Uncategorized

টয়লেটে পাওয়া পরিত্যক্ত শিশু ‘গহীন’: আইন কি বলছে?

সাঈদ আহসান খালিদ

চার দিন বয়সের এই ফুটফুটে কন্যা শিশুটি-কে ঢাকার শিশু হাসপাতালের টয়লেট থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। কোন জন্মদাত্রী মা এই নবজাতক-কে এখানে ফেলে গেছে। এই পরিত্যক্ত শিশুটির উদ্ধারে এগিয়ে আসেন এক নি:সন্তান দম্পতি- ঐ শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার রাসেল মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রী পলি বেগম। জন্মদাত্রী মা’র বদলে শিশুটির ঠাঁই হয় মায়ের মমতা ধারণ করা পলি বেগমের বুকে। হাসপাতালে তিনিই শিশুটি-কে পরম যত্নে বুকে আগলে রাখেন, সুস্থ করে তোলেন। তিনি এই অনামিকা কন্যাটির নাম দেন- ‘গহীন’। তিনি শিশুটি-কে স্থায়ীভাবে দত্তক নিতে চান। কিন্তু বাংলাদেশের আইন সেটি সমর্থন করে না। কুড়িয়ে পাওয়া কোন শিশু-কে এভাবে সরাসরি নিজের হেফাজতে নেওয়া যায় না। তাই আইনানুগ প্রক্রিয়ায় শিশু ‘গহীন’কে আজিমপুরে অবস্থিত সমাজসেবা অধিদফতরের আওতাধীন ‘ছোটমনি নিবাস’-এ স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ পলি বেগম কিছুতেই শিশুটি-কে কোলছাড়া করতে রাজি নন। টেলিভিশনের খবরে তাঁর আর্তনাদ আর কান্না হৃদয় বিদীর্ণ করে দিচ্ছিলো। বাধ্য হয়ে তাঁকেসহ শিশুটি-কে ছোটমনি নিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়।

পলি বেগম কি শিশু গহীন-কে চূড়ান্তভাবে পাবে? তার আগে চলুন জেনে আসি সংশ্লিষ্ট কিছু প্রশ্নের উত্তর-

শিশু পরিত্যাগ করা কি বেআইনি?

মা-বাবা কিংবা অন্য যে কোন ব্যক্তি কর্তৃক কোন শিশু-কে ডাস্টবিন, টয়লেট বা অন্য কোথাও অরক্ষিত অবস্থায় বর্জন বা পরিত্যাগ করা ‘শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে গণ্য এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। ২০১৩ সালের শিশু আইনের ৭০ ধারা অনুযায়ী- যদি কোনো ব্যক্তি তার হেফাজতে, দায়িত্বে বা পরিচর্যায় থাকা কোনো শিশুকে বর্জন ও অরক্ষিত অবস্থায় পরিত্যাগ করে, আর তা প্রমাণিত হয় তাহলে তিনি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এমনকি মায়ের গর্ভস্থিত শিশু-কেও ইচ্ছেকৃতভাবে ফেলে দেওয়া বা Miscarriage করা বাংলাদেশের ১৮৬০ সালের দণ্ডিবিধির ৩১২ ধারানুসারে দণ্ডনীয় অপরাধ। দণ্ডবিধির ৩১৫ ধারানুযায়ী- বাচ্চা জন্মানোর আগে কোন ব্যক্তি যদি এমন উদ্দেশ্যে কোন কাজ করে যাতে বাচ্চাটি জীবিত জন্মলাভ না করে বা জন্মের পর মৃত্যুবরণ করে তাহলে উক্ত কাজের জন্য সেই ব্যক্তি ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

পরিত্যক্ত শিশুরা কার হেফাজতে থাকবে?

কুড়িয়ে পাওয়া বা উদ্ধার হওয়া শিশু সরাসরি কারো ব্যক্তিগত হেফাজতে নেওয়ার আইনত সুযোগ নেই। আইনানুগ প্রক্রিয়া ছাড়া পরিত্যক্ত শিশু-কে কেউ গ্রহণ করলে শিশু অপহরণ ও পাচারের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার আশংকা থাকবে। শিশু আইন, ২০১৩ এর ৮৫ ধারানুযায়ী- সুবিধাবঞ্চিত ও পরিত্যক্ত শিশু-কে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নিম্নোক্ত যে কোন প্রতিষ্ঠানের হেফাজতে প্রদান করা হবে-

(ক) সরকারি শিশু পরিবার;
(খ) ছোটমণি নিবাস;
(গ) দুঃস্থ শিশুদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র;
(ঘ) সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র; এবং
(ঙ) সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।

পরিত্যক্ত শিশু-কে আইনানুগভাবে দত্তক নেওয়া যাবে কি?

