অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

মানুষগুলোর একটাই অপরাধ ছিল, ওরা মুসলিম!

সাল ১৯৮৭। উত্তরপ্রদেশের মিরাটের মফস্বলমতো একটা জায়গা, নাম হাশিমপুরা। এলাকাটায় মুসলমানদের সংখ্যাই বেশি, দুয়েক ঘর নীচুজাতের হিন্দুও থাকেন এখানে। হানিফের বাসাটা রাস্তায় পাশেই, মহল্লার এঁদো গলির ময়লা আবর্জনা ঠেলে ঘরে ঢুকতে হয় তাদের। সারাদিনমান এখানে চিৎকার চেঁচামেচি লেগেই থাকে। মশলামাখা কাবানের সুগন্ধ ভেসে আসতে থাকে সন্ধ্যার পরে। তবে রোজ রোজ মাংসের স্বাদ চেখে দেখার মতো অবস্থা নেই কারোই। এলাকার লোকজন বেশিরভাগই খেটে খাওয়া মানুষ, নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। হানিফ নিজে কাজ করেন একটা গার্মেন্টসে। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পরে ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা-ন’টা বেজেই যায়। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসতে শুরু করে, তবে হই-হট্টগোলে ঘুমানোও যায় না। এলাকা নিরিবিলি হতে হতে বেজে যায় এগারোটা, আর রাত বারোটা নাগাদ মোটামুটি শুনশান হয়ে আসে চারপাশ। রাস্তার কয়েকটা কুকুর ছাড়া আর কারোই দেখা মেলে না তখন।

তবে সেই রাতে ব্যাতিক্রম কিছুই ঘটেছিল। মধ্যরাতে দরজায় জোরে ধাক্কা মারলো কেউ, বাইরে থেকে বলা হলো দরজা খুলতে, নইলে ভেঙে ফেলা হবে। আশেপাশের বাড়িগুলো থেকে চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ ভেসে আসছে তখন, দূরে শোনা যাচ্ছে মহিলাদের কান্না। হানিফের ঘরেও মহিলা আছে, মা আছে, দুটো ছোট বোন আছে, আছে স্ত্রী আর সন্তানেরাও। হানিফ পরিচয় জানতে চাইলো আগন্তকদের, জবাবে বলা হলো, পুলিশ এসেছে। ভয়ে ভয়েই দরজা খুললো হানিফ। 

ঘর থেকে বের হবার সাথে সাথেই তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিলো দুজন মিলে। ঘটনা কি ঘটছে কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না হানিফ। টেনে হিঁচড়ে তাকে রাস্তায় নিয়ে আসা হয়েছে তখন, তার ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রাস্তায় এসে হানিফ দেখলো, অন্যান্য বাড়িগুলো থেকেও তরুণ আর মধ্যবয়স্ক যুবকদের ধরে নিয়ে আসা হচ্ছে। সবাইকে বলা হলো হাত উপর করে দাঁড়াতে, সেইসঙ্গে অশ্রাব্য গালিগালাজ তো ছিলই। সেসব গালির বেশিরভাগই ছিল ধর্মকে কেন্দ্র করে।

মোটামুটি ষাট-সত্তরজনকে একসঙ্গে দাঁড় করানো হলো। তারপর সবাইকে গরুর মতো দড়ি দিয়ে বেঁধে তোলা হলো হলুদ রঙের একটা ট্রাকে। পুলিশদের পোষাকটা অপরিচিত লাগছিল সবার কাছেই, এমন পুলিশ কেউ দেখেনি আগে। ওরা জানতো না, বিশেষায়িত এই বাহিনীর নাম ছিল প্রভিশনাল আর্মড কনস্টেবল বা প্যাক। দাঙ্গা বা জরুরী অবস্থা মোকাবেলার জন্যে প্রস্তুত রাখা হয় এদের। এই ষাট সত্তরজনের মধ্যে অন্তত পঞ্চাশজন জানতো না, কালো উর্দি পরা এই লোকগুলো আসলে যমদূতের বেশ ধরেই এসেছে ওদের সামনে।

ওদের মধ্যে কয়েকজনকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হলো সিভিল লাইনস পুলিশ স্টেশনে। জামাকাপড় খুলে দড়িতে বেঁধে ইচ্ছেমতো পেটানো হলো সবাইকে, যতোক্ষণ না কেউ অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়লো, ততক্ষণ মার চলছিল একটানা। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হলো কয়েকজনকে। অজ্ঞাতনামা হিসেবেও কিছু নাম এন্ট্রি করা হলো থানার এফআইআর রেজিস্টারে। টানা কয়েক ঘন্টা চললো অবর্ণনীয় নির্যাতন, এত মার খেয়েও যারা টিকে ছিল, এদের ওপর ক্ষেপে উঠলো প্ল্যাটুন কমান্ডার সুরিন্দর পাল সিং। অধঃস্তন সৈনিকদের সে আদেশ দিল, সবাইকে বেঁধে আবার জিপে তুলতে। সেই মোতাবেক নির্দেশ পালন করা হলো সঙ্গে সঙ্গে। রাতের অন্ধকার চিরে চলতে শুরু করলো জিপ।

