খেলা ও ধুলা

হার্দিক পান্ডিয়া- ক্রিকেটের এক ব্যাডবয়ের গল্প!

অনুর্ধ্ব তেরো থেকে অনুর্ধ্ব সতেরো দলে তিনি যখন খেলতেন, প্রায়ই তাকে দল থেকে বাদ দেয়া হতো। কারণ হিসেবে বলা হতো, এই ছেলেটার মধ্যে আচরণগত সমস্যা আছে। ‘এটিচিউড প্রবলেম’ মানেটা কি এটা নাকি জানতেনই না এই ক্রিকেটার। তিনি শুধু তার প্রতিক্রিয়া লুকিয়ে রাখতে পারতেন না, এটাই তার বড় ত্রুটি৷ কোনো কিছু মনের বিরুদ্ধে গেলে, পছন্দ না হলে সেটা মুখের উপর বলে দিতেন। তার ধারণা, এটাই তার সত্যিকারের রুপ, এটাকে লুকিয়ে রাখা তার পছন্দ নয়। আবেগ লুকানোর কাজে তিনি খুব বেশি দক্ষ নন।

এই অদক্ষতা সত্ত্বেও ক্রিকেটীয় দক্ষতার জোরে তিনি ঠিকই সামনে এগিয়ে গেছেন। তবে মনের মধ্যে যা চলে, মুখে সেটা সব সময় বলাটা যে উচিত নয় এটা এখন তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। ভারতের মতো একটি দেশ, যেখানে একশ ত্রিশকোটি জনসংখ্যা, সেই দেশের জাতীয় ক্রিকেট দলে সুযোগ পাওয়া যেনতেন ঘটনা নয়। খুব ভাল খেলেও এই পর্যায়ে অনেকেই আসতে পারে না তার প্রমাণ আমরা দেখেছি। অনেকে আইপিএলের দল পর্যন্ত পায় না। সেখানে তিনি জাতীয় দলের ওয়ানডে একাদশে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, বলতে গেলে এখন তিনি অটোচয়েজ। সেই অবস্থান থেকে ধপ করে ধ্বসে যাওয়ার অনুভূতি কি পাচ্ছেন, বর্তমান ক্রিকেটের ব্যাডবয় হিসেবে নিজেকে প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলা মিস্টার হার্দিক পান্ডিয়া?

অথচ, আপনি এই লোকের অতীতের কথা শুনে অবাক না হয়ে পারবেন না। কোথায় ছিলেন তিনি? জীবনের বহমান নদীর এ বাঁক, সে বাঁক বদলে এখন তিনি কোথায়! একটা সময় ছিল যখন দিনের পর দিন সকালের নাস্তা আর দুপুরের খাবার হিসেবে পাঁচ রুপি দিয়ে ম্যাগি নুডুলস কিনে খেতে হয়েছে। তাও একা না, তার ভাই ক্রুনাল পান্ডিয়া, দুইজন মিলে খেতেন। কারণ, এর বেশি কিছু খাওয়ার মতো টাকা থাকত না কখনোই তার কাছে। সারাদিন মাঠে পড়ে থাকতেন। খেলা ছাড়া আর কিছু পারতেন না৷ কিন্তু, মাঠে থাকলে কি কেউ এসে খাবার দিয়ে যাবে? যায় না কেউ। তাই, পাঁচ রুপি দিয়ে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ সেরে নিতেন একসাথে।

খেলে টেলে যদিও বা কখনো অল্পস্বল্প কিছু টাকা পাওয়া যেত, সেই টাকা চলে যেত ঋণ পরিশোধ করতে করতে৷ হার্দিকের পকেটে পাঁচ টাকা আছে এমন ঘটনাও সেইসব দিনে যেন বিরল কিছু! তবে অন্য সবার চেয়ে তার ভাগ্য একটু ভাল বলতেই হয়৷ কারণ, ক্রিকেটের এই নেশার জন্য বাবার হাতে মার-টার খেতে হয়নি তাকে। হার্দিকের বাবার ছোটখাটো ব্যবসা। তিনি সেই ব্যবসা লাটে উঠিয়ে ভারোদারায় যান, যেখানে ক্রিকেট খেলা শেখার ভাল সুযোগ বেশি। বুঝাই যাচ্ছে, পাগলামিটা হার্দিকের বংশগতই। ১৩০ কোটি মানুষের দেশে ছেলেকে ক্রিকেট খেলার সুযোগ দেয়ার জন্য নিজের ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া পাগলামি ছাড়া আর কি!

