ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

‘হর্ন হুদাই বাজায় ভুদাই’ ও একজন রয়েলের গল্প!

রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, হাজার হাজার যানবাহন ছুটে চলেছে আপন গন্তব্যে। যন্ত্রনগরীতে মানুষগুলোও যন্ত্রের মতোই ছুটতে থাকে নিজ নিজ ব্যস্ততায়। এরমধ্যেও হঠাৎ চোখে পড়বে এক যুবককে। হাতে হলুদ রঙের একটা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন রোড ডিভাইডার কিংবা রাস্তার সংযোগস্থলে। সেই প্ল্যাকার্ডে চারটা শব্দের একটা বাক্য লেখা- হর্ন হুদাই, বাজায় ভুদাই! মানুষটার নাম মমিনুর রহমান রয়েল, অযথা হর্ন বাজানোর বিপক্ষে নিজ উদ্যোগেই প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি অনেকদিন ধরে। চালকদের অনেকের মধ্যেই অকারণে হর্ন বাজানোর যে বিচ্ছিরি প্রবণতাটা আছে, সেটাই দূর করার চেষ্টা করছেন তিনি, আর সেকারণেই তার রাস্তায় নামা।

ঢাকা শহরটা যে দিনদিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে, কিংবা অনুপযুক্ত হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই, সেটার পেছনে বড় একটা ভূমিকা রেখেছে শব্দদূষণ। ঢাকার রাজপথে গাড়ির চালকেরা সবাই যেন একেজন রাজা-বাদশাহ! এক মিনিট সময় বাঁচানোর জন্যে, কিংবা আধফুট জায়গা খালি পাবার জন্যে সামনের গাড়ির দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে বাসচালক থেকে শুরু করে মোটরসাইকেল চালক, সবাই সমানে হর্ন বাজিয়েই যান। এই কর্কশ শব্দটা যে আশেপাশের আরও পঞ্চাশটা মানুষের যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠছে, সেটা আমাদের মাথায় ঢোকে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শব্দদূষণের মাত্রা ষাট ডেসিবেল অতিক্রম করলেই সেটা মানুষের জন্যে ক্ষতিকারক। হঠাৎ করে ৬০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ কানে এলে মানুষ ক্ষণিকের জন্যে শ্রবণশক্তিও হারিয়ে ফেলতে পারে। আর সেই মাত্রা ১০০ ডেসিবেল অতিক্রম করলে মানুষ চিরতরে বধিরও হয়ে যেতে পারে। সেখানে ঢাকার রাস্তাগুলোতে প্রতিনিয়তই দিনের বেশিরভাগ সময় শব্দদূষণের মাত্রা আশি ডেসিবেল ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই দূষণটা আমরাই করছি, নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করে চলেছি অজান্তে, কিংবা হয়তো জেনেশুনেই!

যশোরের ছেলে রয়েল ঢাকায় থাকেন বেশ কয়েক বছর ধরে। গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন তিনি। ঢাকা শহরে চলতে ফিরতে বিরক্তিকর এই শব্দদূষণের সঙ্গে তার যুদ্ধের সূচনা। শুরুর গল্পটা শোনা যাক রয়েলের মুখ থেকেই-

‘শুরুটা চার বছর আগে। আমার ভাবনা ছিল, ঢাকা এমন কোনও শহর না যেখানে ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি নিয়ে আপনার প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে কেউ দাঁড়িয়ে থাকবে। এত জনবহুল একটা শহরে অযথা হর্ন বাজানোর দরকার নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্টাডি করেছি, যারা এক্সপার্ট তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। অতিরিক্ত হর্নের কারণে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। মানুষের টেম্পারমেন্ট কমে যায়, উচ্চ রক্তচাপ হয়, গর্ভবতী মায়ের সন্তান ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে।’

রয়েল বলছিলেন, ‘এই চিন্তা থেকেই একটু একটু করে কাজ শুরু করি। প্রথমে একটি লেখা লিখলাম। মূলভাবটা হচ্ছে, ঢাকার লোকজন ‘হুদাই’ কথাটা অকারণ অর্থে বলে। ‘ভুদাই’ শব্দটা স্থূল বুদ্ধি লোক বা মাথামোটা মানুষ অর্থে ব্যবহার হয়। দুটো শব্দকে মার্জ করে এমন একটা লাইন করতে চেয়েছি, যেটা পড়ে মানুষ হাসবে। পাশাপাশি লজ্জাও পাবে। আমরা রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে একটা অহেতুক প্রতিযোগিতা শুরু করি। হর্ন বাজিয়ে আমরা হয়ত মনে করি, সামনের লোকটা সরে গিয়ে আমাকে জায়গা দিতে বাধ্য। কিন্তু সামনের লোকটা সরে কোথায় যাবে? জায়গাতো নেই। তাই শুধু শুধু হর্ন বাজিয়ে নিজেকে প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলার তো কোন মানে নেই।’

