মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

পদ্মা সেতুতে কল্লা, সাইদ খোকনের রসিকতা ও উন্নয়নের যত ফিরিস্তি!

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প অফিসিয়ালি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে ভাই, সেতু নির্মাণের জন্যে আবাল বাঙালির মাথার কোন প্রয়োজন নাই, বালু-সিমেন্ট-রড আর ইট দিয়েই আমরা সেতু বানাইতে পারবো। একটা জাতি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কতটা দেউলিয়া হলে হাজারে হাজারে মানুষ এই ‘সেতুর জন্যে কল্লা চাই’ গুজবে বিশ্বাস করতে পারে, এটা ভাবতেও অবাক লাগে। বাঙালি যে ঘরে বাইরে ঘাটে মাঠে যেতে আসতে খালি মারার উপরে থাকে, সেটার জন্যে এই কুশিক্ষা বহুলাংশে দায়ী। অবশ্য, বুয়েটে পড়ুয়া পোলাপান যখন চাঁদে সাঈদী হারামজাদার খোমা দেখে ফেলে, তখন আর বাকীদের কথা কিইবা বলা যায়!

যাই হোক, পদ্মাসেতুতে মানুষের কাটা মাথা লাগুক আর না লাগুক, ঢাকা শহরে কিন্ত একজন মাথার ব্যাথায় মাথা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। যানজট কমানোর জন্যে শহরের তিনটা গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা থেকে রিক্সা চলাচল নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন দক্ষিনের মেয়র সাঈদ খোকন সাহেব। ঢাকা শহরে জ্যাম লাগে প্রাইভেট কারের জন্যে, পাবলিক বাসের যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার ফাত্রামীর জন্যে- এসব মাথায় না নিয়ে রিক্সা বন্ধ করে কি লাভ? এয়ারপোর্ট-বনানী রোডে জীবনে রিকশা চলতে দেখি নাই, বিজয় সরণীতে রিকশার দেখা পাওয়া তো স্বপ্নে পাওয়া মহৌষধীর মতো ব্যাপার, ফার্মগেট-শাহবাগ রোডে ছুটির দিন ছাড়া কখনোই রিকশা নামে না- তাহলে এসব জায়গার সীমাহীন যানজটের রহস্য কি?

রহস্যের সমাধানে খোকন সাহেবের খুব একটা আগ্রহ না থাকলেও, ফ্রি ফ্রি উপদেশ বিলানোতে তার আগ্রহের সীমা নাই। জনসাধারণকে তিনি উপদেশ দিয়েছেন, স্বল্প দূরত্বের পথ হেঁটে যাবেন, স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। ফিজিক্যাল স্ট্যাটিসটিকস দেখে উনাকে আমার কখনোই ফিটনেস ফ্রীক টাইপের পাবলিক মনে হয় নাই, হুট করে মানুষটার কি হইলো কে জানে!

উনি আবার রিক্সাচালকদের উপদেশ দিয়েছেন, গ্রামে গিয়ে ধান কাটার জন্যে, কারণ সেখানে ধান কাটার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সাঈদ খোকন বাস্তববাদী লোক, মিডিয়ার অ্যাটেনশন পাবার জন্যে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে ডিসি এসপি সবাই ক্ষেতে নেমে যাচ্ছেন কাস্তে-কোদাল হাতে, এই দৃশ্য তার কাছে বড়ই বেমানান লেগেছে। আর এসব নাটক থামানোর জন্যেই হয়তো তিনি এই সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেছেন।

রিক্সাচালকদের তবু গ্রামে গিয়ে ধান কাটার জায়গা আছে, আমাদের মতো বোকাসোকা জনগণের তো সেটাও নাই। কয়দিন আগেও কিছু একটা হইলেই সবাই মিলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ দিতাম। দেখেন পিএম, ভেজালবিরোধী অভিযান চালানোয় ম্যাজিস্ট্রেটকে বদলী করে দিয়েছে, বাসের ড্রাইভার স্কুলের ছাত্রকে পিষে দিয়েছে, অর্থমন্ত্রী প্রাইভেট ভার্সিটির ওপরে ভ্যাট বসিয়েছে, আপনি বিচার করেন!

পিএম ছিলেন আশা ভরসার কেন্দ্রস্থল, উনি বলতেন ভ্যাট বাতিল করো, বাতিল হলো। কোটা বাতিল করো, হলো। ম্যাজিস্ট্রেটের বদলি বাতিল করো, হয়ে গেল। নয়ন বন্ডকে ধরো, ধরা হইলো। এবার গ্যাসের দাম বাড়লো, আমরা আবার বললাম, পিএম, দেখেন! পিএম হেসে বললেন, কেনা দামে তাহলে গ্যাস বিক্রি শুরু করি? শুনে আমার মনে হলো, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হয়ে এটা তিনি কিভাবে বলতে পারেন? অবশ্য পরে ভাবলাম, উন্নয়ন চাইতে গেলে একটু স্যাক্রিফাইস তো করতেই হবে। যতো যাই হোক, আমি উন্নয়নের পক্ষে। উন্নয়ন এখন বিজয় সরণীর জ্যামে, ঢাকার ভ্যাপসা গরমে, গরুর মাংসের বাজারে, মেট্রোরেল প্রোজেক্টের দেয়ালঘেরা অবকাঠামোর ভেতরে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে, ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খুলে তাকে শুধু ভেতরে আনুন।

