সিনেমা হলের গলি

গেম অফ থ্রোন্সের সেরা দৃশ্য কোনটি?

স্পয়লার এলার্ট!

গত আট বছর ধরে যে সিরিজটি গোটা বিশ্ব মাতিয়ে রেখেছে তা হচ্ছে গেম অফ থ্রোন্স। জর্জ আর আর মার্টিনের উপন্যাস অনুসারে নির্মিত এই সিরিজটি নিয়ে উন্মাদনা কোন পর্যায়ে গিয়েছিলো তা এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না গেলে বোঝা মুশকিল। নব্বইয়ের দশকে হুমায়ূন আহমেদের “কোথাও কেউ নেই” ধারাবাহিক নাটকটি যারা দেখেছেন, তারা কিছুটা অনুভব করতে পারবেন। পুরো সিরিজটি খুব অল্প বিরতি দিয়ে আমি “বিঞ্জ ওয়াচিং” করেছি- এবং মনের ভেতরে এটি দীর্ঘ ছাপ ফেলেছে।

মহাকাব্যিক বিস্তৃতির এই সিরিজে এত এত চরিত্র, এত এত অসামান্য দৃশ্য যে এর ভেতর থেকে একটা দৃশ্য বেছে নেয়া বেশ কঠিন একটা কাজ। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এই কাজটা কেন জানি খুব বেশি কঠিন হয়নি। বিশেষ একজনের অভিনয় এত অসামান্যভাবে বাকিদেরকে ছাড়িয়ে এমন উচ্চতায় গিয়েছে যে বেছে নিতে সময় লেগেছে সামান্যই। আমি নিশ্চিত, অনেকেই আমার সাথে একমত হবেন- গেম অফ থ্রোন্স এর পুরো আট সিজনের শ্রেষ্ঠতম দৃশ্য হচ্ছে চতুর্থ সিজনে টিরিয়ন ল্যানিস্টারের বিচারের দৃশ্যটি। ইউটিউবের জনৈক ফ্যানের মতে, গেম অফ থ্রোন্সের সবগুলো ড্রাগন একসাথে মিলে যে পরিমাণ আগুন ছড়িয়েছে পুরো আট সিজন মিলে, ওই চার মিনিটের দৃশ্যে টিরিয়ন ল্যানিস্টার তার চাইতে কয়েক গুণ বেশি আক্রোশ প্রকাশ করেছে।

গেম অফ থ্রোন্সের দর্শকেরা সবাই জানেন- টিরিয়ন ল্যানিস্টার একজন বামন। বামন হবার কারণে জন্মের পর থেকে প্রতিটা মুহূর্তে পদে পদে তাকে বঞ্চনা, দ্বেষ আর ঘৃণার শিকার হতে হয়। ক্ষুদে বামন টিরিয়ন তাতে দমে না। বই পড়ার অভ্যাস, জ্ঞানচর্চা আর বুদ্ধির প্রয়োগ করে সে তার সামনে আসা সমস্ত বাধা একের পর এক পার হয়। এই চরিত্র রূপায়নকারী অভিনেতা পিটার ডিঙ্কলেজ নিজেও একজন বামন- টিরিয়ন ল্যানিস্টার চরিত্রটি চিত্রণের প্রতি পদে পদে অনুভব করেছি তিনি তাঁর বাস্তব জীবনকেই যেন ক্ষণে ক্ষণে তুলে ধরছেন।

চতুর্থ সিজনে প্রচণ্ড অত্যাচারী বালক রাজাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় , যে কিনা টিরিয়নের বড় বোন (সেরসেই ল্যানিস্টার) আর তার ভাইয়ের (জেইম ল্যানিস্টার) অবৈধ সন্তান (এখানে ওই দুজনের ইনসেস্ট সম্পর্ক দেখানো হয়েছে)। বালক রাজা বারংবার টিরিয়নকে প্রকাশ্যে অপমান করে, যার ফলে সবাই ধরে নেয় এটা টিরিয়নেরই প্রতিশোধমূলক ষড়যন্ত্র। টিরিয়নের আপন পিতা একটা পক্ষপাতমূলক বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দিতে চায় তাকে- নিজের বামন পুত্রের অস্তিত্বই যেন তার কাছে একটা অসহ্য সত্য-যা মিটিয়ে ফেলাটাই মঙ্গল।

