সিনেমা হলের গলি

গাল্লি বয়: ২০১৯ সালের সেরা বলিউডি সিনেমা?

“আপনা টাইম আয়েগা
তু নাঙ্গা হি তো আয়া হ্যায়
ক্যায়া ঘণ্টা লেকার যায়েগা…”

নাঙ্গা হয়ে দুনিয়াতে আসা আর ‘ঘন্টা’ নিয়ে বিদায় নেয়ার মাঝখানে ‘আপনা টাইম’ কখন কিভাবে আসবে, সেই বিষয়টা ক্লিয়ার না হলেও, এটা ক্লিয়ার যে, এবছরের প্রথম অর্ধের সেরা বলিউডি সিনেমাটা দেখে ফেলেছি ইতিমধ্যে।

করণ জোহর জোয়া আখতারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তুমি শুধু উচ্চবিত্তের গল্প নিয়ে সিনেমা বানাও? প্রশ্নকর্তা নিজেও অবশ্য একই দোষে দুষ্ট, তবে নিজের কমফোর্ট জোনকে ভেঙে জোয়া এবার যে গল্পটা দর্শককে দেখালেন, সেখানে নিখাদ মাটি আর মানুষের গন্ধ, কান পাতলেই সেখানে শোনা যায় অভাবের আহাজারি।

স্বপ্ন আর বাস্তবতার নিত্যনৈমিত্যিক সংঘর্ষকে এমন চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে খুব কমই পেরেছে বলিউড, আর সেই ছোট্ট তালিকায় উজ্জ্বল এক সংযোজন হয়ে থাকবে ‘গাল্লি বয়’। জোয়া আখতার খুব ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিলেন, কেন তাকে বলিউডের এই সময়ের সেরা নির্মাতাদের ছোট্ট তালিকায় ঠাঁই দিতেই হবে।

ধারাবি, ভারতের সবচেয়ে বড় বস্তি। নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, সব ধরণের মানুষের বাস এখানে। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা দশ লাখের কম নয়। জীবনের মানে এখানে শুধুই সংগ্রাম, পেটের তাগিদে সারাক্ষণ ছুটে চলা।

এই ধারাবির ১৭ নম্বর বস্তিতে বাস মুরাদ আহমেদের। অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র মুরাদ, টাকাপয়সার টানাটানি হলে দুই বন্ধুর সাথে মিলে গাড়ির পার্টস চুরির কাজ করে। পকেট ফাঁকা, ঘরে অশান্তি, এর মধ্যে বাবা আবার বিয়ে করেছে। আড়াই রুমের ঘুপচি ঘরে এতগুলো মানুষের বসবাস। এত ঝুট ঝামেলার মাঝে মুরাদের শান্তির নাম সাফিনা। সার্জন হতে যাওয়া মেয়েটা পাগলের মতো ভালোবাসে মুরাদকে, সেজন্যেই হয়তো এত ঝড়-ঝাপটার মাঝেও মাঝেমধ্যে মুরাদের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।

এই ক্লিশে জীবন, ক্লান্তিময় দিন আর নিস্তরঙ্গ রাতের ভীড়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামটা চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা মুরাদ পায় আরও একটা জায়গা থেকে। তার বুকের ভেতর সবার অজান্তে বয়ে চলে র‍্যাপ মিউজিকের অশান্ত এক নদী। ঘুপচি ঘরের অন্ধকারে বসে ছন্দ সাজিয়ে মুরাদ লিখে ফেলে তার জীবনের গল্প, প্রাত্যহিক সংগ্রামের গল্প, যে গল্পে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ধারাবির সতেরো নম্বর বস্তি, নিম্নবিত্ত কিছু মানুষের জীবনের চিরচেনা রূপ।

স্বপ্ন আর বাস্তবতার লড়াইটা ভীষণ একপেশে, দামাল স্বপ্নের দল হার মেনে যায় জীবনের কঠোর বাস্তবতার সামনে। চাকরের ছেলেকে চাকরই হতে হয়, অন্তত আমাদের সমাজ সেই অলিখিত নিয়মটা বেঁধে দিয়েছে প্রতিটা জায়গায়। এখানে ভিন্ন কিছু করতে চাওয়াটা পাপ, প্রথার বাইরে হাঁটাটা অপরাধের শামিল। সমাজ, সংসার আর পরিবারের চক্ষুশূল হয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়াটা সহজ কিছু নয়।

