সিনেমা হলের গলি

ভৌতিক সিনেমায় অভিনয়, আর নয় আর নয়!

হরর মুভি সাধারণত ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে সবাই পছন্দ করে। ঠান্ডা আবহাওয়া কিংবা বৃষ্টির রাতগুলোতে ভৌতিক এসব সিনেমা দেখার যে একটা অপার্থিব আনন্দ, সেটা যারা দেখেছে তারাই শুধুমাত্র সেই অনুভূতিটা বুঝতে পারবে। হরর মুভি দেখুন ভালো কথা, কিন্তু আপনার মনে কি কখনও প্রশ্ন জেগেছে এই যে মুভি গুলোর অভিনেতা অভিনেত্রী কলাকুশলি যারা অভিনয় করে, তারা এই হরিফিক ক্যারেক্টার গুলোতে অভিনয় করার সময় কি চিন্তা করে? কিভাবে এই অপার্থিব ভয়াল ক্যারেক্টার গুলো তারা তাদের মাঝে ধারন করে? সেই চরিত্রে অভিনয় করার পর তাদের মধ্যে সেই চরিত্রের প্রভাব থাকে না কিনা- এরকম প্রশ্ন মনে আসাটাই স্বাভাবিক।

দক্ষ অভিনেতারা হরর সিনেমায় অভিনয় করার সময় উইয়ার্ড ক্যারেক্টারটা নিজের মধ্যে ধারন করার জন্য পরিচালকের নির্দেশে অথবা নিজের অভিপ্রায়ে নানান রকম কায়দা কানুন অনুসরণ করে। কিন্তু, এই চরিত্রগুলো যে পরবর্তীতে একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর মনে কি ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে সেটার সাতকাহন এখন তুলে ধরবো।

✪✪ ম্যালকম ম্যাকডয়েল- এ ক্লকওয়ার্ক(১৯৭১) ✪✪

হলিউডের প্রভাবশালী ডিরেক্টর স্ট্যানলি কুবরিকের নাম আমরা অনেকেই শুনেছি। তার পরিচালনার ইতিহাসে সবচেয়ে কন্ট্রোভার্সিয়াল মুভিটি ছিল “A Clockwork Orange”। এই মুভিটা যদিও ভৌতিক কোন ঘরানার ছিল না তবে এই মুভির প্রধান চরিত্র ম্যালকম ম্যাকডয়েল এর চরিত্রটা ছিল একজন স্যাডিস্টিক সাইকোপ্যাথের। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই মুভির যতগুলো সিনে এই সাইকোপ্যাথের দেখা আপনি পাবেন, কোথাও তার চোখে পলক ফেলাটা দেখবেন না আপনি।

মুভির পরিচালক একজন সাইকোপ্যাথের চোখের ঠান্ডা দৃষ্টি ফুটিয়ে তোলার জন্য ম্যালকম-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন কোন সিনেই চোখের পলক ফেলা যাবে না। একটা সিন শুট করতে দেখা যেত প্রচুর সময় লাগত কারণ স্ট্যানলি কুব্রিক ছিলেন একজন খুতখুতে পরিচালক। কোন সিনে চোখের পলক ফেলতে দেখেছেন ম্যালকমকে, ব্যাস সেই সিন বাতিল। আবার নতুন করে সেই সিন রিশুট করা লাগতো, এভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা চোখের পলক না ফেলার কারণে ম্যালকমের চোখের কর্নিয়াতে প্রদাহ শুরু হয় এবং এক সময় সেটা ভয়াবহ আকার ধারন করে।

