অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

হাসিনা পার্কার- গল্পটা মুম্বাইয়ের ‘গডমাদার’ এর!

বিশ্বজুড়েই সন্ত্রাসের চাষবাষ আছে, সেটা এশিয়া-আফ্রিকা কিংবা ইওরোপ থেকে ল্যাটিন আমেরিকা- যে অঞ্চলই হোক না কেন। অপরাধ জগতগুলো নিয়ন্ত্রণ করে মাফিয়ারা, নিজেদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়দের গালভরা নামেও ডাকে তারা- গডফাদার! ভারতেও অপরাধীদের এমন একটা আলাদা জগত আছে, সেই অন্ধকার সাম্রাজ্যটা মূলত মুম্বাইকেন্দ্রীক। সেই জগতে অনেক গডফাদার এসেছে, অমুক তমুক ভাইয়েরা অপরাধে ঘেরা দুনিয়াটা নিয়ন্ত্রণ করেছেন দোর্দণ্ড প্রতাপে। তবে মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড গডমাদার দেখেছিল একবারই, সবার কাছে তার পরিচয় ছিল আপা। তার নামটা মুখস্ত থাক না থাক, আপা শব্দটাই ভয়ের একটা শিরশিরে অনুভূতির জন্ম দিতো মুম্বাইবাসীর মনে। নাম তার হাসিনা পারকার, মুম্বাই পুলিশের হেড কনস্টেবল ইব্রাহিম কসকারের মেয়ে তিনি, তবে তার পরিচয়- তিনি দাউদ ইব্রাহিমের বোন। এরচেয়ে বেশীকিছু তার নামে বলার দরকার পড়তো না। 

ইব্রাহিম কসকারের দশ ছেলেমেয়ের মধ্যে সপ্তম ছিলেন হাসিনা, বয়সে তিনি দাউদের ছোট। বড় দুইভাই শাবির আর দাউদ মিলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন তৎকালীন বোম্বেতে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ পেতেও ওদের সময় লাগেনি খুব বেশী। তবে তাদের সেই জগতে বোনেদের কোন জায়গা ছিল না। চার বোনের সবাই বিয়েথা করে সংসারী, হাসিনারও সুন্দর একটা পরিবার ছিল, হাসিখুশিতে ভরা একটা সংসার ছিল। অন্ধকার দুনিয়াটার সঙ্গে ভাইদের সংযোগ ছিল, কিন্ত তিনি ছিলেন সেসবের সংস্পর্শ থেকে অনেক দূরে, একেবারেই আটপৌরে গৃহিনী। স্বামী ইসমাইল প্রথম জীবনে ফিল্মে জুনিয়র আর্টিস্টের কাজ করতেন, পরে হোটেলের ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার জন্যে এই টাকা সম্ভবত দাউদই তাকে দিয়েছিলেন।

ডি-কোম্পানী গ্যাং নিয়ে দাউদ তখন বোম্বের আন্ডারগ্রাউন্ডের একচ্ছত্র অধিপতি। তবে বোম্বে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে ধরা পড়ার ভয় এড়াতে দুবাই পাড়ি জমিয়েছিলেন দাউদ। বোম্বের আন্ডারগ্রাউন্ডে তার আধিপত্যও খানিকটা হুমকীর মুখে পড়েছিল। এই সময়ে অনেক নতুন নতুন গ্যাংস্টার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে লাগলো, পুরনো যারা এতদিন দাউদের ত্রাসের মুখে এদিকে সেদিকে পালিয়ে গিয়েছিল, তারাও ফিরে আসতে শুরু করলো। তাদের সঙ্গে হরহামেশাই টক্কর লাগতো দাউদের দলের লোকেদের। এদেরই একজন অরুণ গোগলে। তাকে আর তার দলকে মোটামুটি পথে বসিয়ে দিয়েছিল দাউদের লোকেরা। বোম্বের আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই মানুষগুলো নিকৃষ্ট সব কাজ করে বেড়ালেও তাদের একটা নীতি ছিল- সব শত্রুতা নিজেদের মধ্যে, পরিবারকে এর ভেতরে জড়ানো যাবে না। এমনকি বোম্বের পুলিশও এসব অপরাধীর পরিবারকে ঘাঁটানোর সাহস পেতো না। কিন্ত অরুণ এই নিয়মটা ভঙ্গ করলো, প্রতিশোধ নিতে সে খুন করলো দাউদের বোন হাসিনার স্বামী ইসমাইলকে। এটা ১৯৯১ সালের ঘটনা।

