খেলা ও ধুলা

মুগ্ধতা যখন ‘ব্যক্তি’ ভিরাট কোহলিতে!

প্রায়ই দেখি যে মানুষ বলে, ভিরাট কোহলিকে মানুষ হিসেবে সে দেখতে পারে না। কিন্তু ব্যাটসম্যান কোহলিকে স্বীকার না করে পারে না! আমিও প্রথমদিকে কোহলিকে ‘বেয়াদব’ মনে করতাম। আস্তে আস্তে যতই কোহলিকে দেখি ততই মুগ্ধ হই, এবং হচ্ছি!

কিন্তু তাঁকে শুধু ‘ক্রিকেটার’ বিবেচনায় ভালো কেন বলতে হবে? সে মানুষ হিসেবেও খুব ভালো! মাঠের বাইরে তার একটা খারাপ উদাহরণ আছে? ফিল হিউজের মৃত্যুর পরে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটারদের বাইরে সে একমাত্র ক্রিকেটার যে হিউজের ফিউনারেলে গিয়েছিলো। তার কোহলি ফাউন্ডেশনের কাজের কথা বলে শেষ করা যাবে না। তাতে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের থেকে শুরু করে এতিম শিশু, আবার ক্রিকেটার তৈরি করার জন্য ইয়াং ট্যালেন্টও খুঁজে বের করা হয়। সে নিজে এতিম শিশুদের সাথে গিয়ে সময় কাটায়, বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে সময় কাটায়।

হিউম্যানিট্যারিয়ান দিক নাহয় সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি। বাদ দেই। ক্রিকেটে আসি। সে মাঠের বাইরে তার লেভেলে সব জিনিয়াসদেরই শ্রদ্ধা করে। একটা ছোট উদাহরণ দেই। গত এশিয়া কাপের আগে সংবাদ সম্মেলনে নিজে থেকে পুরো সংবাদ সম্মেলন জুড়ে মুস্তাফিজ আর রাবাদার প্রশংসা করে গেছে। সাংবাদিকেরা কিছু বলেনি। তাঁরা দুইজন সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বোলার। কিভাবে তাদের আরও ভালো করতে হবে, তাদের সমীহ করতে হবে; সেগুলো বলে গেছে। পাকিস্তানের আমিরকে সে এতোটাই এপ্রিশিয়েট করেছে যে বিশ্বকাপ ম্যাচের আগে গিয়ে আমিরকে নিজের ব্যাট উপহার দিয়ে এসেছিলো। এশিয়া কাপের ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ হবার পরে নিজের কথা বাদ দিয়ে আমিরের স্পেলের প্রশংসাই করে গেছে! নিজের ব্যাটিং নিয়ে এতো রেকর্ডের পরেও টেন্ডুলকারের সাথে তুলনা হলেই বলে যে তারটা পুরোটাই পরিশ্রমের ব্যাপার। সাচিনের সাথে তার তুলনাই হতে পারে না। এবিডি ভিলিয়ার্স তার চেয়ে ভালো ব্যাটসম্যান বলতে বলতে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলে। স্টিভেন স্মিথ, কেন উইলিয়ামসনকে তার চেয়ে ভালো মানে। রোহিত শর্মা তার চেয়ে ট্যালেন্টেড; এটা সব জায়গায় বলে।

ব্যক্তিগত জীবনে আসি। এখনকার মিডিয়ার যুগলরা সবকিছু লুকাতে পছন্দ করে। অথচ সে সবজায়গায় হাই ভোকালে আনুশকাকে আগলে রাখে। ২০১৫ বিশ্বকাপের পরে প্রবল সমালোচনার মুখে এয়ারপোর্টে শক্ত হাতে আনুশকাকে ধরে রেখে জনগণের সামনে নিজের স্টেটমেন্ট দিয়েছিলো। সব জায়গায় বলে যে আনুশকা তার জীবনকে গোছাচ্ছে! তাদের সম্পর্ক ভাঙতে পারে অথবা টিকতে পারে। সেটা ভবিষ্যৎ জানে। কিন্তু তার কথাগুলো একটা মেয়ের মধ্যে নির্ভরতার বার্তা দেয়।

বাকি রইলো মাঠে কম্পিটিটিভ থাকার বিষয়টা, গালি দেবার বিষয়টা। লক্ষ্য করলে দেখবেন আগে সে যেভাবে গালি দিতো গত ২ বছরে তা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। সে ‘আপ কি আদালত’ অনুষ্ঠানে গিয়েছিলো। ওখানে তার বিরূদ্ধে এই অতি আক্রমাত্মক ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ করা হয়েছিলো। বলা হয়েছিলো যে তার এই ব্যবহার বাচ্চারা শিখবে। তখনই কোহলি কথা দিয়েছিলো যে সে চেষ্টা করবে এই ব্যাপারটা পরিহার করতে। সে এরপরে অনেকটাই কমিয়েছে। এটাকেই নিজেকে শোধরানো বলে। তবু এখনো সে যে স্লেজিং করে না, বা অতি আক্রমাত্মক হয় না, তা নয়। কিন্তু মাঠের মধ্যে যেমন বাউন্সার খেয়ে মিচেল স্টার্ককে গালি দেয়, তেমনি মাঠ থেকে বের হয়েই সেই স্টার্কের সাথেই গলা মেলায়, সংবাদ সম্মেলনে স্টার্কের প্রশংসা করে। আবার যেমন স্টিভেন স্মিথের প্রশংসা করে ব্যাটসম্যান হিসেবে, সমীহ করে; ঠিক তেমনি স্মিথের ‘ব্রেইন ফেড’ নিয়ে তীব্র ঝাঁঝালো মন্তব্য করে!