হার্দিক যখন টিনএজার তখন লোকাল মাঠে খেপ খেলার জন্য ডাক পেতেন। তার স্বভাব হচ্ছে বিশাল বিশাল ছয় মারা। যাইহোক, চারশ পাঁচশ রুপিতে খেপ খেলে বাবামাকে কিছুটা সাহায্য করতে শুরু করলেন তিনি৷ দুই ভাই পাঁচশ রুপি করে পেলে অন্তত এক সপ্তাহ স্বাভাবিক ভাবে খেয়ে দেয়ে জীবন চলে। এই বা কম কি! চার পাঁচশ রুপির খেপ খেলা হার্দিক একদিন আইপিএলে খেলবেন, তাকে লাখ লাখ রুপি দিয়ে কেউ কিনে নেবে কেউ কি ভেবেছিল? হয়ত, ভেবেছিল। হার্দিকের বাবাই হয়ত স্বপ্ন দেখেছিলেন, ছেলে আমার বড় হবে, বড় ক্রিকেটার। দুইবেলার খাবার একবেলায় খেয়ে নিয়ে মাঠে সারাদিন পড়ে থাকা হার্দিকও হয়ত ভেবেছিল, এই ক্রিকেটেই যদি কিছু হয় জীবনে তবেই হবে। অন্য কিছুতে নয়। কিন্তু, আমরা যখন পরিশ্রম করি, জীবন সবসময়ই আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশি কিছু দেয়। হার্দিকের প্রতিও জীবন তার দয়া প্রদর্শন করেছে।

২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত কেউ চিনত না তাকে, কেউ না। মুম্বাই ইন্ডিয়ানস দল যখন তাকে ১০ লাখ রুপিতে নিলো, তখনও কেউ বুঝেনি এই ছেলে একদিন কাঁপাবে। কিন্তু, সেই আইপিএলে কলকাতার বিপক্ষে হাফ সেঞ্চুরি তাকে পরিচিতি এনে দিয়েছে। আর সবাই তার ম্যাচ উইনিং ক্ষমতা, আর ফিনিশার হিসেবে রোল প্লে করার ক্ষমতা দেখেছে চেন্নাইয়ের বিপক্ষে। ৮ বলের ২১ রানের ক্যামিও, কিন্তু তাতে যেন দেখা হয়ে গেল ভবিষ্যতের এক সম্ভাবনাকে। যদিও সেই ম্যাচটা খেলতেই চাননি তিনি। ব্যাথায় ঘাড় নাড়াতে পর্যন্ত পারছিলেন না। কিন্তু, ট্রেইনার চ্যাপম্যান এসে বললো, ব্যাথার জন্য খেলাটা মিস করবা! কেউ কেয়ার করবে না। পেইনকিলার নেও, খেলতে নামো। পেইনকিলার নিয়েই খেলেছিলেন। কিছু ব্যাথা এমন মধুর স্মৃতি রেখে যায়, ভোলা যায় না। সেই ব্যাথাময় দিনটিই হার্দিকের জীবনের মোড় যেন আবার ঘুরিয়ে দিল।

তবে জাতীয় দলে আসবার পথে তাকে সবচেয়ে অনুপ্রাণিত করেছে শচীন টেন্ডুলকারের একটা সামান্য কথা। ওয়াংখেরে স্টেডিয়ামে একদিন ওয়ার্ম আপে টেন্ডুলকার তাকে বললেন, “যেভাবে তুমি খেলছ, তাতে আগামী দেড় বছরের মধ্যে জাতীয় দলে জায়গা পেয়েও যেতে পারো। সেই যোগ্যতা তোমার আছে।” টেন্ডুলকারের কথা মিথ্যা হলো না। ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টিটুয়েন্টি দিয়েই অভিষেক হলো ভারতের জাতীয় দলে, আর খুব দ্রুতই পান্ডিয়া সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ভারত দলের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠলেন। অবস্থা এমনই দাঁড়ালো যে, কেউ কেউ তাকে ভবিষ্যত কপিল দেব ভাবতে শুরু করেছে।

সেই সম্ভাবনা যে ছিল না, তা নয়। বোলিং, ব্যাটিং, ফিল্ডিং, এটিচিউড মিলিয়ে দারুণ এক কম্বিনেশন তার মধ্যে। কিন্তু কে জানত, শেষমেষ এটিচিউডের কারণেই বেশি আলোচনায় থাকবেন তিনি! মাঠের মধ্যে প্রতিপক্ষকে প্রভাবিত করা, প্রতিপক্ষের সাথে মাইন্ড গেম খেলা এটা তো সাধারণ ঘটনাই তার জন্য। বোলিং করার পর একবার তিনি হাসেন তো একবার ক্রুদ্ধ হয়ে তাকান ব্যাটসম্যানের দিকে। ব্যাটিংয়ের সময় অবলীলায় ছয় মেরে নিরস থাকেন, আবার কখনো হাসেন। আবেগের এই ওঠানামা, মাঠের উপস্থিতি সব মিলিয়ে তাকে বেশ আলাদা রকমেই চোখে পড়ে।

