সিনেমা হলের গলি

গাল্লি বয়: আড়াই ঘন্টার চমৎকার এক জার্নি!

Gully Boy দেখে শেষ করলাম। শেষ তারে জামিন পার দেখেছিলাম, এরপরে বলিউডে এতো ভালো একটা মুভি দেখলাম! নিম্নবিত্ত ঘরের একটা ছেলের স্বপ্নকে তাড়া করে করে উঠে আসার গল্প। আমি সব সময় একটা কথা বলি। আমাকে, কিংবা অন্য অনেককেই তাদের বাবা-মা, বা তাদের আত্মীয়, প্রতিবেশীরা হয়তো কথা শুনিয়েছে জীবনে বা এখনও শোনায় যে, অমুক পারলে তুমি পারবা না কেনো? ও ভাত খায়, তুমিও ভাত খাও। আমি আগে বলতে পারতাম না, এখন বলে দেই। আমি কি লাইফ লিড করি, সেইটা আমি জানি। আমাকে একটা পরীক্ষায় বসতে হলে দশবার ফি নিয়া চিন্তা করতে হয়, এই বয়সে ইচ্ছা করে না বাপের থেকে পরীক্ষার ফি নিতে। একটা কোচিং এ ভর্তি হইতে হলে ২০বার চিন্তা করতে হয়। একটা পরীক্ষার আগেও ক্লিনিকে খ্যাপ মারতে যাইতে হয়, নিজের পকেট চালাইতে। আর যে দশজনের সাথে আমাকে তুলনা করেন, তাদের জীবনের সাথেও তাহলে তুলনা করেন! সেইটা তো করবেন না!

মুভির একেকটা গান যেনো বারুদের অক্ষরে লেখা। সোচো কিতনে দুরি হ্যায় – গানটাতে উঠে এসেছে গলিতে, বস্তিতে থাকা মানুষের কথা, উঠে এসেছে নিম্নবিত্ত ঘরের একজন মায়ের লড়াইয়ের কথা। আপনা টাইম আয়েগা – এই গানটা নিয়ে কিছু কথা বলার জায়গা রয়েছে। আমি যখন খুব ফ্রাস্ট্রেটিং সময় কাটাই, তখন শুনলে হাসতে পারেন, আমি কুংফু পান্ডা দেখি, কিংবা ব্যাটম্যান দেখি। কুংফু পান্ডা একটা কমিক এনিমেটেড মুভি, হাসির ছবি।

কিন্তু আপনি যখন ভিন্ন পারস্পেক্টিভ থেকে চিন্তা করবেন, পো নামের এই পান্ডাটার ড্রাগন ওয়ারিওর হবার কথা ছিলো না, আরও স্পেসিফিকেলি বলতে গেলে, কেউ কোনদিন ভাবেনি। কিন্তু সে দিনের পর দিন মার খেয়ে খেয়ে, লজ্জা অপমান সহ্য করে একদিন দাঁড়িয়েছে, প্রমান করেছে, যে দ্যাখ! আই এম দা ড্রাগন ওয়ারিওর!

একই কথা ব্যাটম্যান এর ক্ষেত্রেও। ধুন্ধুমার বড়লোক পরিবারের ছেলে, এক রাতের মধ্যে এতিম ব্রুস ওয়েন। সেই ব্রুস ওয়েন নিজেকে নিজে পরিণত করেছে ব্যাটম্যানে। যে আকাশচুম্বি পয়সা বাপ রেখে গিয়েছে, চাইলেই মদ-নারী-আমোদ ফুর্তিতেই শেষ করতে পারতো। কিন্তু সে একটা আইডিওলজিকে গ্রহন করেছে। তার সাথের প্রতিটা সুপারহিরোর কোন না কোন সুপারন্যাচারাল পাওয়ার আছে, কিন্তু সে সাধারণ একজন মানুষ, নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে নিজেকে সুপারহিরোর কাতারে এনেছে সে। এই দুইটা ক্যারেক্টার আমাকে বুস্ট আপ করে। আজকের থেকে আপনা টাইম আয়েগা- গানটি সেই লিস্টে ঢুকে গেলো। গানের মাঝামাঝি দুইটা লাইন আছে যেটার বাংলা অনেকটা এমন,

“আজকের এই জায়গায় আসায়, মাথার উপর কারও ছায়া ছিলো না, কারও হাত ছিলো না। এই অর্জন পুরোটাই আমার পরিশ্রম।” আরেকটা লাইন যেটা একদম বুকের মধ্যে ধপ করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়, ‘আমার যে স্বপ্ন জিন্দা, তুই কিভাবে সেটা দাফন করবি?” একেকবারে ৩-৪বার করে শুনি, তাও পিপাসা মেটে না, কী অদ্ভুত ইন্সপায়ারিং একটা গান!