আইপিএলের প্রথম দুই সিজনের পরে সে বুঝলো যে ফিট না হলে একটুও উপায় নেই। সে দিল্লীর ছেলে। তার প্রিয় খাবার ‘বাটার চিকেন’। গত ৫ বছর হয় সে ‘বাটার চিকেন’ খায় না, মিষ্টি খায় না। সেদ্ধ মুরগী, সবজিই তার খাওয়া। অফ সিজনেও প্রতিদিন ন্যূনতম গড়ে চার ঘণ্টা জিমে কাটায়। তাঁকে এতো পার্টিবাজ হিসেবে জানি আমরা, বলিউড নায়িকা তার গার্লফ্রেন্ড। অথচ একেবারেই বিশেষ কোন অনুষ্ঠান ছাড়া সবসময়েই রাত দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। প্রতিদিন রাত ১০টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে, এমনকি খেলা না থাকলেও! প্রত্যেকটা ম্যাচ শেষে নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করে। কোন একটা শট ভুল হলে সেটা কিভাবে ঠিক করা যায় সেটা নিয়ে চিন্তা করে। এমন রেকর্ড থাকার পরেও কয়জন ব্যাটসম্যান প্রতিটা ম্যাচ শেষে নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে এতটা প্যাশনেট থাকে?

সেদিন এক সাক্ষাৎকারে তার ট্রেনিং আর হার্ডওয়ার্ক নিয়ে কথা বললেন। “যেমন একটা ক্যাচের কথাই ধরেন, ক্যাচ ধরতে দৌড় শুরু করলেন, মিস হলো, মানুষ বললো Great Effort. কিন্তু আপনার ক্যাচ ধরতে গিয়ে Point A থেকে Point B এর দূরত্ব কাভার করতে আপনার ত্বরণ কত সেকেন্ডে হয়েছে, তার জন্য আপনি কতটুকু ট্রেনিং করেছেন, আপনার পুষ্টি কতটুকু ছিল, ঘুম ঠিক টাইমে ছিলো কিনা এসব জিনিসই ঠিক করবে অই দূরত্ব আপনি ৩ সেকেন্ডে কাভার করেছেন নাকি ২ সেকেন্ডে কাভার করেছেন। আপনি ২ সেকেন্ডে কাভার করতে পারলে সহজ ক্যাচ। আপনি ৩ সেকেন্ডে কাভার করলে Great Effort. এটা খুব সামান্য মার্জিন এর ব্যাপার, এক সেকেন্ডের ব্যাপার। আপনি কি ওই ১ সেকেন্ডের জন্য ট্রেনিং এবং হার্ডওয়ার্ক করছেন কিনা সেটাই হলো আসল কথা!”- এভাবে কে চিন্তা করে, কয়জন চিন্তা করে?

ভিরাট কোহলির প্রফেশনালিজম, ক্রিকেটীয় সেন্স, পরিশ্রম, মানুষ হিসেবে কাজকর্ম দেখার পরে শুধুমাত্র মাঠের মধ্যে তার প্যাশন বা এগ্রেশন দেখে তাঁকে “গালি দেয়া” বা “শুধু ব্যাটসম্যান” হিসেবে ভালো বলা একেবারেই উটপাখির বালিতে মুখ ডুবানোর পরিচায়ক!

বাবার মৃত্যুর পরেরদিন শুধুমাত্র প্যাশন আর প্রফেশনালিজম থেকে ব্যাটিংয়ে নেমেছিলেন। ফলো অন বাঁচানো ৯০রান করেছিলেন ২৩৮ বলে। নিজেই বলেছেন যে যেদিন সকালে উঠে মনে হবে শরীর আর চলছে না, অথবা ক্রিকেটের প্রতি প্যাশনটা কমে গেছে, অথবা জয়ের ক্ষুধা আসছে না। সেদিনই তিনি ক্রিকেট ছেড়ে দিবেন!

কিন্তু সে অনুকরণীয়। প্রত্যেকটা মুহূর্তে নিজেকে কিভাবে উন্নতি করতে হয়, পরিশ্রম করে কিভাবে নিজেকে খুব ভালো থেকে গ্রেট থেকে গ্রেটেস্টদের কাতারে নিয়ে যেতে হয়, তার আদর্শ উদাহরণ ভিরাট কোহলি! আপাতত “মানুষ” কোহলির বন্দনা করি। আর নিজেদের সৌভাগ্যবান ভাবি যে এই কোহলিকে আমরা ‘লাইভ’ দেখতে পারছি!

(লেখাটি ঠিক এক বছর পূর্বের লেখকের ফেসবুক স্ট্যাটাস হিসেবে প্রকাশিত)

আরও পড়ুন-

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button