! সেই নাটকটার নাম ছিল ‘নিখোঁজ সংবাদ’।

আমি তখন করোলা কর্পোরেশনে চাকরী করি। বেতন খুব খারাপ না। অফিস থেকে অভিনয়ের জন্যে ছুটিও দেয়া হয় আমাকে। মঞ্চ-টেলিভিশন দুটোই সমানে চলছে। একটা সময়ে বিরক্ত হয়ে উঠলাম, বুঝলাম, আমাকে দিয়ে চাকরী করাও সম্ভব না, ব্যবসাও সম্ভব না; চাকরীটা তাই ছেড়ে দিলাম। ভেবে দেখলাম, অভিনয়টাই আমি সবচেয়ে কম খারাপ পারি। এটাকেই বেঁচে থাকার অবলম্বন বানানো যায় কিনা, সেই চিন্তা থেকেই সিনেমায় আসা। টেলিভিশনে একটা নাটক করলে তখন আমরা পেতাম ৪২০-৪২৫ টাকা। সেটা দিয়ে তো সংসার চালানো সম্ভব না। একমাত্র যদি আমি সিনেমায় কাজ করি, তাহলে সেটার পারিশ্রমিক দিয়ে সংসারটা চলে যাবে। সিনেমায় আমি কোন শিল্পের সাধনা করার জন্যে যাইনি, কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার জন্যেও যাইনি। একদমই কমার্শিয়াল কারণেই সিনেমা করেছি, শুধু টাকার জন্যে।

১৯৬১ সালে আমি হলে গিয়ে একটা সিনেমা দেখেছিলাম, সেটার নাম ছিল ‘আন’। নায়ক ছিলেন দিলীপ কুমার। তিনি যখনই পর্দায় আসছেন, দর্শক চিৎকার করছে। সেটা দেখে আমি ভাবলাম, দারুণ তো! অভিনয় করলে দেখি লোকের তালি পাওয়া যাবে! আমি সবসময় তাই অভিনেতাই হতে চেয়েছি, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বা সাংবাদিক হতে চাইনি। প্ল্যান এ-বি টাইপের কিছু ছিল না আমার মাথায়।

হুমায়ুন ফরীদি, বিটিভি, পালাবি কোথায়

সিনেমায় নায়ক হবার ইচ্ছে আমার কখনও হয়নি, কারণ আমার চেহারা যে ভালো নয় সেটা আমি জানতাম। এই চেহারার কাউকে পরিচালক নায়ক বানাবেন না। দর্শকও মেনে নেবে না। আর খলনায়ক হবার সুবিধাও আছে, আমি পর্দায় যা খুশী করতে পারছি। আমি একজন মহিলাকে গালি দিতে পারছি, আমার বোনকে বিক্রি করে দিতে পারছি, বাবাকে খুন করতে পারছি। একজন নায়ক এগুলো করতে পারবে কখনও? খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে আমার কোন অনুশোচনা নেই। অভিনয় ব্যাপারটা প্রার্থনার মতো। সেটার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। আমি আমার কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম, সেটার প্রতি আমার অসম্ভব ভালোবাসা ছিল।

মাঝে মাঝে যে আমি নিজের বানানো নিয়ম ভাংতাম না, তেমনটাও না। একটু আগে যে বললাম, আমাকে দিয়ে চাকরী হয় না, ব্যবসা হয় না- সেটা জেনেও কিন্ত আমি ব্যবসা করতে গিয়েছিলাম। একটা সিনেমা প্রযোজনা করেছিলাম কয়েকজন মিলে। সিনেমার নাম ‘পালাবি কোথায়’। আমার মনে হয়েছিল এটা ভালো একটা সিনেমা, কিন্ত সেটা দর্শক দেখলো না, সিনেমাটা মার খেলো। এরপরে আমি আর জীবনে সিনেমা বানানোর কথা ভাবিনি। ভাববো কোত্থেকে, টাকা যা ছিল সেটা তো ওই এক সিনেমাতেই চলে গেছে!

