ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

হাইকোর্ট পর্যন্ত যেদেশে বলতে বাধ্য হয়, আমাকে হাইকোর্ট দেখাবেন না…

প্রতি রমজানে টিভির নিচে স্ক্রল করলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে শিরোনাম দেখি। একেকদিন একেকজনকে তারা জরিমানা করেন। যেসব ব্র‍্যান্ডকে অনিয়মের জন্য জরিমানা করা হয় এগুলা আমাদের সবার খুব পরিচিত। কয়দিন আগে হাইকোর্ট থেকে বলা হয়, ৫২ পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে নিতে। এগুলো নিম্নমানের এবং ভেজাল।

আনন্দের ব্যাপার হলো, এই পণ্য সরিয়ে নেয়ার দায়িত্ব প্রাপ্ত সংস্থা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়নে হেলামি দেখায়। তাদের লোককে হাইকোর্ট পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়, “হাইকোর্টকে হাইকোর্ট দেখাবেন না।” শুধু তাই নয় হাইকোর্ট আরো বলেন সেদিন, “আপনাদের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অফিসে রাখার দরকার কী? বাসায় গিয়ে রান্নাবান্নার কাজ করেন। না হয় ব্যাংকে গিয়ে কেরানির চাকরি করেন- বসে বসে টাকা গুনবেন, টাকার হিসাব রাখবেন।”

সব বাদ। পানির কথাই বলি। ঢাকা ওয়াসার পানি নাকি এমন সুপেয়, সরাসরি এই পানি কলে চুম্মা দিয়ে খেলেও সমস্যা নাই। এক লোক সেই পানিতে করে শরবত বানিয়ে খাওয়াতে গেল ওয়াসার লোককে। তখন আর সে এই সুপেয় পানি খেতে চায় না।

ওয়াসা
Image source – jagonews24

হাইকোর্টে স্তানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন দেয়ার কথা ছিল ঢাকার কোন এলাকার ওয়াসার পানি সবচেয়ে “সুপেয়”। তারা দিতে পারেনি। এই মন্ত্রণালয় হাইকোর্ট গিয়ে নানান বাহানা করে। পানির শুদ্ধতা পরীক্ষা করতে কত খরচ হবে এগুলো নির্ধারণ করতে তারা সিদ্ধান্ত নিবে। এটা করতে তাদের সাত দিন সময় লাগবে। আদালত বলেন হাইকোর্টকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রশাসন। হাইকোর্ট আরো বলেন, “ওয়াসার পানির জোন ১১ টি। ২ বোতল পানি নিয়েই এটি পরীক্ষা করা যায়।”

আপনি বোতলের পানি খাবেন, সেখানেও ভেজাল। এবছরের শুরুতে একটা পরীক্ষায় পাওয়া গেছে বাজারে পাঁচটি ব্র‍্যান্ডের পানি নিম্নমানের, স্বাস্থ্যসম্মত না। একবার তো মাম পানির বোতলেও জীবানু পাওয়া গিয়েছিলো। আর এসব ব্র‍্যান্ডের নামে নকল পানির বোতল দিয়ে বাজার সয়লাব। দোকানে ফিল্টারের পানি খাবেন? এই পানিতে খোলা চোখেই দেখা যায় গ্লাস হাতে নিলে, ময়লা কেমন কিলবিল করে ভাসে।

আপনি শুধু শুনবেন, দেখবেন, এবং হজম করে নিতে হবে। আজকে আড়ং নিয়ে প্রথম কাবজাব? এটা আজকের নতুন না। ২০১৭ সালেও একই কাহিনী আড়ং করে ফেসবুকে হালকা ভাইরাল হয়েছিল। ১৫ রোজায় যে পোশাক ছিল ২৩৬০ টাকা, ২৫ রোজায় গিয়ে তারা লেবেল বদলে ফেলে সেটাকে বানিয়েছে ৪ হাজার ২৫২ টাকা। ৩২০০ টাকার জামা রোজার শেষ দিকে বানিয়ে দেয় ৫১০০ টাকা। এটা আড়ংয়ের নিয়মিত ইতিহাস।

আড়ং চাইলেই এটা করতে পারে। কোনো আইন নেই, বিলাসী দ্রব্যের দাম নির্ধারণ কেমন হবে এটা তাদের ব্যাপার এসব যুক্তি দিয়ে আড়ংকে সমর্থন করছে অনেকে। এই যুক্তিটাই আমার ইহকালে কোনোদিন ভাল লাগেনি। চাইলে সরকার যা ইচ্ছা করতে পারে, চাইলে বিরোধী দল যা ইচ্ছা করতে পারে, চাইলে এরশাদও যা ইচ্ছে করতে পারে, চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিও যা ইচ্ছে করতে পারে ইন দ্যা নেম অফ জনগণের স্বার্থ, ইন দ্যা নেম অফ আইনে আছে, আইনে তো নেই টাইপ লজিক! দিস ইজ সো ইনসেইন!

আড়ং একটা উদাহরণ মাত্র, মিডিয়া ট্রায়ালে পড়ে পাবলিক সেন্টিমেন্টের মাঝখানে আটকে পড়ে ওদের উপর দিয়ে কয়দিন ঝড় যাবে। এসব কিছু ঠিকও হয়ে যাবে। বাংলাদেশে বিপ্লব যত তড়িঘড়ি করে নামে, সমাধানও তত স্বস্তা হয়। ওই লোকের বদলির পেছনে কারণ কি, কারা মূল চরিত্র, কেন বদলি করা হলো, এর পেছনে আড়ং ছাড়াও কোন কোন ব্র‍্যান্ড থাকতে পারে নাকি কিছুই নেই সবটাই কাকতালীয় ঘটনা এসব জানার অধিকারটাই নাগরিক অধিকার।

কিন্তু, আমরা নাগরিক ড্রামা পছন্দ করি, আমাদের সবসময় একজন ভিলেন লাগে, একজন হিরো লাগে। আমাদের প্রতিদিন নতুন স্টোরি লাইন লাগে। এজন্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ইস্যুতে তিন দিনে তিন রকম বাতাস দেখি। আমরা যে সব কিছুতে সহজেই বিভক্ত হই এবং খুব দ্রুত ভুলে যাই এই চরিত্রের কথা এখন তারা জানেন। তারা মানে যারা আমাদের চালান, আমাদের রুচি ঠিক করে দেন, কর্তব্য ঠিক করেন, অভ্যাস ঠিক করে দেন এমনকি আমরা কি নিয়ে আন্দোলন করব, কতটুকু করব সেটাও ঠিক করে দেন। এই ‘তারা’দের সাথে পারা সহজ না। যেখানে হাইকোর্টকে বলতে হয়, আমাকে হাইকোর্ট দেখাবেন না, সেখানে আমি আমজনতা কোন হিন্দিচুল?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button