ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

বোরকা পরার আগে কি তাহলে গোলাম রাব্বানির কাছে চারিত্রিক সনদ নিতে হবে?

বেশ অনেক দিন  আগের কথা। একটা অনুষ্ঠানে বাবার সঙ্গে মঞ্চে উঠেছিলেন অস্কারজয়ী ভারতীয় সঙ্গীত পরিচালক এ আর রেহমানের মেয়ে খাতিজা। স্ল্যামডগ মিলিওনিয়ার সিনেমার জন্যে অস্কার জয়ের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ আর রেহমানের সম্মানে আয়োজন করা হয়েছিল এই অনুষ্ঠান, আর সেখানেই বাবার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন খাতিজা, অনেকটা ইন্টারভিউ টাইপের একটা সেশন ছিল সেটা। তখন তার পরনে ছিল পুরো শরীর ঢেকে রাখা একটা শাড়ি, এমনকি মুখটাও ঢাকা ছিল হিজাব এবং নেকাব দিয়ে। আর সেই পোষাকের কারণেই পরে বিচ্ছিরিভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল করা হয়েছে তাকে, এমনকি বাবা এ আর রেহমানকেও ছেড়ে কথা বলেনি অনেকে।

ট্রলকারীদের বক্তব্য ছিল, খাতিজার এই পোষাক নারী স্বাধীনতার অন্তরায়। কেউ কেউ তো আগ বাড়িয়ে এর পেছনে এ আর রেহমানকেও দায়ী করে ফেলেছেন! তিনিই নাকি নিজের মেয়েকে স্বাধীনভাবে চলতে দিচ্ছেন না, পর্দার আড়ালে নিজেকে ঢেকে রাখতে বাধ্য করছেন খাতিজাকে! আবার কেউ তো সরাসরি এ আর রেহমানকে হিপোক্রেট বলেও গালি দিয়েছেন! নিজে সিনেমায় গান-বাজনা নিয়ে কাজ করছেন, অথচ পরিবারের সদস্যদের চেহারাটাও প্রকাশ হতে দিচ্ছেন না!

এ আর রেহমান জবাব দিয়েছিলেন, পরিবারের কোন সদস্য কি পোষাক পরবেন, সেটা তিনি বা অন্য কেউ ঠিক করে দেন না। খাতিজার পছন্দ সে বোরখা পরবে, খাতিজার মায়ের পছন্দ তিনি বোরখা পরবেন না, এটা পুরোপুরিই ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়, এখানে পরিবারের কেউ হস্তক্ষেপ করেন না, করা উচিতও নয়। সেইসঙ্গে ট্রোলকারীদের এটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, পরিবারের কেউ যখন খাতিজার পোষাক নিয়ে নাক গলাচ্ছেন না, তখন বাইরের কারো এসব নিয়ে মন্তব্য করার অধিকারই নেই। তবে রামগড়ুরের ছানারা সেসব কথা শুনলে তো!

এ আর রেহমান বলেছেন, ‘এই লোকগুলো (ট্রল যারা করছে) আমাকে একটু বেশিই ভালোবাসে। তারা ভাবে, আমরা বুঝি ওদেরই পরিবারের লোক, তাই এত খেয়াল রাখে। আমরা কি পরছি, কি খাচ্ছি, সবকিছু নিয়েই ওদের ভীষণ চিন্তা। একারণেই বোধহয় ওরা এসব বলে। আমার স্ত্রী এবং ছোট মেয়ে রাহিমা নেকাব পরে না, সেটা ওদের পছন্দ। এখানে বাম হাত ঢোকানোর তো কিছু নেই। আবার খাতিজা নিজেকে ঢেকে রাখতে পছন্দ করে, সেটা ওর সিদ্ধান্ত। সেখানে আমরা বাধা দেয়ার কে?’

এই সামান্য সাধারণ জ্ঞ্যানটাই অনেক অসাধারণ মানবিক বোধসম্পন্ন লোকেরা বুঝে না। বোরকা পড়া, হিজাব পড়া ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এখানে তুমি আমি আপনি বাঁধা দেয়ার কে? বাংলাদেশও ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র, এখানে সবার ধর্মের স্বাধীনতা আছে, পোষাক পরিধানের স্বাধীনতা আছে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই। কেউ জিন্স প্যান্ট পড়বে, কেউ সালোয়ার কামিজ পড়বে, কেউ শাড়ি পড়বে, কেউ হিজাব পড়বে এটা যার যার ব্যাপার। কেউ জিন্স পরলেই ফতুয়া পরলেই তাকে গাঁজাখোর, বামপন্থী বলে ধরে নিতে হবে কেন? কেউ হিজাব পরলে ,  বোরকা পড়লেই তাকে কেন শিবির, মৌলবাদী এসব বলে ভাবতে হবে?

গোলাম রাব্বানি

ডাকসু নির্বাচনের ডামাডোলে এখনো উত্তেজনা বিরাজমান। অনিয়মের অভিযোগ এনে অনেকেই প্রতিবাদ করছে। রোকেয়া হলের কয়েকজন তরুণীও অনশন করছেন। গতকাল মধ্যরাতে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী সেখান যান এবং অনশনকারীদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বোধহয় ভুলে গেছেন তিনি এখন ডাকসুর জিএস। তাকে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধির মতো আচরণ করতে হবে। কিন্তু, তিনি প্রক্টরকে ফোন দিয়ে বললেন এই অনশনরতদের ক্যাম্পাস থেকে ‘খোদা হাফেজ’ করে দিতে, বহিষ্কার করে দিতে।

এরপর তিনি সেখানে থাকা বোরকা পরিহিতদের দেখে তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, এরা কারা? এরা কি শিবিরের ছাত্রী সংস্থার নাকি! বোরকা পড়া মেয়ে দেখলেই কেন রাব্বানির শিবিরের কথাই আগে মাথায় আসে? তিনি মধ্যরাতে এভাবে নারীদেরকে অপমান করতে কেন গেলেন সেখানে? বোরকা পরলে যদি শিবির হয়, ছাত্রী সংস্থা হয় তাহলে রাব্বানি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করতে পারেন, বোরকা নিষিদ্ধ যেন করে দেওয়া হয়।

গোলাম রাব্বানি

যেহেতু এখনো বোরকা, শাড়ি, জিন্স, ফতুয়া কোনো কিছু নিষিদ্ধ নয় তাই সব কিছুই পরার স্বাধীনতা আছে নারীর। পোষাক দিয়ে নারীকে বিবেচনা না করতে অনুরোধ করব গোলাম রাব্বানিকে। বোরকা পরার আগে নিশ্চয়ই কেউ এসে আপনার কাছে অনুমতি নিবে না। বোরকা পরার কারণে আপনি কাউকে মানহানিও নিশ্চয়ই করতে পারেন না। যার যা খুশি সে সেটা পরবে, বিকিনি বা হিজাব বোরকা, শাড়ি সবই মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ। পোষাকে লেখা থাকে না কে ছাত্রলীগ, কে শিবির, কে সাধু, কে ভন্ড। তাই, পোষাক দেখে কাউকে ট্যাগ দেয়ার এই অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসুন।  কাউকে শুধু পোষাকের কারণে এভাবে অপমান করার কাজে আপনাকে মানায় না…   

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button