✪✪ টিপ্পি হার্ডেন- দ্যা বার্ডস(১৯৬৩) ✪✪

আলফ্রেড হিচককের একটা মিস্ট্রি হরর মুভির নাম হচ্ছে “The Birds”। এই মুভির প্রেক্ষাপট অনেকটা এরকম ছিল, ক্যালিফোর্নিয়ার মানুষদের ওপর হঠাত করে বিভিন্ন পাখি আক্রমন শুরু করে এবং পাখিদের আক্রমন থেকে সার্ভাইব করা নিয়ে মুভির মেইন প্লট রচিত হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই, মুভির প্রয়োজনে প্রচুর সংখ্যক পাখির মৃত্যু মানুষের হাতে এরকম কিছু সিন ছিল। এই মুভিতে নারী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন টিপ্পি হার্ডেন। কিছু বিশেষ দৃশ্যে হিচকক ডামি পাখির বদলে আসল পাখি ব্যবহার করেছিলেন, যখন মুভির শেষে নায়িকা আসল ঘটনা জানতে পারেন তখন বড্ড বিমর্ষ হয়ে পড়েন তিনি কারণ চরিত্রের প্রয়োজনে অনেক পাখিকে মারতে হয়েছে তাকে।

মুভির শুটিং শেষ হওয়ার পর হেড্রেন আর হিচককের সাথে কোন যোগাযোগ করেন নি।

✪✪ লিন্ডা ব্লেয়ার- দ্যা এক্সোরসিস্ট(১৯৭৩) ✪✪

হরর মুভির ইতিহাসে “The Exorcist ” সিনেমাটা হচ্ছে কাল্ট একটি মুভি। এই মুভিতে একজন পজেস কিশোরী মেয়ের লোমহর্ষক চরিত্রে অভিনয় করে সবার আত্মা কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন লিন্ডা ব্লেয়ার। পরবর্তীতে, মুভিটা যখন শেষ হয়, রেডিওতে এক সাক্ষাতকারে লিন্ডা বলেন, যখন তিনি এই চরিত্রটাতে অভিনয় করেছিলেন চরিত্রটা ফুটিয়ে তোলার জন্য পজেস ছিল আগে- এরকম কিছু মানুষের সাথে দেখা করেছিলেন, ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের পরিবারের সাথে পজেশনের মুহূর্তকার বিভিন্ন সময়ের অভিজ্ঞতার কথা শুনতেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। এই বিষয়গুলো তখন তার চিত্ত ভাল রকম নাড়া দিয়ে গিয়েছিল।

হরর ফিল্ম, ভৌতিক সিনেমা, হলিউড, দ্যা এক্সোরসিস্ট, আলফ্রেড হিচকক, স্ট্যানলি কুব্রিক

মুভিটি রিলিজ হওয়ার পর, লিন্ডা অকস্মাৎ কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হন নিজের কাছেই। প্রশ্নগুলো ছিল পজেশন, ফেইথ এবং ক্যাথোলিজম নিয়ে যেগুলো নিয়ে বিশ্বাস অবিশ্বাসের টানা পোড়েনে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।

✪✪ মিয়া ফারো- রোজমেরি’জ বেবি(১৯৬৮) ✪✪

এক্সরসিস্টের পর আরেকটি কাল্ট হরর মুভি হচ্ছে “Rosemary’s Baby “। পরিচালক রোমান পোলান্সকির ডেব্যু মুভি রোজমেরিস বেবিতে মিয়া ফারো অভিনয় করতে গিয়ে কিছু ট্রমাটাইজিং এক্সপেরিয়েন্সের সম্মুখীন হয়েছিলেন। ফেরোকে ডিরেক্টর পোলানস্কি চরিত্রের প্রয়োজনে মুরগীর কাঁচা মাংস খেতে বলেছিলেন। কাঁচা মাংস খাওয়ার সময় ফেরোর রক্তাভ মুখে এক বিচিত্র জিঘাংসার অভিব্যাক্তি চাচ্ছিলেন ডিরেক্টর, কিন্তু ফেরো সেই এক্সপ্রেশন ফেসে আনতে পারছিলেন না। এই একটা সিন শুট করার জন্য বাধ্য হয়ে বারংবার তাকে কাঁচা মাংস খেতে হয়েছিল।

এই দৃশ্যে তার অভিনয় এতটাই জান্তব ছিল তার হাজবেন্ড ভয় পেয়ে তাকে ডিভোর্স লেটার পর্যন্ত ধরিয়ে দিয়েছিলেন শুটিং স্পটে সবার সামনে তার হাতে। মুভির কাজ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘদিন এসব ব্যাপার নিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যন্ত ছিলেন ফেরো।