শুরুটা একা করলেও, রয়েল এখন পাশে পাচ্ছেন বেশ কয়েকজনকে। হলুদ প্ল্যাকার্ড নিয়ে তিনি রাস্তায় নামেন, সেখানে এখন তার সঙ্গী হন আরও বেশ কয়েকজন। রয়েলের কথা এখন অনেকেই জানেন, তাকে চেনেন। রয়েল যখন ‘হর্ন হুদাই বাজায় ভুদাই’ লেখা কাগজ নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ান, তার সঙ্গে সেলফি তুলতে আসেন কেউ কেউ। গাড়ির ড্রাইভার কিংবা মোটরসাইকেলের চালকেরাও তার দেয়া লিফলেট সাগ্রহে হাতে নেন। রয়েলকে দেখলে লজ্জায় হলেও তারা ক্ষণিকের জন্যে হর্ন বাজানো বন্ধ করে দেন, উল্টো কেউ হর্ন বাজালে তার দিকে কড়া চোখে তাকায় সবাই।

রয়েলের এই উদ্যোগটা এখন ঢাকার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক গাড়ির পেছনেই হলুদ স্টিকারে এই লেখাটা দেখতে পাওয়া যায়- হর্ন হুদাই, বাজায় ভুদাই! এই লেখা নিয়ে টিশার্ট বানানো হয়েছে, বাংলাদেশে হর্নবিরোধী একমাত্র ক্যাম্পেইন এটি, তাই সবাই অকুণ্ঠ প্রশংসাও করেছে। ট্রাফিক পুলিশেরাও দারুণ সাহায্য করেন তাকে। ফেসবুকে পোস্টার বানিয়ে রয়েল যে সামাজিক আন্দোলনটা শুরু করেছিলেন, সেটাকে তিনিই রাজপথে নিয়ে এসেছেন, রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাদের কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করেছেন আপ্রাণ।

এই শহরটা আমাদের, এই দেশটাও আমাদেরই। ধীরে ধীরে এই প্রাণের শহরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে না দিয়ে আমরাই একে সজীব করে রাখতে পারি। আমরাই পারি গাড়ির হর্ন না বাজিয়ে রাস্তায় চলতে, আমরা পারি ফুটপাথে মোটরসাইকেল না উঠিয়ে ফুটপাথটাকে শুধু হাঁটার জায়গা হিসেবে রাখতে, আমরা পারি যেখানে যেখানে ময়লা আবর্জনা না ফেলে শহরটাকে ভাগাড়ে পরিণত হবার হাত থেকে রক্ষা করতে। দরকার শুধু রয়েলের মতো সচেতনতা।

আমি একা করলে কি হবে, বাকিরা তো ঠিকই উল্টো রাস্তায় চলছে- এই ভাবনাটা ভুল। ভীষণ রকমের ভুল। রয়েলও একা ছিলেন, তাকে কেউ চিনতো না, শুধু নিজের দায়িত্ববোধ থেকে তিনি প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন, দিনের পর দিন দাঁড়িয়েছেন রাজপথে, এখনও প্রতিদিন সব কাজ সামলে পাঁচটা মিনিটের জন্যে হলেও প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ান তিনি, চেষ্টা করেন মানুষের মধ্যে সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে। মমিনুর রহমান রয়েলকে দেখলে আমাদের গর্ব হয়, সেইসঙ্গে খানিকটা লজ্জা আর অনেকটুকু আফসোসও হয়! আমরা কেন রয়েল হতে পারি না? কেন আমাদের দেশে হাজার হাজার রয়েল নেই?

ছাড়পত্রে সুকান্ত লিখেছিলেন,
যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ,
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

রয়েলও নিশ্চয়ই তার একমাত্র মেয়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছেন, এই শহরটাকে বসবাসের যোগ্য করেই রেখে যাবেন, প্রাণপনে সরাবেন এই শহরের জঞ্জালগুলো। আমরা কি পারি না, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে এমনভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে? রয়েলের পাশে দাঁড়ানো, তার এই আন্দোলনে সমর্থন দেয়া তো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব, সেই দায়িত্ব থেকে আর কতদিন আমরা পালিয়ে বেড়াবো?

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button