গ্রেফতার করা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ত্রিশজনকে থানায় নেয়াই হয়নি, হলুদ রঙের সেই ট্রাকে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মুরাদনগর নামের একটা জায়গায় এক খালের পাড়ে। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময় তখন, মে মাস। বৃষ্টি হচ্ছে হুটহাট, খালে স্রোতও আছে মোটামুটি। হাত পিছমোড়া করে বেঁধে বিশ-পঁচিশজনকে ট্রাক থেকে নামিয়ে দাঁড় করানো হলো খালপাড়ে। হেডলাইট নিভিয়ে দেয়া হলো গাড়ির, তারপর একটানা কয়েক সেকেন্ড শুধু গুলির শব্দই শোনা গেল সেখানে। রাইফেল থেকে ছুটে বেরুলো আগুনের ফুলকি, গোড়াকাটা কলা গাছের মতো পানিতে পড়লো অনেকগুলো দেহ, শরীর থেকে ঝরে পড়লো তাজা রক্ত।

থানা থেকে নির্যাতনের পরে যাদের জিপে তোলা হয়েছিল, তাদেরও নিয়ে আসা হয়েছিল সেখানে। কিন্ত রাস্তার পাশে দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ির হেডলাইটের আলোয় অসুবিধা হচ্ছিল প্রভিশনাল আর্মির কনস্টেবলদের। তাই ঝুঁকি না নিয়ে কয়েকজনকে আবার তোলা হলো ট্রাকে। প্রায় অর্ধেক খতম হয়ে গেছে ততক্ষণে। জীবিতদের নিয়ে আসা হলো হিন্দোল নামের এক নদীর পাড়ে। এখানে এনে দাঁড় করিয়ে তাদের ওপর গুলি চালানো হলো খুব কাছ থেকে, যেন কেউ শখ করে গুলতি দিয়ে আম পাড়ার মিশনে নেমেছে। বুলেটের ধাক্কায় নদীর পানিতে গিয়ে পড়লো দেহগুলো। মরে যাওয়ার আগে তারা জানতেও পারলো না, কি তাদের অপরাধ! সেই কালো রাতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিল ৪২ জন, আর এদের সবাই ছিল মুসলমান।

নৃশংস এই ঘটনাটা ঘটেছিল আজ থেকে একত্রিশ বছর আগে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছিল তখন উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন স্থানে, মিরাটের কয়েক জায়গাতেও সহিংসতা হয়েছিল। ১৯৮৭ সালের মে মাসের ১৯ তারিখে দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছিল দশজন, এদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সকে মাঠে নামায় উত্তরপ্রদেশের প্রাদেশিক সরকার, কাজে নামে প্রভিশনাল ফোর্সের সদস্যরা।

সেই দলেরই একটা পুরো কোম্পানীর ইনচার্জ ছিল সুরিন্দর পাল সিং নামের এক ধর্মান্ধ অফিসার। মুসলমান মানেই তার চোখে ছিল দাঙ্গাবাজ, জঙ্গী। তার নীতি ছিল মুসলিম দেখলেই মারো। আর তাই জরুরী অবস্থার সুযোগ নিয়ে রাতের আঁধারে মুসলমান পাড়ায় হানা দিয়ে ৪২ জন তরুণকে ধরে কোন তদন্ত, কোন বিচার ছাড়াই নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো তাদের! এদের কেউ আদৌ দাঙ্গার সাথে জড়িত ছিল কিনা, সহিংসতায় কারো ভূমিকা ছিল কিনা, এসবের তোয়াক্কাই করা হয়নি। এই মানুষগুলোর একটা অপরাধ ছিল, ওরা মুসলিম! আর তাই জীবন দিয়ে সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে তাদের! ইতিহাস এই ঘটনাটার নাম দিয়েছে হাশিমপুরা ম্যাসাকার।

সেই কালরাতে হানিফসহ আরও চারজন বেঁচে গিয়েছিল গুলির মুখে পড়েও। মামলা করতে পুলিশের কাছে গিয়েছিল তারা, মামলা নেয়া হয়নি। এমনকি ওদের প্রাণের ওপরও হুমকি এসেছিল। ঘটনার এক বছরেরও বেশি সময় পরে মিডিয়ার চাপে সরকার বাধ্য হয় সিবিআইকে ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দিতে। সেই তদন্তেই বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল, জানা যায় এই নিরপরাধ মানুষগুলোকে খুন করা হয়েছিল অযথাই, শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক আক্রোশ থেকে। অভিযোগ দাখিল করা হয় প্রভিশনাল আর্মড কনস্টেবলদের ষোলজনের বিরুদ্ধে।

এই বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধা দেয়ারও কত চেষ্টা করা হয়েছে কতবার! বারবার তারিখ পেছানো হয়েছে, ঘটনায় দায়ী অনেকে তো মরেই গিয়েছেন। সেদিন যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের স্বজনেরাও একে একে পৃথিবী ছেড়েছেন, বিচার আর পাননি। নিম্ন আদালত তো এই বিচারকে প্রহসনই বানিয়ে দিয়েছিল, রায় দিয়েছিল পুলিশের পক্ষে, অভিযুক্ত ষোলজনের সবাইকে খালাস দেয়া হয়েছিল। তবে শেষমেশ, জাস্টিস ডিলেড, জাস্টিস ডান। বিচার হয়েছে, উচ্চ আদালত সেই ষোল পুলিশ সদস্যের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দিয়েছেন আজ। অপেক্ষার অবসান হয়েছে অকালে নিহত হওয়া মানুষগুলোর স্বজনদের। কে জানে, এই রায়ে তাদের আত্মা শান্তি পাবে কিনা! 

আরও পড়ুন-

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button