এই খুনের বদলা নেয়ার জন্যে নির্দেশ দিলো দাউদ, ছোটা শাকিলের নেতৃত্বে বোম্বেতে থাকা দাউদের লোকেরা পিঁপড়ের মতো পিষে ফেললো অরুণের গ্যাঙের সদস্যদের। নাম ধরে খুঁজে বের করে করে খুন করা হলো ওদের, ইসমাইলের খুনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকুক কিংবা না থাকুক, অরুণের লোক হওয়াটাই ছিল এদের অপরাধ। ভাড়াটে শুটার নিয়ে এলো রাজন, প্রথমবারের মতো শুটআউটে ব্যবহার করা হলো একে-৪৭ রাইফেল। বোম্বের বুকে শুরু হলো আরেকটি গ্যাংওয়ার, একচেটিয়া এই যুদ্ধে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল অরুণ আর তার দল। সাধারণত বোম্বের গ্যাংস্টারেরা কখনও পুলিশের ওপর হামলা করতো না। কিন্ত এই গ্যাংওয়ার এতোই ভয়াবহ আকার নিয়েছিল, দুই পুলিশ কনস্টেবল আর এক অফিসার নিহত হয়েছিল এক শুটআউটের মাঝে পড়ে গিয়ে। এই প্রতিশোধ মিশনের প্রতিদিনের খবর নিয়মিত পৌঁছে যেত হাসিনার কাছে। মূলত তখন থেকেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোকজনের সঙ্গে তার পরিচয়। তবে নিজেই এই জগতের সম্রাজ্ঞী হয়ে বসবেন, এমনটা ভাবা যায়নি তখনও।

সালটা ১৯৯৩, বোম্বে কেঁপে উঠলো ভয়াবহ বোমা হামলায়। নিহত হলো আড়াইশোর বেশী মানুষ, আহত প্রায় দেড় হাজার। গুজরাট দাঙ্গার প্রতিশোধ নিতে এই হামলা করিয়েছিল দাউদ ইব্রাহিম, পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এলো সেই তথ্য। সাদাসিধে এক নারীর জীবন পাল্টে গেল সেখান থেকেই। ‘দাউদের বোন’ পরিচয়টা কাল হয়ে দাঁড়ালো তার জন্যে, পুলিশের একটানা নজরদারী আর পুলিশি হেফাজতে নিয়ে হেনস্তায় জীবন অতীষ্ট হয়ে উঠলো তার। হাসিনার অপরাধ একটাই, যে দাউদ ভারতের বুকে আগুণ জ্বেলেছে, কেড়ে নিয়েছে এতগুলো প্রাণ, সেই দাউদ ইব্রাহিমের আপন বোন সে। দিনের পর দিন থানায় হাজিরা দিতে হতো, ইনভেস্টিগেশনে হাজারটা প্রশ্ন, বাড়ীতে সন্তানরা কি করছে, কি খাচ্ছে সেসব ভুলে হাসিনাকে দিতে হতো অফিসারদের প্রশ্নের জবাব। হাসিনা বুঝতে পারলো, এমন নমনীয় হয়ে আর যেই থাকুক, দাউদ ইব্রাহিমের বোনের নমনীয় হওয়াটা মানায় না। আর তাই ভাইয়ের ফেলে যাওয়া সাম্রাজ্য সামলানোর কাজটা নিজের হাতে তুলে নিলো সে, মুম্বাইতে অনেক ভাইয়ের পর আগমন ঘটলো এক ‘আপা’র।