অথচ বামন হলেও টিরিয়ন জড়বুদ্ধিসম্পন্ন নয়- বহিঃশত্রুর হাত থেকে অল্প কিছুদিন আগেই সে রাসায়নিক বিস্ফোরকের মাধ্যমে গোটা শহরকে রক্ষা করেছে। যে শহর আজ তাকে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে, সে না থাকলে এই শহরটার অস্তিত্ব বহু আগেই ধূলায় মিশে যেত। বিচারের এই প্রহসন দেখে প্রচণ্ড ক্ষোভ শীতকালের সাগরের জমাট বাধা কুয়াশার মত ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে তার সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে- বিস্ফোরণ ঘটবে যে কোনও মুহূর্তে…

ভাই জেইম ল্যানিস্টারের সাথে কথা হয়েছে আগের দিন। জেইম জানিয়ে দিয়েছে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, সে ক্ষমা চাইবে এবং তারপর তাকে পাঠিয়ে দেয়া হবে সীমান্তে- যেখানে নাইট ওয়াচে সে বাকি জীবন কাটাবে। মেনেও নিয়েছে সে, ঠিক যেভাবে মানুষ নিয়তিকে মেনে নেয় শত অবিচার জেনেও।

ট্রায়াল শুরুর পর ভাই জেইম বার বার ইশারায় বলেছে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগুতে। সেভাবেই এগুচ্ছিলো সবকিছু, কিন্তু পুরোটাই দুমড়ে মুচড়ে গেলো যখন টিরিয়নের সাবেক প্রেমিকা তার বিরুদ্ধে মিথ্যে সাক্ষী দিতে এলো। এই আঘাত টিরিয়ন প্রত্যাশা করেনি, যে মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখতে নিজের সর্বস্ব বাজী রেখেছিল সে, সেই মেয়েটিই আজ এসেছে তার সর্বনাশ করতে। বারুদ জমাই ছিল, এই ঘটনা তাতে আগুনের স্ফুলিঙ্গ যুক্ত করলো।

এতক্ষণ শান্ত-স্থিতধী টিরিয়নের চোখে এখন ভিসুভিয়াসের লাভা জ্বলজ্বল করছে। ক্ষুদ্র তার দেহ, কিন্তু এই ক্ষুদ্র দেহ নিয়েই হিমালয় সম উচ্চতায় সে এগিয়ে এসে বলল, “বাবা, আমি আমার দোষ স্বীকার করতে চাই”। বিচারকের আসনে বসা তার বাবা বলল, “তাহলে তুমি স্বীকার করছ যে তুমি রাজাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছ?”

টিরিয়নের দৃষ্টিতে যে লাভার আগুন তা যেন ভয়ঙ্করভাবে হেসে উঠল, সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেবার নির্জলা আক্রোশকে সঙ্গী করে।

“হ্যাঁ, আমি দোষী। এই তো তোমরা শুনতে চাও, তাইনা? আমি দোষী, কিন্তু তা রাজাকে হত্যার অপরাধ নয় বরং তার চাইতে শতগুণ ভয়াবহ এক অপরাধের। আমার অপরাধ হল আমি বামন হয়ে জন্মেছি, তাই আজ আমি এই কাঠগড়ায়।“

“টিরিয়ন, তোমাকে তোমার বামনত্বের জন্যে এখানে আনা হয়নি”- বিচারক মৃদুস্বরে বললেন।

গর্জ্বে উঠলো টিরিয়ন- “তাই? আমি তো জন্মের পর থেকেই স্রেফ বামন হবার জন্যে বিচারের মুখোমুখি হয়ে আসছি!”।

বিচারক বললেন- “তোমার কি আর কিছুই বলার নেই?”

“নাহ নেই, স্রেফ এটুকু বলব- আমি রাজাকে বিষ দিয়ে হত্যা করিনি- কিন্তু আমার প্রচণ্ড ইচ্ছা আমি যদি ওই হত্যাকারীটা হতাম! ওই নৃশংস শয়তানটাকে মরতে দেখে যে শান্তি আমি পেয়েছি তা কয়েক হাজার মিথ্যেবাদী বেশ্যাও আমাকে দিতে পারবেনা” (এই বলে সে তার প্রাক্তন প্রেমিকার দিকে তাকায়, যে পেশায় রূপোপজীবিনী)।

এরপর সে আদালতের সব লোকদের উদ্দেশ্যে বলে- “আমি তোদের মত ফালতু লোকদের বহিঃশত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়েছি, এই শহরটা স্রেফ আমার কারণেই রক্ষা পেয়েছে। আর আজ তোরা বদমায়েশের দল মিথ্যে অজুহাতে আমার বিচার করছিস তাইনা? যদি পারতাম, তোদের সবকটার জন্য বিষের ব্যবস্থা করতাম। তোদেরকে বিষ খেতে দেখার আনন্দের বদলে হাসতে হাসতে আমি আমার জীবন দেব। ইশ! যে দানব হিসেবে আমাকে তোরা কল্পনা করিস, আমি যদি সেই দানবটা সত্যি সত্যি হতাম!”

