খেলা ও ধুলা

হার্শা ভোগলে- বাংলাদেশ ক্রিকেটের অকৃত্রিম বন্ধু!

ক্রিকেট মক্কা লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলছে ভারতীয় দল। কমেন্ট্রিবক্সে আছেন সাবেক ইংলিশ অলরাউন্ডার জিওফ্রে বয়কট। বাইশ গজে ব্যাট হাতে তখন শচীন টেণ্ডুলকার। বয়কট তার স্বভাবসুলভ খোঁচায় বিদ্ধ করলেন ভারতের কমেন্টেটরদের, বললেন- “শচীন গ্রেট ব্যাটসম্যান হতে পারে, কিন্ত লর্ডসের অনার্স বোর্ডে ওর নাম লেখাতে পারেনি।” জবাবটা দিলেন বছর পঁয়তাল্লিশের এক তরুণ ভারতীয় ধারাভাষ্যকার, বয়কটের মুখের ওপর বলে দিলেন- “তাতে ক্ষতিটা কার হলো? শচীনের, নাকি অনার্স বোর্ডের?” বয়কটের মুখে পাল্টা জবাব ছিল না কোন।

ক্রিকেটার না হয়েও ভারতীয় ক্রিকেট অঙ্গন তো বটেই, ক্রিকেটবিশ্বেরই সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একটি তিনি। বাবা মা দুজনেই ছিলেন অধ্যাপক, বাবা ফরাসী ভাষাতত্ত্বের, মা মনোবিদ্যার। নিজে পড়েছেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। অথচ রসায়নের মতো কাঠখোট্টা বিষয়ে পড়াশোনা করা এই মানুষটাই কিনা এ যুগের সবচেয়ে শৈল্পিক ক্রিকেট ধারাভাষ্যকারদের একজন। নাম তাঁর হার্শা ভোগলে, দ্যা ফেস অব ইন্ডিয়ান ক্রিকেট!

অল্প কিছুদিন ক্রিকেট খেলেছিলেন, তাও সর্বোচ্চ পর্যায়ে নয়। মাত্র উনিশ বছর বয়সেই অল ইন্ডিয়া রেডিওর হয়ে ধারাভাষ্যে হাতেখড়ি, তখন তিনি হায়দরাবাদে থাকেন। ১৯৯২ বিশ্বকাপের আগে ভারত গেল অস্ট্রেলিয়া সফরে, সেখানে অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং এজেন্সি থেকে আমন্ত্রণ পেলেন ধারাভাষ্য দেয়ার, বয়স তখন একুশও ছোঁয়নি পুরোপুরি! এরপর আর পেছনে ফিরে তাকানো নয়। রিচি বেনো, মার্ক নিকোলাস, টনি গ্রেগ, টনি কোজিয়ের, মাইকেল হোল্ডিঙের মতো বাঘা বাঘা ধারাভাষ্যকারদের সঙ্গে কাজ করেছেন, শিখেছেন অনেক কিছু। নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন দারুণভাবে, কিন্ত নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন, কাউকে অনুকরণ করেননি অন্ধভাবে। আর সেটাই হার্শা ভোগলেকে করে তুলেছে নিজের সময়ের সেরাদের একজন হিসেবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি।

অ্যাডাম গিলক্রিস্ট তাঁকে বলেছেন ভারতের রিচি বেনো, শচীন বলেছিলেন, হার্শার কথাগুলো চিন্তাভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দেয়। 

ক্রিকইনফোর মতে, ক্রিকেটার না হয়েও ক্রিকেটের প্রথম সুপারস্টার তিনিই। এ পর্যন্ত একশোর বেশী টেস্ট এবং চারশোর বেশী ওয়ানডে ম্যাচে ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেছেন, টি২০ ম্যাচ, আইপিএল কিংবা চ্যাম্পিয়ন্স লীগের মতো আসর অথবা আইসিসির ইভেন্টগুলো তো তাঁকে ছাড়া ভাবাই যায় না। তবে মাঝে কিছুদিন ব্যতিক্রম ঘটেছিল, অজানা এক ‘অপরাধে’ বিসিসিআই একটা অলিখিত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে তাঁর ওপর। টানা দুই আইপিএলে তাঁর সঙ্গে চুক্তিভঙ্গ করেছিল টুর্নামেন্টের ব্রডকাস্টিং পার্টনারেরা।

যদিও বোর্ডের তরফ থেকে তখন জানানো হয়নি তেমন কিছুই। তবে গত টি-২০ বিশ্বকাপে (২০১৬) ভারতের প্রতিপক্ষদের প্রশংসা নিয়ে বলিউড সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চনের টুইট এবং হার্শার রিটুইটে জলঘোলা হবার বিষয়টি ভোলেননি অনেকেই। বিসিসিআইয়ের বিরাগভাজন হবার কারণ হতে পারে ভারতকে রেখে প্রতিপক্ষের প্রশংসা করাটাও। সেসব এখন অতীত, হার্শা ফিরেছেন স্বমহিমায়, এর বাইরেও ক্রিকবাজে নিয়মিতই ক্রিকেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে নিজের শো নিয়ে আসছেন তিনি।

বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে দারুণ আগ্রহ তাঁর, আমাদের ক্রিকেটের বড় শুভাকাঙ্খীও তিনি। বড় দলগুলোর ধারাভাষ্যকারের বরাবরই ছেলেখেলা করেছেন আমাদের নিয়ে, বাজে পারফরম্যান্সের দিনে ধুয়ে দিয়েছেন মাইক্রোফোনের সামনে। সেখানেই আশ্চর্য্য ব্যতিক্রম হার্শা ভোগলে। আমাদের হয়েই লড়েছেন তিনি, এখন বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সে বসন্তের দখিনা হাওয়া, হার্শাও তাই দারুণ খুশী। আমাদের সাফল্যে তাঁর চোখেমুখে উপচে পড়ে আনন্দের ছটা! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সংগ্রামের দিনগুলোর সঙ্গে এই সময়ের সাকিব-রিয়াদ-মাশরাফি-মুশফিক-তামিমদের দারুণ পারফরম্যান্সের তুলনা করে হার্শা নিশ্চয়ই তৃপ্তি পান এখন।

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে বয়সের ঘড়ি সংখ্যায় ছুঁয়েছে সাতান্নকে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষটা যেন আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠছেন, কণ্ঠের মাধূর্য্য আরো বাড়ছে দিনে দিনে। সেই ১৯৯২ বিশ্বকাপেই তাঁর কণ্ঠস্বর নির্বাচিত হয়েছিল সবচেয়ে আবেদনময়ী হিসেবে, সেই আবেদন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। বর্তমান যুগে তৈলবাজীর ধারাভাষ্যে তো হার্শা ভোগলে অনন্য এক ব্যতিক্রম! ১৯৬১ সালের ২০শে জুলাই ভারতের হায়দরাবাদে জন্মেছিলেন মানুষটা, বুকের ভেতর বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যে অনেকখানি ভালোবাসা নিয়ে বাস করেন যিনি…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button