দাউদ ভারত ছাড়ার পরে তার বেনামী সম্পত্তি চলে এসেছিল হাসিনার নামে। কিন্ত স্বামীর শোক আর সন্তানদের সামলানোর চাপে এতদিন সেগুলোর কথা ভাবার সময় পায়নি হাসিনা। এরমধ্যে একবার দাউদের নাম খাটিয়ে এক বহুতল ভবনে একটা ফ্ল্যাটের দখল নিয়েছিল, মাস্তানী বলতে এতটুকুই সম্বল। সেটাও নিজেকে করতে হয়নি, দাউদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে চ্যালা-চামুণ্ডারাই করে দিয়েছিল। এবার হাসিনা নিজের হাতে তুলে নিলেন ড্রাইভিং হুইল, মুম্বাইতে দাউদের যতো অবৈধ ধান্দা, সেসবের নিয়ন্ত্রণ বুঝে নিতে লাগলেন। মুম্বাইতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দাউদের গ্যাঙের সদস্যরা এসে শামিল হলো আপা’র দলে। চার বোনকেই প্রতি বছর কোটি টাকা করে দিতো দাউদ, তাদের প্রাচ্যুর্য্যের অভাব ছিল না। তবে হাসিনা বিশ্বাস করতেন নিজের ক্ষমতায়, আর সুযোগ পেয়ে সেটা হাতছাড়া করতে চাইলেন না তিনি।

আগে দাউদ যা করতো, এবার পায়ের ওপর পা তুলে গদিওয়ালা সোফায় বসে সেই কাজই করতে থাকলো হাসিনা। ড্রাগ সাপ্লাই থেকে শুরু করে চোরাই স্বর্নের চালান, নকল ঔষধ মুম্বাই বন্দর দিয়ে ভারতে ঢোকানো কিংবা জোর করে কাউকে তার জায়গা থেকে উচ্ছেদ করে সেই জায়গায় টাকার বিনিময়ে কোন পার্টিকে সবকিছুই করতে থাকলো হাসিনার হয়ে কাজ করতে আসা দাউদের লোকেরা। মুম্বাই তখন মেগাসিটির রূপ নিচ্ছে, আবাসন ব্যবসা খুব জমজমাট। নতুন একেকটা অ্যাপার্টমেন্ট বানাতে গেলেই লাগতো আপা’র অনুমতি, নির্দিষ্ট সংখ্যক ফ্ল্যাট কিংবা বড়সড় অঙ্কের টাকার বিনিময়েই নির্ঝঞ্ঝাট ব্যবসার অনুমতি মিলতো রিয়াল এস্টেট ব্যবসায়ীদের। ‘প্রোডাকশন মানি’ নাম ছিল এই চাঁদার। দক্ষিণ মুম্বাই থেকে বান্দ্রা কিংবা জুহু থেকে কোলাবা- হাসিনার রাজত্ব ছিল বিশাল এলাকা জুড়ে। নতুন করে মাথাচাড়া দিতে চাওয়া গ্যাংস্টারদের অনেকেই হারিয়ে গিয়েছিল আপ’র আঙুলের ইশারায়।

৮৮টা মামলা ছিল তার নামে, কিন্ত পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করতে পেরেছে মাত্র একবার! বোম্বে পুলিশের প্রতিটা বিভাগে তার লোক ছিল, টাকার বিনিময়ে এদের কিনে নিতো হাসিনা। হাসিনার বিপক্ষে চার্জশীট দাখিল করা হলে সেটার কাগজপত্র হারিয়ে যেতো, নির্দিষ্ট দিনে হাজির হতে পারতেন না তদন্তকারী কর্মকর্তা! সবই কালো টাকার খেল। ২০০৫ সালে মুম্বাই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চে এক তদন্তের কাজে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্যে হাজির হবার নির্দেশ দেয় হাসিনা পার্কারকে, সেখানে তার পাসপোর্ট হারিয়ে যায়। হাসিনা অভিযোগ করেন, ক্রাইম ব্রাঞ্চের লোকজনই তার পাসপোর্ট চুরি করিয়েছে। পরে নতুন পাসপোর্টের জন্যে আবেদন করলেও তাকে সেটা দেয়া হয়নি, অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত থাকা এবং দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে। ফলে চিকিৎসার জন্যেও কখনও ভারত ছাড়তে পারেননি হাসিনা।