হুমায়ুন ফরীদি, বিটিভি, পালাবি কোথায়

নাটক পরিচালনাটা আমি শিখেছি আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছে। একদম হাতে ধরে ‘ডিরেকশন’ জিনিসটা আমাকে শিখিয়েছিলেন তিনি। তো, মানুষের জীবনে হয় না অনেক সময়, ইচ্ছে হয়, অনেক কিছু তো করলাম জীবনে, এটা একটু করে দেখি। সেরকম আমারও ইচ্ছে হলো, একটা নাটক বানাই। আমার বন্ধু বুলুকে বললাম, বুলু, একটা নাটক বানাবো। সে বললো, চল বানাই। ‘চন্দ্রগ্রস্থ’ বানিয়ে ফেললাম। আমার জীবনের সব কিছুই এমন হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে করা। খোকন(পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন) আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল সিনেমা করবো কিনা, আমি টাকাপয়সার হিসেব শুনে করে ফেললাম। লং টার্ম প্ল্যান আমাকে দিয়ে হয় না, আমি পারি না। যা করি, এরকম হুটহাট করে ফেলি।

আমার কাছে জীবন হচ্ছে- “লাইফ ইজ নাথিং বাট এ জার্নি টুওয়ার্ডস ডেথ।” মৃত্যুর দিকে এক পা দুই পা করে এগিয়ে যাওয়ার নামই হচ্ছে জীবন। আমি আসলে জীবনটা উপভোগ করতে চাই, এবং উপভোগ করেছিও। আমি যখন যেটা ভালো লেগেছে করেছি, যে সিদ্ধান্তটা নেয়া দরকার মনে করেছি, সেটা নিয়েছি। যখন পড়তে মন চায়নি, যাত্রা করেছি; যখন চাকরী করতে মন চায়নি, সেটা ছেড়ে সিনেমায় নেমেছি। জীবনে কখনও আপোষ করিনি। আপোষ তো করে ভীতু মানুষ। আপোষ করে যারা মেরুদণ্ডহীন প্রাণী, তারা। আমার তো মনে হয় আমার মেরুদণ্ড আছে, আমি কেন আপোষ করবো?

হুমায়ুন ফরীদি, বিটিভি, পালাবি কোথায়

আমি কখনও কোথাও গর্ব করে নিজের কাজের কথা বলি না। আমি অমুক নাটক করেছি, অমুক সিনেমায় অভিনয় করেছি, জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি- এসব বলার মতো কিছু নয়। কিন্ত একটা কথা আমি সবসময় ভীষণ গর্ব নিয়ে বলি, আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আমি দেশ স্বাধীন করেছি, আমি একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা। এদেশের সবচেয়ে বড় অহংকারের অর্জনে আমার সামান্য ভূমিকা ছিল, এটা আমি বুক ফুলিয়ে দাবী করি।

আমাদের এই দেশটা আরও সুন্দর হতে পারতো। দেশটা আরও সুন্দর হবে, সেটা আমি বিশ্বাস করি। তার কারণ, আমার গৌরব করার মতো রবীন্দ্রনাথ আছেন, আমার গৌরব করার মতো বঙ্গবন্ধু আছেন, আমার গৌরব করার মতো বাংলাদেশ আছে, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা আছে, মানুষ আছে, কৃষক আছে, শ্রমিক আছে। দেশটা এগুবে না কেন, অবশ্যই এগুবে। কিছু লোক হয়তো মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এরা খড়কুটোর মতো। স্রোত যখন শুরু হবে, এরা সব ভেসে চলে যাবে।

দেশ নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্নটা পরের প্রজন্মের কাছে দিয়ে যেতে চাই। সুনীল বলেছেন না-

“নবীন কিশোর, তোমায় দিলাম ভূবনডাঙার মেঘলা আকাশ,
তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট আর
ফুসফুস-ভরা হাসি… 

ইচ্ছে হয় তো অঙ্গে জড়াও,
অথবা ঘৃণায় দূরে ফেলে দাও, যা খুশি তোমার;
তোমাকে আমার তোমার বয়সী সব কিছু দিতে বড় সাধ হয়…”

আমার স্বপ্ন আমি পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে যাবো না?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button