সিনেমা হলের গলি

নব্বুই দশকের হাসান ফিরে এসেছেন আবার!

আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, হাসান সহ সময়ের সেরা শিল্পীদেরকে তখন পাওয়া গিয়েছিল একসাথে। সালটা ১৯৯৮। আজকের দিনে এরকম কম্বিনেশন হয়ত কল্পনারও অতীত। কিন্তু, সময়টা ছিল নব্বুই দশক। বাংলা ব্যান্ডের জয়োৎসবের জোয়ার। সেই জোয়ারের সামনের সারির মানুষগুলোর গান একটা এলবামে পাওয়া যাবে, এমনটা বারংবার ঘটে না। তখন ঘটেছিল। সেই ১৯৯৮ সালে “শুধু তোমারই কারনে” নামের একটা এলবাম প্রকাশিত হয়েছিল প্রাইম অডিও’র ব্যানারে। সেই এলবামেরই একটা গান আজ এতবছর বাদে নতুন করে শুনেছি দেখেই এত কথা উঠলো। বলছি, আমাদের ব্যান্ড সঙ্গীতের রাজপুত্র হাসানের কথা, যার একটা গান সেই এলবামে প্রকাশের পর তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল সবখানে। গানটার টাইটেল ছিল “আমার আল্লাহ নবীজির নাম..”।

শুধু তোমার কারনে এলবাম

গানটার সহজ কথা, সুরের ছন্দ এত উদ্বেল করেছিল মানুষকে যে, সেই সময় পথেঘাটে যেখানেই গান চলতো, আপনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কান পাতলে এই গানটাও শুনতে পাবেন এমনটা ধারণা করাই যায়। সময়টাই এমন ছিল, হাসানময়। এই হাসানের মতো একজন ভোকাল বাংলাদেশ পেয়েছে এবং আমাদের অনেকে হাসানকে ছোটবেলায় শুনতে শুনতে বড় হয়েছি ভাবতেই নিজেদের বেশ ভাগ্যবান মনে হয়। আইয়ুব বাচ্চু, জেমসের গানের সাথে পাল্লা দিয়ে চলত হাসানের গান। কি মধুর এক প্রতিযোগিতা ছিল তখন, শ্রোতাদের জন্য কতটা স্বর্ণালী সময়! নাইনটিজের শেষের দিকে হাসান ছিলেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া শিল্পী!

অথচ, মানুষটা গানের তালিম নেননি কোথাও তবুও তাকে বলা হয় তিনিই নাকি বাংলাদেশের সেই বিরল ভোকালিস্ট যিনি ছয়টা স্কেলে গান গাইতে পারতেন। তার গান আশ্চর্যজনকভাবে কলকাতায়ও ভীষণ জনপ্রিয় হয়৷ কলকাতার তরুণ অনেক গানের দল হাসানের গান কাভার করেছে কত শোতে তার কোনো হিসাব নেই। হাসানের ‘অভিমান নয়, কিছুটা অভিযোগ নিয়ে…’ গানটা কলকাতায় অনেক চলেছে সেইসময়। এমন উন্মাদনা একজন বাংলাদেশি শিল্পীকে নিয়ে হবে, সেটা কে ভেবেছে কবে।

হাসান

সেই হাসান একসময় হারিয়ে গেলেন। নব্বুই দশকের আমেজটাও যেমন আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে নিরবে। আমরা শুধু দীর্ঘশ্বাস নিয়ে স্মৃতিচারণ করে গেছি দিনগুলো নিয়ে। বাংলা গানের লাইনে একটা অস্থিরতা আসলো। ক্যাসেট, সিডি যুগের পর কপিরাইট ইস্যু, শিল্পীদের সম্মানি সব মিলিয়ে একটা জটিলতা তৈরি হলো চারদিকে। অনেক লিজেন্ডারি শিল্পীরা গান কমিয়ে দিলেন। নতুন সৃষ্টি কমে যেতে শুরু করলো। আরো অনেকের মতো হাসানও যেন উধাও হয়ে গেলেন। কোথাও নেই তিনি, না বিটিভি, না মিডিয়ায়, না পত্রিকায়।

এক যুগের অনুপস্থিতি ঝেড়ে ফেলে কিছুদিন ধরে হাসানকে মাঝে মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। গান করছেন আবার কোথাও কোথাও। সব ছাপিয়ে গেছে, গান বাংলা চ্যানেলে ‘উইন্ড অব চেঞ্জ’ প্রোগ্রামে যখন আসলেন তিনি। উইন্ড অব চেঞ্জ ইতিমধ্যেই বড় পরিসরে, বড় আয়োজন করে সংগীতায়োজনের জন্য আলোচিত। বিদেশ থেকে যন্ত্রবাদকরা আসেন, বিচিত্র ইন্সট্রুমেন্ট, সাউন্ড সব মিলিয়ে এখানে গানের পরিবেশ যেকোনো শিল্পীকে মুগ্ধ করবে। উইন্ড অব চেঞ্জের এই আসরে হাসানকে আমন্ত্রণ করা হলো। তিনি গাইলেন দুইটা গান।

