টেকি দুনিয়ার টুকিটাকি

আমেরিকায় নিষিদ্ধ হওয়ার পর হুয়াওয়ের পরিণতি কি হবে?

আমেরিকা সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে চীনা মোবাইল জায়ান্ট হুয়াওয়ে-কে সেদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে গতকাল। অভিযোগ, হুয়াওয়ে তার আমেরিকান গ্রাহকদের গোপন তথ্য চীনা সরকারের হাতে তুলে দিচ্ছে! আর তাই ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন তার সিদ্ধান্ত- কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে হুয়াওয়েকে। যদিও আমেরিকান সরকার বছরখানেক ধরেই দাবী করে আসছিল যে, হুয়াওয়ে আমেরিকান নাগরিকদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছে। তবে এটা মোটামুটি পরিস্কার যে, বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই দেশের ট্রেড ওয়ারের যাঁতাকলে পড়ে পিষ্ট হতে হচ্ছে হুয়াওয়েকে।

অ্যাপল এবং স্যামসাঙের পরে আমেরিকায় তৃতীয় বৃহত্তম মোবাইল ব্যবহারকারী ছিল সম্ভবত হুয়াওয়েরই, কাজেই প্রতিষ্ঠানটির জন্য এটা বড়সড় একটা ধাক্কা। শোনা যাচ্ছে, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড থেকেও একই দুঃসংবাদ পেতে যাচ্ছে হুয়াওয়ে।

তার ওপরে গুগল, কোয়ালকম এবং ইন্টেলের মতো আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলো হুয়াওয়ের সঙ্গে তাদের চুক্তি বাতিল করে সব সার্ভিস পুনঃনবায়ন না করার ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ হুয়াওয়ের গ্রাহকেরা এখন থেকে গুগলের তরফ থেকে অপারেটিং সিস্টেমের কোন আপডেট পাবেন না, এমনকি প্লেস্টোর থেকে কোন অ্যাপসের আপডেটও আর পাওয়া যাবে না হুওয়ায়ে’র অ্যান্ড্রয়েড ফোনগুলোতে। ব্যবহার করা যাবে না ইউটিউব, জিমেইল বা গুগল ম্যাপসের সুবিধাগুলোও।

তবে এই নিষেধাজ্ঞাটা হুয়াওয়ের আপকামিং ফোনগুলোর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেসব মোবাইল এখন বাজারে আছে, সেগুলো গুগলের সেবার আওতাভুক্ত থাকবে, তবে পাওয়া যাবে না অপারেটিং সিস্টেম আপডেট বা সিকিউরিটি আপডেট।

হুয়াওয়ের মতো টেক জায়ান্ট, যারা বর্তমান বাজারে স্যামসাঙের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বীতায় লিপ্ত- তাদের জন্যে এই সমস্যার সমাধান করাটা যথেষ্টই কঠিণ। তবে এরকম কিছু যে ঘটতে পারে, সেটা সম্ভবত হুয়াওয়ের কর্তাব্যক্তিদের জানা ছিল। গত কয়েক বছর ধরেই শোনা যাচ্ছে, অ্যান্ড্রয়েডের বিকল্প একটা প্ল্যাটফর্ম নিয়ে কাজ করছে হুয়াওয়ে, যদিও সেটার অগ্রগতি কতদূর, সে সম্পর্কে কোন পরিস্কার খবর নেই।

এখন বদলে যাওয়া এই পরিস্থিতিতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে হুয়াওয়েকে খুব দ্রুতই নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম বাজারে নিয়ে আসতে হবে। সেটাকে জনপ্রিয় করে তোলাটা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং, নোকিয়ার মতো জনপ্রিয় কোম্পানী যেখানে মোবাইলে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করায় মোটামুটি খাদে পড়ে গিয়েছিল, সেখানে অ্যান্ড্রয়েডকে বাদ দিয়ে আলাদা অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে গ্রাহককে কনভিন্স করে বাজার ধরার কাজটা সহজ কিছু নয়। হুয়াওয়ে’র গ্রাহকেরাই বা কতটা সাড়া দেবেন, সেটা নিয়েও আছে সন্দেহ।

তবে হুয়াওয়ের সামনে আশার ব্যাপার হচ্ছে, তাদের সবচেয়ে বড় মার্কেটপ্লেস চীন, আর চীনে গুগলের পরিসেবা চালু নেই। ফলে জিমেইল, গুগল ম্যাপ বা ইউটিউব না থাকলেও হুয়াওয়ের চীনা কাস্টোমারদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। হুয়াওয়ে মূল সমস্যায় পড়বে চীনের বাইরে নিজেদের ব্র‍্যান্ডভ্যালু ধরে রাখার ক্ষেত্রে। ভারত-বাংলাদেশ বা এশিয়া-ইউরোপের অন্য কোন দেশের গ্রাহকেরাই আইওএস বা অ্যান্ড্রয়েডের বাইরের কোন প্ল্যাটফর্মে হুট করেই সুইচ হতে চাইবেন না।

হুয়াওয়ের সামনে এখন উপায় দুটো, এক হচ্ছে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ মোবাইলের পরিণতি বরণ করে নেয়া। অনেকেই যেটা ধারণা করছেন, হুয়াওয়ের শেষ ঘন্টা বেজে গেছে। বিকল্প উপায় অবশ্যই আছে, সেই রাস্তাটা কঠিণ, তবে অসম্ভব কিছু নয়।

কোয়ালকম যেমন হুয়াওয়ের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে কোয়ালকমের প্রসেসর বা ফার্স্ট চার্জিং প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না হুয়াওয়ে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মোবাইল প্রসেসরে হুয়াওয়ে অনেক বছর ধরেই নিজস্ব ‘কিরিন’ সিরিজের চিপসেট ব্যবহার করে আসছে, যেটা অনেকক্ষেত্রে কোয়ালকমকেও টেক্কা দিতে সক্ষম।

হুয়াওয়ের সর্বশেষ ফ্ল্যাগশিপ ফোন পি-৩০ প্রো-তে যে কিরিন-৯৮০ প্রসেসর ব্যবহার করেছে হুয়াওয়ে, সেটা কোয়ালকমের লেটেস্ট চিপসেট ৮৫৫ এর চেয়েও বেশি কর্মক্ষম। ফার্স্ট চার্জিঙের ক্ষেত্রেও কোয়ালকমকে বাদ দিয়ে ওয়ানপ্লাসের ড্যাশ চার্জ বা ওপ্পো’র ভুক চার্জ প্রযুক্তি ব্যবহার করতেই পারে তারা, অথবা নিজেদেরই নতুন কোন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা সম্ভব।

প্রসেসরে যেমন নিজস্ব একটা ধারা তৈরি করেছে হুয়াওয়ে, তেমনই অপারেটিং সিস্টেমেও বৈপ্লবিক একটা পরিবর্তন নিয়ে আসা সম্ভব। আবারও বলছি, কাজটা যথেষ্ট কঠিণ, যেহেতু প্রতিপক্ষের নাম গুগল- তবে অসম্ভব কিছু নয়। হুয়াওয়ের টেকনিক্যাল টিম এবং মার্কেটিং টিম এখন কতটা পারদর্শীতা দেখাতে পারবে এক্ষেত্রে, সেটার ওপরই নির্ভর করছে হুয়াওয়ের ভবিষ্যত, প্রযুক্তির বাজারে হুয়াওয়ের টিকে থাকা-না থাকা।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button