“আমি যে ন্যায়বিচার চাই- খুব ভালভাবে জানি এই প্রহসনের বিচার ব্যবস্থা আমাকে তা দেবেনা। আমি আমার ভাগ্য সঁপে দিচ্ছি দেবতাদের হাতে-যুদ্ধের মাধ্যমেই আমার ভাগ্য নির্ধারিত হোক”।

অপরাধীর পক্ষে একজন এবং বিচারের পক্ষে একজন এরকম দুজন যোদ্ধার লড়াইয়ে যে জেতে বিচারের ফল তার পক্ষে যায়-এটাই হচ্ছে ট্রায়াল বাই কমব্যাট বা যুদ্ধের মাধ্যমে বিচার। সেই বিচারে টিরিয়নের ভাগ্যে কি হয়, তা জানতে হলে দেখতে হবে গেম অফ থ্রোন্স সিরিজটি।

একই সাথে আটলান্টিক সাগরের গভীরতা, হিমালয়ের উচ্চতা, সুমেরুর তুষারের হিম আর ভিসুভিয়াসের লাভা- এই সবগুলোকে এক করলে যে অদ্ভুত, বীভৎস রক্তহিম করা ধ্বংসের উৎপত্তি হবে- সেই ধ্বংস সাধন করার সমপরিমাণ ক্ষোভ, ঘৃণা আর রাগের পুরো বিষ আমরা দেখতে পাই এই দৃশ্যে, যে বিষের তুলনা চলে সমুদ্র মন্থনের সময় উঠে আসা হলাহলের সাথে- যা পান করে শিব হয়েছিলেন নীলকণ্ঠ।

এই দৃশ্যটি কেন আমার সবচাইতে প্রিয়?

প্রথমত, অভিনেতা পিটার ডিঙ্কলেজ এই দৃশ্যে সম্ভবত তাঁর বাস্তব জীবনের সমস্ত রাগ-ক্ষোভ-প্রতিবাদ ঢেলে দিয়েছেন। শুধু স্ক্রিপ্ট পড়ে আর অনুশীলন করে এই জিনিস হয় না, এরকম একটা পারফরম্যান্স বের করতে হলে নিজের অস্তিত্বের ভেতর থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনতে হয় তীব্র প্রতিবাদ- মঞ্চ আর জীবন যে প্রতিবাদে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, এই দৃশ্যটির সর্বজনীন আবেদন। ভুলে যান টিরিয়নকে। বিচারকদের মনে করুন সমাজপতি, আদালতে বসা লোকগুলোকে ধরে নিন আমাদের নপুংশক সমাজ, আর টিরিয়নের জায়গায় কল্পনা করুন অবদমনের শিকার যে কোনও মানুষকে- সে হতে পারে দরিদ্র, বিকলাঙ্গ, তৃতীয় লিঙ্গ এমনকি নারীও। প্রাতিষ্ঠানিক অবিচারের শিকার যে কোনো সত্তা এই দৃশ্যটির সাথে নিজের জীবনকে মেলাতে পারবেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে টিরিয়নের জায়গায় একজন নারীকে বসিয়ে দেখুন, খাপে খাপে মিলে যাবে। দুর্বৃত্তদের সমাজে একজন সৎ মানুষকে কল্পনা করুন, মনে হবে টিরিয়নের প্রতিবাদ যেন তারই গলা থেকে বেরুচ্ছে।

রূপকার্থে ধরলে, টিরিয়ন ল্যানিস্টারের এই অবিস্মরণীয় বক্তৃতাটি পৃথিবীর সব বঞ্চিত, শোষিত, পদদলিত মানুষের প্রতিবাদের বজ্রনিনাদ, পড়ে পড়ে মার খেতে খেতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের সামনে এগুনোর প্রথম পদক্ষেপ।

আর কী চাই এরকম অসামান্য একটা দৃশ্য দেখতে পারলে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button