এই জায়গাটাতেই মুরাদ অনন্য, এজন্যেই মুরাদ আমাদের কাছের মানুষ হয়ে ওঠে মূহুর্তেই। আমরা যেখানে হার মেনে নিয়েছি অনেক আগে, মুরাদ সেই যুদ্ধের লড়াকু এক সৈনিক, তার এই জার্নিটাকে তাই বড্ড আপন মনে হয়। জীবন মুরাদকে আঘাত করে, সেই আঘাত সয়ে নিয়ে মুরাদ পাল্টা আঘাত হানেন জীবনের প্রতি, তার অস্ত্র গানের লাইন, তার ছন্দ। এই দুইয়ের জমজমাট লড়াইয়ে কে জেতে, সেটা জানার আগ্রহ জন্মে ভীষণ।

ধারাবির খুব সাধারন এক তরুণ মুরাদ, কিংবা হিপহপ র‍্যাপার গাল্লি বয়- দুই রূপেই রনবীর সিং অনবদ্য। ‘শের আয়া শের’ গানের শুরুতে রনবীরের চেহারাটা ভালো করে খেয়াল করবেন, এমসি শের তখন মঞ্চে র‍্যাপ গাওয়া শুরু করেছেন, গানের কথাগুলো শুনে আস্তে আস্তে পাল্টে যাচ্ছে বারান্দায় দাঁড়ানো রনবীরের চেহারা- এই এক্সপ্রেশনটার ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়। সিনেমা হিসেবে গাল্লি বয়কে রকস্টারের সঙ্গে তুলনা করেছেন অনেকে, আমি বরং গাল্লি বয়ের সাথে মিল খুঁজে পেয়েছি জাতিস্মরের, কিংবা অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’র। বৈঠকি গানের আসরের সেই লড়াইটা হিপহপ কালচারে যেন ফিরেছে আবার!

পজেসিভ এক প্রেমিকা হিসেবে আলিয়া ভাট দুর্দান্ত। কালকি কোয়েচিন যতোক্ষণ স্ক্রিনে ছিলেন, ভালো লেগেছে। তবে বিস্ময় উপহার দিয়েছেন সিদ্ধান্ত চতুর্বেদী। অ্যামাজন প্রাইমের ওয়েব সিরিজ ‘ইনসাইড এজ’ -এ প্রথম দেখেছিলাম তাকে, মফস্বল থেকে বিশ্বের সেরা টি-২০ লীগে উঠে আসা আনকোরা এক পেসার ছিলেন সেখানে তিনি। ভালো অভিনয় করেন মনে হয়েছিল, কিন্ত কতটা ভালো? ভালোর পরিমাণ এতটাই যে, কখনও কখনও পার্শ্বচরিত্র হয়েও সবটুকু ফোকাস নিজের দিকে কেড়ে নিয়েছেন ‘এমসি শের’!

চিত্রনাট্যেরও একটা বড় ভূমিকা আছে এতে অবশ্য। র‍্যাপের জগতটাতে এমসি শের গাল্লি বয়ের চেয়ে সিনিয়র, সেই সম্মানটা তাকে পুরো সিনেমাতেই দেয়া হয়েছে। নিকট অতীতে বলিউডে ‘বাধাই হো’ ছাড়া আর কোন সিনেমায় পার্শ্বচরিত্রকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে লেখা হয়েছে, মনে পড়ছে না এই মূহুর্তে। মুরাদের দুই বন্ধুর চরিত্রে যারা অভিনয় করেছেন, তারাও প্রশংসা পাবেন।