উন্নয়ন আসুক না আসুক, কানের পর্দা ভেদ করে রাজনীতিবিদদের পিওর কমেডিমাখা বক্তব্যগুলো ঠিকই কর্ণকুহরে ঢুকে যাচ্ছে। যার যা খুশি, যেভাবে খুশি বলছেই। মুখের সামনে মাইক পেলে কি বলবে না বলবে হুঁশজ্ঞান হারিয়ে ফেলে নিমিষেই। ঢাকাকে দেখতে প্যারিসের মতো লাগে, এটা তো পুরনো কাহিনী। কয়েকদিন আগে এক মন্ত্রী বললেন, বুড়িগঙ্গাকে নাকি দেখতে এখন টেমস নদীর মতো মনে হয়! এসব মন্তব্যের অবশ্য একটা ভালো দিক আছে। কার কান খারাপ, কার চোখে সমস্যা, কার মাথায় গণ্ডগোল- এসব সহজেই বের করে ফেলা যায়, ইসিজি/আল্ট্রাসনোগ্রাম করার দরকার পড়ে না। এমন মন্তব্য না করলে আমরা কি করে জানতাম যে মন্ত্রী মশায়ের চোখে ছানি পড়েছে?

ছানির কথায় মনে পড়লো, শরীয়তপুরের জাজিরায় ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত এক লোককে গ্রেফতারের আটদিন পরে জামিন দিয়েছে আদালত। অভিযুক্ত সেই পুরুষটি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের ছেলে। এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষন এবং ধর্ষণের পরে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছিল ওই লোকের বিরুদ্ধে, প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্ষিতা এবং তার পরিবার এখন ‘নিরাপত্তাহীনতায়’ দিন কাটাচ্ছে। এত কঠিণ কঠিণ শব্দ ব্যবহারের কি আছে বুঝলাম না। এটা বাংলাদেশ, এখানে প্রত্যেকটা দিনই নিরাপত্তাহীন। মেয়ে শিশুর জন্ম দিবা, আবার রিস্ক ফ্রি-ও থাকবা- এটা কিরকম কথা? জন্মের পরে গলা চেপে মেরে ফেলতে পারো নাই মিয়া? তাইলে তো কে ধর্ষণ করলো না করলো এসব নিয়ে অযথা টেনশন করা লাগতো না।

আর কেউ টেনশন না করলেও, মির্জা ফখরুল টেনশনে আছেন। সোনাগাজীর এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও অপহরণ মামলায় সাজা পাওয়া দুই ছাত্রদল নেতার পক্ষে বিবৃতি দেয়ার পরে তার দারুণ সমালোচনা হচ্ছে। খবর পড়ে জানলাম, সেই ধর্ষণের ঘটনায় পাঁচজনের সাজা হয়েছে, ছাত্রদলের দুইজন ছাড়া বাকী তিনজনই আওয়ামী ঘরানার রাজনীতি করতো। দুইজন ছাত্রলীগের, একজন ছিল যুবলীগের।

ক্লাস সেভেনে পড়া অবস্থায় ধর্ষণ করা হয়েছিল ওই ছাত্রীকে। ছাত্রলীগ নেতা প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হয়েছে, তারপর অপহরণ করে নিয়ে গেছে বান্দরবানে, রেখেছে ছাত্রদল নেতার খালার বাড়িতে। ভাইয়ের জন্যে আপন ভাইও তো এত ত্যাগ স্বীকার করে না! রাজনৈতিকভাবে যতোই বৈরীতা থাকুক, ধর্ষণের বেলায় তারা কিন্ত ভাই ভাই! সারাবছর লাঠি-রামদা নিয়ে একে অন্যকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া দিলেও, ধর্ষণ করার সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে তারা, এই না হলে ঐক্য! এখানে বলে রাখি, মূল যে আসামী, ছাত্রলীগ নেতা সাগর, সে কিন্ত গতবছর জামিনে বের হয়ে গেছে, পুলিশের খাতায় সে এখন পলাতক আসামী। ব্রাভো ম্যান! তোমরাই তো বাংলাদেশ, প্রাউড অফ ইউ!

আগে যখন দেশ নিয়ে লোকজন হতাশামাখা কথাবার্তা বলতো, গালিগালাজ করতো, দেশ ছাড়তে চাইতো, তখন ভাবতাম, এদের সমস্যা কি? পজিটিভ জিনিসপত্র কি এদের চোখে পড়ে না? লাস্ট এক-দেড় বছরে আমিও ওই দলে ভিড়ে গেছি। দেশের কোথাও পজিটিভ ভাইবই নাই, চোখে পড়বে কিভাবে?

আপনার পকেটের টাকা হাওয়া হয়ে যাবে, ফুলেফেঁপে উঠবে কোন এক ঋণখেলাপী বাটপারের সুইস ব্যাংকের একাউন্ট। আপনার ভাইকে কুপিয়ে মেরে ফেলা হবে, আপনার ছেলের রক্ত-মাংস মিশে যাবে পিচঢালা রাস্তায়, আপনার কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পরে মেরে ফেলবে কোন এক পিশাচ। আপনি অসহায় গলায় বলবেন, ধর্ষণ করলো ঠিক আছে, কিন্ত মেয়েটাকে মারলো কেন? পরদিন পত্রিকায় পড়বেন কোন এক ধর্ষকের জামিনের খবর। এদিকে দেশ চালানোর ভার যাদের ওপরে, তারা প্রতিদিন ফ্রি ফ্রি কমেডি শো দেখাবে আপনাকে, অথচ আপনার হাসি আসবে না, উল্টা নিজের প্রতি করুণা হবে। আপাতত সেই করুণাবোধ নিয়েই প্রতিটা মূহুর্ত বেঁচে থাকা…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button