২০০৬ সালে হাসিনার বড় ছেলে দানিশ এক রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। তবে এটাও পরিকল্পিত খুন বলেই অনেকে মনে করেন। দানিশ ছিল ভাগ্নেদের মধ্যে দাউদের সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে কাছের। হয়তো মায়ের পরে সে’ই হতো মুম্বাইয়ের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণকারী। স্বামীকে হারিয়েছিলেন অনেক আগে, সন্তানের মৃত্যুর পর খানিকটা ভেঙেই পড়েছিলেন হাসিনা। তবে এরমধ্যেও দুই নম্বরী কারবার একেবারে বন্ধ করেননি, যদিও এই জগতটা থেকে মনোযোগ অনেকটাই সরে গিয়েছিল তার। পরের বছরগুলোতে হাসিনা পারকারকে খুব বড় কোন ঘটনায় জড়িত থাকতে শোনা যায়নি, দাপটও কমে গিয়েছিল তার, নিজেই সরে গিয়েছিলেন পর্দার আড়ালে। তবে দল ছিল, তার নামের চলতো আন্ডারওর্ল্ডের কার্যক্রম। ভারত থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বড় অঙ্কের টাকা পাচার করতে কিংবা সেখান থেকে টাকা ভারতে আনতেও কমিশন দেয়া লাগতো হাসিনা ও তার দলকে।

অনেকগুলো বছর মুম্বাইয়ের অপরাধজগত নিয়ন্ত্রণ করেছেন তিনি, কোন মহিলা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাজ্ঞী হয়ে বসে আছেন, এমনটা ভাবাও একটা সময়ে অতি কল্পনা ছিল। কিন্ত হাসিনা সেটাকে বাস্তবে পরিণত করেছেন। ভাইয়ের অবৈধ আর দেশবিরোধী কাজের কারণে যে কলঙ্কের দাগ লেগে গিয়েছিল কপালে, সেটা মুছে ফেলার কোন উপায় জানা ছিল না এককালের সাদাসিধে এই গৃহিনীর, আর তাই লোকের মনে জেগে থাকা দাউদের ব্যপারে ভয়টাকেই কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি। হাসিনা অন্ধকার জগতের রাণী ছিলেন, অনেক মানুষের রক্ত লেগে আছে তার হাতে, হাজারো অবৈধ কাজের সঙ্গে ছিল তার বসবাস; তবে সবকিছু ছাপিয়ে চিত্রনাট্যের শুরুতে হাসিনার একটা গল্প ছিল, বড্ড সাদাসিধে সেই গল্পটার মোড় পরিবর্তনের জন্যে তিনি একা দায়ী নন, দায়ী সমাজ, রাষ্ট, সিস্টেম- সবকিছুই।

হাসিনা পার্কার, দাউদ ইব্রাহিম, মুম্বাই, শ্রদ্ধা কাপুর

২০১৪ সালের জুলাই মাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মুম্বাইতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হাসিনা, শেষ হয় মুম্বাইয়ের আপা’র উপাখ্যান। মানুষের জীবন অদ্ভুত, হাসিনার জীবনটা একটু বেশীই অদ্ভুত। নারী হয়ে পুরুষশাসিত অন্ধকার দুনিয়াটায় রাজত্ব করাটাও তো কম অদ্ভুত ঘটনা নয়! সবকিছু মিলিয়ে তার জীবনটা যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। আর এবার হাসিনা পারকারের জীবনী নিয়ে বলিউডে নির্মিত হয়েছে সিনেমা, নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন শ্রদ্ধা কাপুর। পরিচালনায় ছিলেন অপূর্ব লাখিয়া। তবে সিনেমায় ‘গডমাদার অব নাগপাড়া’কে ঠিকঠাকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেননি শ্রদ্ধা, এমনটাই মত দিয়েছেন সমালোচকেরা।

তথ্যসূত্র- http://www.freepressjournal.in/mumbai/haseena-parkar-shocking-facts-about-the-queen-of-mumbai/1104927 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button