আরেকটা মানুষের কথা না বললেই নয়, তিনি বিজয় রাজ। হি ইজ ওয়ান অফ দ্য ফাইনেস্ট আর্টিস্ট অফ ইন্ডিয়া, কিন্ত মানুষটাকে আজও ইন্ডাস্ট্রি পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারলো না। তবুও যখন যে রোলই তিনি হাতে পেয়েছেন, জাত চিনিয়েছেন, সেই রোল যতোই অগুরুত্বপূর্ণ হোক, স্ক্রীন টাইমিং যতোই কম থাকুক না কেন। ‘গাল্লি বয়’তেও তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি। রনবীর সিং এর সাথে তার সিকোয়েন্সগুলোর প্রত্যেকটাই উপভোগ্য। শেষদিকে ছেলের জেদের সামনে রাগ দেখিয়ে যখন কাজ হচ্ছিল না, তখন হঠাৎই আবেগী হয়ে গেলেন, মূহুর্তের মধ্যে এই যে দারুণ ট্রান্সফর্মেশনটা, এটা মেথড অ্যাক্টর ছাড়া কারো পক্ষে করা সম্ভব না।

একটা সিনেমা অসাধারণ হয়ে ওঠে কখন? সেটা কি শুধুই পরিচালক কিংবা অভিনেতার গুণে? গাল্লি বয়ের বেলাতেই দেখুন, স্ক্রিপ্ট রাইটার থেকে শুরু করে ডায়লগ, ক্যামেরা, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, কস্টিউম ডিজাইন- প্রত্যেকটা সেক্টরেই দুর্দান্ত কাজ হয়েছে। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনি মুরাদকে খুঁজে পাবেন, রনবীর সিং এর কথা মাথায়ই আসবে না কারো। শুটিঙের বেশিরভাগই হয়েছে ধারাবির বস্তিতে, গল্পের বাস্তবতাটা ফুটিয়ে তুলতে কোথাও কার্পণ্য করেনি জোয়া আখতারের টিম।

ছোট্ট একটা দৃশ্যের কথা বলি। রেকর্ডিঙের জন্যে মুরাদ প্রথমবার মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়েছে, কামে JBL ব্র‍্যান্ডের একটা হেডফোন লাগানো, সেটার J অক্ষরটা প্রায় মুছে গেছে। লোকাল একটা রেকর্ডিং স্টুডিও তো ঝাঁ চকচকে হবে না, এই যে খুঁটিনাটি বিষয়গুলোতে খেয়াল রাখার ব্যাপারটা, এগুলোই গাল্লি বয়কে অনন্য করে তুলেছে। 

র‍্যাপ মিউজিকের আলাদা একটা ভাষা আছে, একটা ধরণ আছে। র‍্যাপ প্রতিবাদী ভঙ্গিতে অনাচারের কথা বলে, অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খোলে। র‍্যাপ মানে শুধু ‘ইয়ো ইয়ো’ টাইপের জগাখিচুড়ি কিছু নয়। আশি-নব্বইয়ের দশকে নিউইয়র্কে স্ট্রিট র‍্যাপ কালচারটা যেভাবে বিস্তার লাভ করেছিল, সেটাকে মুম্বাইয়ের আবহে ফুটিয়ে তোলার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন জোয়া আখতার, এবং লেটার মার্ক নিয়ে পাশও করছেন। সিনেমার প্রায় পুরোটাতেই চরিত্রগুলো মুম্বাইয়ের লোকাল অ্যাকসেন্টে কথা বলেছে, সেটা আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে পারফরম্যান্সগুলোকে।

শুরুর দিকে একটু স্লো, শেষটা প্রেডিক্টেবল- এরমধ্যেও মন কেড়ে নেয়ার মতো অজস্র ব্যাপার আছে। আমি জানি শেষ পর্যন্ত কি হতে চলেছে, তবুও ক্ল্যাইম্যাক্সে রনবীরের এনার্জেটিক পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ হয়েছি, আলিয়ার জায়গায় আমি থাকলেও হয়তো গানের মাঝখানে এভাবেই চেঁচিয়ে উঠতাম। আর তাই লুটেরা, বাজীরাও মাস্তানী বা পদ্মাবৎ নয়, আমার চোখে রনবীরের তার জীবনের সেরা অভিনয়টা গাল্লি বয়-তেই করেছেন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button