✪✪ ব্লেয়ার উইচ প্রোজেক্ট সিনেমার পুরো ইউনিট(১৯৯৯) ✪✪

এই মুভির থিমটা ছিল, জঙ্গলে ডকুমেন্টারির শুটিং করতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলা তিনজন ফিল্ম বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীর সার্ভাইবিং নিয়ে। পথের দিশা পেতে পেতে ক্লান্ত রিক্ত ভীত চরিত্র গুলো তাদের ফেসে ফুটিয়ে তোলার জন্য পরিচালক এক অভিনব পন্থা ইউজ করেছিলেন।

মুভির শুটিং এর জন্য জঙ্গলের মধ্যে সব মিলিয়ে আট দিন ক্যাম্পিং করা হয়েছিল। তাদের ক্লান্ত বিষন্ন এক্সপ্রেশন মুখে আনয়নের জন্য মুভর পরিচালক গোপনে রাতে ঘুমানোর সময় অভিনেতাদের তাবু ছুরি দিয়ে কেটে, পাথর মেরে ছিড়ে ফেলতেন যাতে অভিনেতারা ঘুমোতে না পারে। তাদের দৈনন্দিন খাবার দাবারের পরিমানও বহুলাংশে কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল সত্যিকারের ক্ষুধার্থ অভিব্যাক্তি যেন তারা মুখে ফুটিয়ে তুলতে পারে। এতে করে অভিনেতারা আস্তে আস্তে এংরি আর ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

✪✪ জ্যানেট লেইগ- সাইকো(১৯৬০) ✪✪

“সাইকো”-মুভিটি হচ্ছে হিচককের আরেকটি ক্লাসিক হরর ফিল্ম। এই মুভির একটা শাওয়ারের সিন ছিল যেখানে অতর্কিতভাবে মুভির নায়িকা জ্যানেট লেইগ কে আক্রমন করা হয়। সিনেমার পর্দায় এই হরিফিক সিন দেখে জ্যানেট ভীষণ ঘাবড়ে যান। দীর্ঘদিন তিনি শাওয়ার নিতে পারতেন না কারণ মুভির সেই দৃশ্যটা তার মনে ঘুরপাক খেত।

হরর ফিল্ম, ভৌতিক সিনেমা, হলিউড, দ্যা এক্সোরসিস্ট, আলফ্রেড হিচকক, স্ট্যানলি কুব্রিক

✪✪ জেনিফার কার্পেন্টার- দ্যা এক্সোরসিজম অব এমিলি রোজ(২০০৫) ✪✪

“দ্যা এক্সোরসিজম অব এমিলি রোজ”- এই মুভিটি ছিল একটি রিলিজিয়াস হরর ফিল্ম, যেখানে মূখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিনেত্রী জেনিফার কার্পেন্টার। মুভিটি রিলিজ হওয়ার পর, দ্যা গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে জেনিফার তার কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন যেগুলো ঘটেছিল মুভিটির শুটিং চলাকালীন সময়ে।

শুটিং স্পটে অভিনয় করতে করতে অনেক রাত হয়ে যেত। সেখানেই অস্থায়ী ক্যাম্প গেড়ে স্পটের সবাই ঘুমাতেন। জেনিফারের সাথে একটা রেডিও থাকতো অলয়েজ। রাত্রে যখন তিনি ঘুমাতেন হঠাত করে রেডিওটা অন হয়ে যেত।

যে হোটেলে তিনি অবস্থান করেছিলেন শুটিং এর জন্য, মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন উদ্ভট ইলেক্ট্রনিক গোলযোগ দেখা যেত সেখানে। টেকনশিয়ানরা এই বৈদ্যুতিক গোলযোগ সম্পর্কে বিস্তর ঘাটাঘাটি করেও সমস্যার কোন ক্লু খুঁজে পায়নি।

লেখক- মোহাম্মদ ইউসুফ 

তথ্যসূত্র- রিডার্স ডাইজেস্ট। 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button