অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

যে কলেজের ভর্তি ফর্মে ধর্মীয় অপশনে যুক্ত হলো ‘মানব ধর্ম’!

ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাঁহার উপরে নাই। এই বাক্যটা কি সহজ, অথচ এটা বুঝতে গেলে আমাদের মধ্যে কত জটিলতা সামনে চলে আসে। মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার আগে আমরা দেখি তার কি ধর্ম, কি বর্ণ, কোন রাজনৈতিক দলের লোক, গরীব না ধনী, সুন্দর না কালো কত রুপে! ছোটবেলায় শুনেছি, জীবে দয়া করে যেজন, সেজন সেবিচে ইশ্বর। সাধারণ মাথায় আমি যা বুঝেছি এই বাক্যের মাধ্যমে, সৃষ্টিকর্তার করুণা পেতে হলে আগে তুমি তার সৃষ্টি জীবের প্রতি মায়া করো। প্রত্যেকটা জীবকে তুমি সেবা করো, সম্মান করো।

কিন্তু, আমার চেনা সমাজে আমি এসব সরল বাক্যের প্রতিবিম্ব খুঁজে পাই না। মানুষ ভাবে খুব জটিল করে। সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার নামে, ধর্ম রক্ষার নামে কিছু মানুষ বেছে নেয় চরমপন্থাকে। কোথাও গোমাংস খাওয়ার অপরাধে খুন হতে মুসলিমকে, কোথাও হিন্দু হবার অপরাধে মন্দিরে হামলার শিকার হতে হয়। কোথাও, সংখ্যালঘু হবার কারণে অত্যাচারের মুখে পড়তে হয়। এই অসহিষ্ণুতা, এই জটিলতা বড় কষ্ট দেয় মানুষ হিসেবে আমাকে।

এমন অস্থির সময়ে চোখে পড়লো একটা খবর৷ কলকাতার বিখ্যাত বেথুন কলেজের কাজ নিয়ে৷ অনলাইনে ভর্তি আবেদন ফরমে একজন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন তথ্য পূরণ করতে হয়। বেথুন কলেজের ফরমে অভিনব একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা গেল। ধর্মের অপশনের সবার উপরে তারা জায়গা দিয়েছে মানবতাকে! হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সব ধর্মের পাশাপাশি ভর্তি ফরমে মানব ধর্মকে জায়গা দিয়েছেন তারা৷ বর্তমান সময়ে এমন পদক্ষেপকে সাহসী না বলে উপায় নেই।

বেথুন কলেজ কলকাতা, মানবধর্ম, মানবতা

আমরা সবার আগে মানুষ, তারপর আমাদের বিভিন্ন পরিচয় পদবি যুক্ত হয় জীবনের ভিন্নতায়। কিন্তু, এই মানুষ পরিচয়ের মৌলিকতা আমরা অন্যান্য পরিচয়ের কারণে একসময় ভুলে যাই, মানুষকে অপদস্থ, অপমান, আক্রোশ দেখানোতে আমাদের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বেথুন কলেজের ভর্তি ফরমে মানবতাকে যুক্ত করাটা তাই এক অসাধারণ ঘটনা। তারা স্টুডেন্টদের জন্য এই অপশন খোলা রাখছেন, কেউ যদি মানবধর্মকে বেছে নিতে চায় তাহলে এই স্বাধীনতা তার আছে। কেউ যদি মানুষকে ভালবাসার কথা প্রকাশ্যে বলতে চায়, বলুক। বইয়ের পাতার সেই সরল বাক্য, সবার উপরে মানুষ সত্য এই বাণীকে কেউ সরলভাবে নিয়ে মানবতাকে লালন করে, করুক।

বেথুন কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ নারীদের কলেজ। কলেজ হিসেবে এমনিতে এর সুনাম এবং নিজস্ব ঐতিহ্য আছে। আর এবছর অনলাইনে ভর্তি ফরমে ধর্মীয় অপশনে মানবতাকে যুক্ত করার মাধ্যমে তারা মুক্তচিন্তা এবং মানুষে মানুষে সহমর্মিতা বজায় রাখার বার্তাকেই যেন উচ্চারিত করলো। অসহিষ্ণুতার এই সময়ে এমন সিদ্ধান্তকে সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ভাবনার প্রতিফলন বলা যায়।

বেথুন কলেজ, কলকাতা | ছবি- সংগৃহীত

কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান কমলকান্তি সোমের বক্তব্য পড়ে জানা যায়, এটি কলেজের সবার সম্মিলিত একটি সিদ্ধান্ত। অনেক ছাত্রীই মানবতাকে নিজের ধর্ম বলে ভাবতে পছন্দ করেন। তাই, মানবতাকে ধর্ম হিসেবে কেউ বাছাই করতে যেন পারে, সেকারণেই অপশনে এটা রাখা হয়েছে।

ছাত্রীরাও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের কথার সুরে বোঝা যাচ্ছে, ধর্মের নামে হানাহানিকে তারা এই সময়ে এসে আর মেনে নিতে পারছেন না। তাই মানুষ হিসেবে মানবতাকে তারা ধর্ম বলে মনে করছেন। এরকম উদ্যোগ অন্যান্য কলেজেও নেয়া উচিত বলে মনে করেন। মনুষ্যত্বই যদি হারিয়ে যায়, তাহলে শিক্ষা মানুষকে কতটুকুই আর শিক্ষিত করে, ধর্ম যদি হানাহানির হাতিয়ার হয়, তাহলে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকে বাঁচাবে কারা! তাই মানবতার জয় হোক, এমনটাই তাদের স্বপ্ন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button