Hasan | Wind Of Change

ইউটিউবে রিলিজ হওয়ার ঘন্টাখানেকের মধ্যে প্রথম প্রকাশিত গানটা শুনি এবং দেখি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিলাম ৫ মিনিট ২৯ সেকেন্ড। দেখে ভাবছিলাম, হাসান কি করছেন আসলে! তিনি জানেনও না, এমন অতি মাত্রায় সুন্দর পারফর্মেন্স তিনি দিয়েছেন যে, মনে হচ্ছিলো ঠিক ফর্মের চূড়ায় থাকায় শৈশবের হাসানকে শুনতে পাচ্ছি। এবং গানটা সেই গান, যে গানটা ১৯৯৮ সালের ওই এলবামে প্রকাশিত হয়েছিল আর প্রতিটি কোনে কোনে ছড়িয়ে পড়েছিলো – “আমার আল্লাহ-নবীজির নাম”। সেই সহজ কথা, সেই অসাধারণ সুর-ছন্দ, সেই কন্ঠ…

….আশে-পাশের ময়-মুরুব্বি
যে আছেন যেথায়
সত্যি কথা হায়
এই অন্ধ কালায় কয়

জগৎ নামের ইস্টিশনে
কারো থাকন নাই
কারো থাকন নাই
এই ইস্টিশনে ভাই

একবার আইসা থাইকা যাইবা
এমন হবার নয়
সবার যাইতে হয়
এক নতুন ঠিকানায়

হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান
কারো নিস্তার নাই
কারো নিস্তার নাই
না হইলে মুমিন ভাই
আমার আল্লাহ নবীজির নাম
আমার আল্লাহ নবীজির নাম…….

যখন ‘আমার আল্লাহ নবীজির নাম’ বলে সবাই একসাথে গেয়ে উঠে হাসানের সাথে এবং হাসান গলার রেঞ্জ ব্যবহার করে সুরে একটু টান দেন, ভয়ংকর সুন্দর মুহুর্ত তৈরি হয়। হাসানের এই পারফর্মেন্স উইন্ড অব চেঞ্জের সব সিজন মিলিয়েই সেরা প্রাপ্তির তালিকায় থাকবে নিশ্চিত। হাসান কি ছিলেন, কে ছিলেন সেটাই যেন আরেকবার শ্রোতাভক্তরা উপলব্ধি করবে এমন পারফর্মেন্স দেখে। সাথে বিশ্বমানের মিউজিশিয়ানরা যখন যুক্ত হয়, তখন এমন স্মরণীয় মুহুর্তের অবতারণা ঘটে।

ড্রামার মার্কো
Marco Minnemann | Image- GuitarMania

বিশেষ করে, ড্রামারের কথা এই লেখায় আলাদা করে না বললেই নয়। জার্মান ড্রামার মার্কো যিনি একাধিক ইন্সট্রুমেন্ট বাজাতে দারুণভাবে দক্ষ। তার কিছু সলো এলবাম আছে, বেশিরভাগ এলবামেই তিনি নিজে সবগুলো মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট একাই বাজিয়েছেন, ভোকালও তিনি নিজেই দিয়েছেন। ড্রাম বাজানোর এডভান্স টেকনিক ডেভেলপমেন্টের জন্য তিনি পরিচিত এবং এই বিষয়ে তার প্রকাশিত বইও আছে। বিখ্যাত ব্যান্ড ড্রিম থিয়েটারের ড্রামার মাইক পোর্টনয় ২০১০ সালে ব্যান্ড ছাড়লে ড্রিম থিয়েটার তাদের ড্রামার পজিশনের জন্য একটা অডিশন করে। সিরিজ অডিশনের সবগুলো ধাপ পেরিয়ে মার্কো রানারআপ হয়েছিলেন।

এই মাপের একজন ড্রামার বাজাচ্ছেন, আমাদের হাসান গাইছেন এমন দৃশ্য বাংলাদেশে উইন্ড অব চেঞ্জের বদৌলতে দেখা পাওয়া গেল। আর তাই ২০১৯ সালে এসে যেন কোথাও মিলে গেল ১৯৯৮ কিংবা আমাদের হারানো শৈশব…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button