কিন্তু, তারচেয়ে বেশি এখন তিনি নজরে এলেন বিতর্কিত কথাবার্তা বলে। সম্প্রতি ‘কফি উইথ করন’ শো’তে এসে নিজের ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে বেশ খোলামেলা কথা বলেন তিনি। যেদিন তিনি ভার্জিনিটি হারান, সেদিন নাকি বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে বলেছিলেন, তিনি আজ করে এসেছেন! শুধু তাই নয়, এক পার্টিতে যখন তারা বাবা জিজ্ঞেস করলো, এখানে কে তার বিশেষ বান্ধবী, হার্দিক নাকি গুণে শেষ করতে পারছিলেন না যে, কার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল না৷ ক্লাব পার্টি এসবে সময় কাটানো তার অন্যতম প্রিয় কাজ। তবে, ক্লাবে নতুন কোনো মেয়ে দেখলে নাম জিজ্ঞেস করার বদলে তিনি নাকি মেয়েরা হাঁটাচলা করলে তাদের পশ্চাদ্দেশ ভঙ্গী কেমন হয়, সেটা দেখতেই বেশি আগ্রহী থাকেন! ব্যাডবয়ের মুখের বাঁধন কতটা আলগা হয়ে গিয়েছিল শো’তে বুঝতেই পারছেন।

অবশ্য নারীসঙ্গের কারণে হার্দিক তো এই প্রথম শিরোনাম হননি। ২০১৬ সালেই ফেরা যাক। সেবছর জামসেদপুরের মডেল লিসা শর্মার সাথে তার সম্পর্কের কথা জানাজানি হয়। লিসা তাকে নিয়ে ইন্সট্রাগ্রামে ছবি আপলোড দেন, সেখানে ক্যাপশনে লেখা ছিল ‘ট্যাকেন’!

এরপর আবার সুইডিশ অভিনেত্রী এলি আভ্রামের সাথে প্রেম করেন কিছুদিন। তাদেরকে পারিবারিক অনুষ্ঠানেও একসাথে ঘুরতে দেখা যায়। কিন্তু, হার্দিক নাকি পাকাপাকি কোনো কমিটমেন্টে যেতে রাজি ছিলেন না। ফলে ফাটল ধরে এই সম্পর্কে। এই বছর এসে হার্দিক আবারো শিরোনাম হন, তবে এবার ওপাশের মানুষটার নাম এশা গুপ্তা, বলিউড অভিনেত্রী। তাদের বিয়ে হতে পারে এমন গুঞ্জনও উঠেছিল।

হার্দিক এমনই এক ইমেজের মানুষ, যাকে নিয়ে গুঞ্জন নতুন কিছু নয় আর। মাঠে, মাঠের বাইরে তার আচরণ, চলাফেরা নিয়ে সবসময়ই একটা কৌতুহলী প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছিল সবারই। আর এবার তো কফি উইথ করণ শোতে এমন কথাই বললেন, কথা তো নয়, যেন আগুণ জ্বালিয়ে দিলেন। তার ব্যাডবয় ইমেজ আরো প্রতিষ্ঠিত হলো। তবে এটেনশন তিনি সবসময়ই পছন্দ করেন। ছোটবেলা থেকেই তার আচরণ একটু অন্যরকম। তার মতাদর্শ হচ্ছে, যেসব খেলোয়াড় কোচকে তেল মারার জন্য সকালে গুড মর্নিং আর রাতে গুড নাইট বলছে, তাদের এই আদব কায়দা এটা প্রমাণ করে না যে তারা আসলেই কোচকে শ্রদ্ধা করছে। শ্রদ্ধা দেখানো বিষয় নয়। এভাবে শ্রদ্ধা দেখানো শিখেননি হার্দিক। তার পোষাকও ভিন্নরকম। লোকে ভাবে সে শুধু পার্টি করেই বেড়ায়। কিন্তু, তার দাবি মানুষ যতটা ভাবে, অতটাও খারাপ না তিনি৷

এখন তিনি শৃঙ্খলা আনতে নিজের ঘুমের রুটিন বদলাচ্ছেন। খাওয়ার মেন্যু বদলাচ্ছেন। তবুও লোকে একবার যা ট্যাগ দেয়, তা-ই থেকে যায়। এই যেমন কেউ কেউ তাকে রকস্টার বলে তার বেশভূষার জন্য, গলায় চেইন, আধুনিক পোষাক, চলাফেরা সবমিলিয়ে। এই নামটা দিয়েছিল মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের টিমম্যাট ব্লিজার্ড। তাতে অবশ্য কিছু মনে করেননা হার্দিক। কে কি ভাবলো, সেটা আর কবে কেয়ার করেছেন তিনি।

কিন্তু, এবার বোধহয় কেয়ার না করলেই চলবে না তার। কফি উইথ করণ শোতে গিয়ে তার পার্টি বয় ইমেজ আরো পাকাপোক্ত হলো বটে কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হলো, দুই ম্যাচের জন্য নিষেধাজ্ঞা পাওয়াটা। নিষেধাজ্ঞা আরো বাড়তেও পারে। যাই হোক, এই ক্ষতির ক্ষত মুছে হয়তো এই ব্যাডবয় আবারো ফিরে আসবেন মাঠে, তবে ক্ষত সারলেই কি, দাগ তো থেকে যায়, সব দাগ কি একেবারে মুছা যায়!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button