আলিয়া ভাট নামের মেয়েটার প্রথম মুভি স্টুডেন্ট অফ দি ইয়ার। একটা গার্বেজ মুভিতে একটা সেক্স আইটেম এর বেশী কিছু মনে হয় নাই তাঁকে। এরপরে সে নিজেকে বদলাতে শুরু করলো, একের পর এক ভিন্ন চরিত্রে অভিনয়। এই মুভিতে, আলিয়া আউটস্ট্যান্ডিং ছিলো! মুখের ছোট ছোট এক্সপ্রেশন গুলো যা দিয়েছে, মাই গড! ভয়ংকর পজেসিভ প্রেমিকার স্ট্যান্ডার্ড আলিয়া ভাট, কোন কথা হবে না!

রনবীর সিং। এক দুই বছর আগেও আমার মনে হতো, পিওর ছ্যাচড়া একটা ছেলে। এমন কি, বিভিন্ন এওয়ার্ড প্রোগ্রামেও বানরের মতো ছ্যাচড়ামি করতো। দিল ধারাকনে দো – তে প্রথম মনে হলো, আরে! অদ্ভুত কাণ্ড! এ দেখি কচি তরুণ বয়েসী রনবীর সিং! এরপরেই বাজিরাও মাস্তানীতে আরেক তাণ্ডবপূর্ণ অভিনয়! এরপর পদ্মাবতে খিলজীর অভূতপুর্ব চরিত্রায়ন! খান ডাইন্যাস্টি আর বলিউডে বাপ-চাচার পরিচয়ের বাইরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করাটা যে কী ভয়াবহ কঠিন, সেটা জেনেই রনবীর যেনো নিজেকে পোড়াতে শুরু করলো, পুড়তে পুড়তে সেই খাদহীন স্বর্ণ পেলাম গালি বয় মুভিতে এসে।

রনবীর সিং প্রমাণ করে দিলো, পরিশ্রম দিয়ে, পারফরম্যান্স দিয়ে হ্যাটার্স কেও ফ্যান বানায় দেয়া যায়। না, মোটেও গড গিফটেড না, পুরাটাই নিখাদ পরিশ্রম। এই মানুষটার জন্য একটা স্যালুট। যে গান গুলো নিয়ে বললাম, গান গুলো পর্যন্ত তারই গাওয়া। ‘সোচো কিতনি দুরি হ্যায়’ গানের শেষের অংশে প্রায় ২০ সেকেন্ড রনবীরের শুধু চোখে ক্যামেরার ফোকাস ছিলো। পুরাটা সময় তার চোখ অভিনয় করেছে, পুরোটা সময় চোখ দুইটা কথা বলেছে, কেঁদেছে, অভিমান করেছে, গলার কাছে দলা পাকানো কষ্টের কথা, সংগ্রামের কথা বলেছে দুইটা চোখ। স্যাল্যুট ম্যান!

মুভিটা কারও কারও হয়তো ভালো লাগবে না কারণ অনেক উচ্চবিত্তের এই মানুষগুলোর সাথে রিলেট করবার ক্ষমতাটুকু নেই। ক্লাস ওয়ান থেকে থ্রী পর্যন্ত আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের আব্বা ছিলো বেবি ড্রাইভার, একটা গ্যারেজে ছিলো তাদের বাসা। বাট হি ওয়াজ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড। পরে স্কুল চেঞ্জ হয়ে যায়, ফোন-অনলাইন কিছুই ছিলো না, আর কখনও খুঁজে পাই নাই। আই ন্যো হাউ টু ফিল দেম।

দ্যাট ওয়াজ আ গ্রেট জার্নি, আড়াই ঘন্টার একটা সুন্দর জার্নি।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button