বাংলাদেশে কোন শিশু-কে দত্তক (Adoption) নেওয়ার জন্য কোন বিধিবদ্ধ আইন নেই। বাংলাদেশে কোন স্বতন্ত্র দত্তক কর্তৃপক্ষও নেই। প্রচলিত মুসলিম আইনে দত্তক সন্তানের কোন আইনি স্বীকৃতি নেই, খৃষ্টান আইনেও একই নিয়ম। শুধু হিন্দু ধর্মের আইনে পুত্র সন্তান-কে দত্তক নেওয়ার সুযোগ আছে।

কোন সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কে দত্তক নেওয়ার আইনি সুযোগ না থাকলেও তত্ত্বাবধান করার জন্য সেই শিশুর ‘অভিভাবকত্ব’ (Guardianship) নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ১৮৭৫ সালের মাইনরিটি অ্যাক্টের ৩ ধারা অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর জন্য ১৮৯০ সালের অভিভাবকত্ব ও পোষ্য (গার্ডিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্ডস) আইনের ৭ ধারায় জিম্মায় নিতে হলে ১৯৮৫ সালের ফ্যামিলি কোর্ট অর্ডিন্যান্সের এখতিয়ারভুক্ত পারিবারিক আদালতে আবেদন করা যাবে।

আদালত আগ্রহী পরিবারটির পারিবারিক বন্ধন কেমন, তাদের আয় রোজগার, থাকার পরিবেশ, বাবা মা নি:সন্তান দাবি করে থাকলে সেটা সত্য কিনা- এসব তথ্য খতিয়ে দেখে যোগ্য পরিবারের কাছে শিশুটির আইনগত অভিভাবকত্ব প্রদান করতে পারেন।

দত্তক নেওয়া আর অভিভাবকত্ব কি এক?

না, মোটেই এক নয়।

দত্তক সন্তান প্রকৃত সন্তানের মতোই সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করে। পূর্বেই উল্লেখ হয়েছে- বাংলাদেশের মুসলিম ও খৃষ্টান আইনে দত্তক গ্রহণের অনুমতি নেই, তবে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সরকারের নিরাপদ হেফাজতে থাকা কোন অনাথ, পরিত্যক্ত বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুর দায়ভার গ্রহণের আবেদন করতে পারেন অভিভাবক হিসেবে। মনে রাখতে হবে- আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিভাবকত্ব পেলেও সেই পালক সন্তান উত্তরাধিকার সূত্রে কিন্তু পালক নেয়া বাবা-মায়ের কোন সম্পত্তি পাবে না। তবে তারা ইচ্ছে করলে পালক সন্তানকে তাদের জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান করে দিতে পারেন। সন্তানের মতো লালন পালন করলেও ঐ শিশুটি অভিভাবকের নাম বাবা-মা’র নাম হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।

এছাড়া কোন বিদেশি নাগরিকের বাংলাদেশী কোন শিশুর অভিভাবকত্ব গ্রহণের আইনি সুযোগ নেই।

প্রকৃত বাবা- মা যদি অভিভাবকের কাছে সন্তান ফেরত চায়?

আদালতের মাধ্যমে কোন শিশুর অভিভাবকত্ব একবার কাউকে প্রদান করা হয়ে গেলে সেই শিশুটির প্রকৃত পিতা-মাতাও সরাসরি আইনগত অভিভাবকের কাছ থেকে সন্তান-কে ফেরত প্রদানের দাবি করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে তাদের-কে নিজ সন্তানের কাস্টোডি নিতে আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে।

দত্তক আইনের সংস্কার কি দরকার?

দেশে নি:সন্তান ও বন্ধ্যা দম্পত্তির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, একইসাথে বাড়ছে পরিত্যক্ত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যাও। সরকারি শিশু নিবাসের চাইতে দত্তক নেওয়া পিতা-মাতার আদরে যদি কোন শিশু বেড়ে উঠে- সেটি তাঁর দৈহিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের জন্য উত্তম। কিন্তু দত্তক আইনের অনুপস্থিতিতে এই সংযোগ স্থাপন সম্ভব হচ্ছে না।

অভিভাবকত্ব গ্রহণের ব্যাপারটিও আইনি জটিলতাপূর্ণ, আদালতের হস্তক্ষেপ দরকার হয় এবং অভিভাবকের জিম্মায় থাকা সন্তান উত্তরাধিকার থেকেও বঞ্চিত। তাই পৃথক দত্তক আইন প্রণয়নের দাবি প্রাসঙ্গিক ও জোরদার হয়ে উঠেছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ আইন কমিশন থেকে পৃথক একটি দত্তক আইন প্রণয়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে কিন্তু সেটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

আলোচ্য ঘটনায় পলি বেগম পরিত্যক্ত শিশু ‘গহীন’ এর অভিভাবকত্ব পাবে কিনা সেটি অনিশ্চিত। আরো শত শত মানুষ এই শিশুটির অভিভাবকত্ব গ্রহণের আবেদন জানিয়েছে। আদালতই এখন সিদ্ধান্ত দেবেন- কে নেবে গহীন- এর লালনপালনের দায়ভার! আমার ব্যক্তিগত চাওয়া- চোখের জলে বুক ভাসানো মমতাময়ী পলি বেগমের কোলেই শিশুটির ঠাঁই হোক।

জন্মদাত্রী মা তাঁর নাড়িছেঁড়া ধন শিশুটি-কে টয়লেটে অবহেলায় ফেলে গেছে। অন্যদিকে গর্ভধারণ না করা আরেক নারী সেই পরিত্যক্ত শিশুটির মা হওয়ার জন্য অশ্রু ফেলছেন, আইনের যুদ্ধে নেমেছেন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button