খেলা ও ধুলা

ক্রিকেট কখনও ভীষণ নির্দয়, প্রচণ্ড নিষ্ঠুর…

সুপার ওভারের শেষ বল, বিশ্বকাপ আর নিউজিল্যান্ডের মধ্যে একটা বল আর দুইটা রানের দূরত্ব। স্ট্রাইকিং এন্ডে মার্টিন গাপটিল, ব্যাট হাতে এবারের বিশ্বকাপটা যার দুঃস্বপ্নের মতোই কেটেছে। এই বলে দুটো রান নিতে পারলেই আগের নয় ম্যাচের কথা মনে রাখবে না কেউ, গাপটিল হয়ে যাবেন নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নায়কদের একজন!

পুরোটা টুর্নামেন্টজুড়ে ব্যাট হাতে ব্যর্থ গাপটিল পারলেন না শেষ বলে দুই রান নিতে। স্কয়ার লেগ থেকে ফিল্ডারের পাঠানো বলটা ধরে স্ট্যাম্প ভেঙে দিলেন জস বাটলার। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা তখন বিশ্বজয়ের আনন্দে মেতেছেন, কিউই শিবিরে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। মাঠের মধ্যেই হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লেন গাপটিল, এই ব্যর্থতার বোঝাটা তিনি আর বইতে পারছিলেন না। টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে উঠেও হাজারটা নাটকীয়তার পরে বাউন্ডারির সংখ্যায় নির্ধারিত হলো হার- গাপটিল হয়তো নিজেকেই দায়ী করছিলেন তখন।

অপরপ্রান্তে থাকা জিমি নিশাম এগিয়ে এলেন, মাঠের বাইরে থেকে ছুটে এলেন ইশ সোধি। শিরোপা জয়ের উদযাপন থামিয়ে গাপটিলের পাশে এসে দাঁড়ালেন ক্রিস ওকস। এমন পরিস্থিতিতে স্বান্তনার বাণী কাজে আসে না, ওরা শুধু টেনে ওঠানোর চেষ্টা করলেন এই ওপেনারকে। গাপটিলের শরীরটা তখন কয়েক মণ ওজনের ভারী পাথরের মতো, সেটাকে টেনে তোলে কার সাধ্যি? ম্যাচ শেষ হবার পরেও প্রায় মিনিট দশেক সেই অবস্থাতেই বসে ছিলেন গাপটিল, এই মূহুর্তটার কথা হয়তো বাকী জীবনে আর ভুলতে পারবেন না তিনি।

বিশ্বকাপটা মোটেও ভালো কাটেনি গাপটিলের। গত আসরে যিনি ছিলেন সর্বোচ্চ রানের মালিক, একটা ডাবল সেঞ্চুরী আর একটা সেঞ্চুরী ছিল নামের পাশে, সেই গাপটিল এবার দশ ম্যাচে ব্যাট হাতে নেমে রান করেছেন মাত্র ১৮৬, গড় মাত্র বিশ! সিঙ্গেল ডিজিটে আউট হয়েছেন পাঁচ ইনিংসে, ডাক মেরেছেন দুইবার।

তবে ব্যাটিঙের কমতিটা ফিল্ডিঙে পুষিয়ে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। পরিসংখ্যান বলছে, শেলডন কটরেলের পরে এই বিশ্বকাপে ফিল্ডার হিসেবে সবচেয়ে বেশি রান বাঁচিয়েছেন গাপটিলই। সেমিফাইনালে তার দুর্দান্ত এক ডিরেক্ট হিটেই শেষ হয়ে গেছে ভারতের ফাইনাল খেলার স্বপ্নটা। ব্যাট-বল কোনটাই নয়, ফিল্ডিং দিয়েই সেদিন নায়ক হয়েছিলেন গাপটিল।

ব্যাট হাতে ফর্ম যাই হোক, ভাগ্য কিন্ত গাপটিলের পাশে দাঁড়িয়েছে বারবার। ফাইনাল ম্যাচটা ভালো খেলতে পারলেই পুরো বিশ্বকাপে গাপটিল কি করেছেন, সেটা কারো মনেই থাকতো না। দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে ব্যাটিং শুরু করেছিলেন, মনে হচ্ছিলো, দুর্দশার বিশ্বকাপের শেষটা বুঝি রাঙিয়ে দেবেন ব্যাট দিয়ে।

কিন্ত গাপটিলকে যে তামিম ইকবালের ভূতে পেয়েছে এই বিশ্বকাপে, উনিশ রানেই তাই সাজঘরের পথ ধরলেন, তার আগে নষ্ট করে গেলেন সবেধন নীলমণি রিভিউটা। সেই রিভিউ হাতে থাকলে রস টেলরের আউটটাকে চ্যালেঞ্জ জানানো যেতো, আম্পায়ারের বাজে সিদ্ধান্তের বলি হতে হতো না টেলরকে।

এরপরেও ভাগ্যদেবী আরেকটা সুযোগ দিয়েছেন গাপটিলকে। সুপার ওভারের শেষ বলটায় স্ট্রাইকে তিনিই ছিলেন। দুটো রানের দরকার ছিল কেবল, সেটা নিতে পারলেই তিনি হয়ে যেতেন নায়ক। আগের বিশ্বকাপে ভুরি ভুরি রান করেও ট্রফিটা ছোঁয়া হয়নি, ব্যর্থতার বিশ্বকাপ কাটিয়েও এবার সুযোগ পেয়েছিলেন নিজের কৃতিত্বে দলকে শিরোপা জেতানোর।

জোফরা আর্চারের ফুল লেন্থের ডেলিভারিটাকে বাউন্ডারির বাইরে পাঠানোটা খুব বেশি কঠিণ কাজ ছিল না তার জন্যে, বলের লাইন থেকে সরে গেলেও সেটা ওয়াইড হতো। গাপটিল কোনটাই করতে পারলেন না, কোনমতে বলটাকে স্কয়ার লেগে পাঠিয়ে দুটো রানের জন্যে ছুটলেন। পারলেন না শেষমেশ, পপিং ক্রিজে পৌঁছানোর আগেই ফিল্ডারের থ্রো থেকে বল পেয়ে স্ট্যাম্প ভাংলেন বাটলার। নায়ক হওয়া হলো না গাপটিলের, তিনি হয়ে রইলেন খলনায়কই! ক্রিকেট কখনও কখনও ভীষণ নির্মম, প্রচন্ড নিষ্ঠুর আর নির্দয়। সেই রূপটাই গাপটিল এবার দেখে নিলেন…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button