রিডিং রুমলেখালেখি

ডি ক্যাপ্রিও অস্কারমঞ্চে কেন এই কথাটি বলেছিলেন?

টাইটানিকের প্রেমিকপুরুষ জ্যাক ডসন নামের অতিমানবীয় লেভেলের অভিনেতার নাম- লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও। মুভি ক্রিটিক কিংবা সাধারন দর্শকদের বিচারে ভাবা হত, তিনি সবচেয়ে হতভাগ্য অভিনেতা। অস্কার হাতে উঠবে উঠবে করেও প্রতিবারই আরেকজনের হাতে উঠে যেত। একসময় ধারণা করা হলো- তিনি অস্কার পাবেন না। তিনি দুর্ভাগা নন। অস্কার নিজেই দূর্ভাগা ট্রফি যে লিওনার্দোর হাতে উঠতে পারেনি।

দ্যা র‍্যাভেনেন্ট নামের একটা মুভি আসল। আলেজান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু নামের এক ভদ্রলোকের মুভিতে অতিমানবীয় অভিনয়ের কারণে অস্কার উঠে আসল জ্যাক ডসনের হাতে। সিনেমা ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ আবেগীয় কোলাবেরশন সম্ভবত সেদিন হলো। লিওর হাতে অস্কার। অস্কার লিওর হাতে। অসাধারণ মুহুর্ত। স্বাভাবিকভাবেই এমন মুহুর্তে মানুষের কান্নাকাটি করার কথা। অস্থির হয়ে মুখের ভাষা ভুলে যাবার কথা। স্ক্রিপ্ট হাতে নিয়ে গলা কাঁপাতে কাঁপাতে বলার কথা- বেস্ট নাইট ইন মাই লাইফ।

লিও কিছু বলল না। শান্তভাবে ডায়াসের দিকে এগিয়ে গেল। মাইক্রোফোনের সামনে স্পষ্ট গলায় বলল, গ্লোবাল ওয়ার্মিং ইজ রিয়েল। এই বাক্যের মানে কী? পৃথিবীর তাপমাত্রা দিনদিন বাড়ছে, তাতে একজন অভিনেতার কী হয়েছে? তাকে ইয়ট ভাড়া নিয়ে প্রায়ই ললনাদের বাহুবদ্ধ হয়ে সমুদ্রে অবকাশ যাপন করতে দেখা যায়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়লে তার কী?

বাংলাদেশ। পৃথিবীর মানচিত্রে এক ছোট্ট দেশ। বে অফ বেঙ্গলের তীরে ছোট্ট স্থলভূমি। তাপমাত্রা নাতিশীতোষ্ণ। গরমও নয় ঠান্ডা নয়। সেই দেশে জালের মতো নদী আছে, বিছানার মতো সবুজ বন আছে। সেই দেশের মানুষের নিশ্চয়ই লিওর মতো এমন ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানো উচিৎ নয়। তাহলে কেন এই আর্টিকেলের জন্ম?

আজকাল তাপমাত্রা চরমে। সবকিছু অসহ্য। নদী আর সবুজের বাংলাদেশে তো এমন হবার কথা ছিল না। স্কুলে পড়ে আসা নাতিশীতোষ্ণ শব্দটা কেন এমন হল? চীন সবচেয়ে বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরি করে। কোরিয়া পারমানবিক পরীক্ষা চালাচ্ছে। রাশিয়ায় চুল্লি চলছে। সিরিয়ায় যুদ্ধ চলছে। তাহলে বাংলাদেশে কেন তাপমাত্রা বাড়বে?

কারণ- বাংলাদেশ আলাদা করে সৃষ্টি হয়নি। যেদিন আমেরিকা-ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়া তৈরি হয়েছে, সেদিনই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। যেদিন কাঁটাতার ছিল না, রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রপতিরা ছিল না, সেদিন ইউরোপ থেকে হেঁটে রওয়ানা দিলে যেকেউ বাংলাদেশের উপর দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পৌছাতে পারত। বাংলাদেশ থেকে হেঁটে রওয়ানা দিলে রাশিয়া আলাস্কা হয়ে আমেরিকাতেও চলে যেতে পারত। স্থল ছিল অনেক বেশি। পানি ছিল কম। এখন কোথা থেকে পানি এসে, সেই রাস্তাগুলো ডুবলো কীভাবে?

পৃথিবী সৃষ্টির পর দীর্ঘকাল ছিল উত্তপ্ত। এরপর হলো শীতল। শুরু হল বরফযুগ। পরপর অনেকগুলো বরফযুগ চলে গেছে পৃথিবীর উপর দিয়ে। তখন বিশাল সংখ্যক জল গ্লেসিয়ার (বরফ) হয়ে জমে গেছে পৃথিবীর নানা অঞ্চলে। গ্রীনল্যান্ডে তো পুরোটাই গ্লেসিয়ার। এন্টার্কটিকা পুরোটা গ্লেসিয়ার। বরফযুগ শেষে পৃথিবীর তাপমাত্রা সহনীয় হল। পৃথিবীর মানুষ ধীরেধীরে বসত গড়ল। গ্রাম শহর গড়ল। সভ্য হল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে শুরু হল ইন্ড্রাস্ত্রিয়াল রিভোলিউশন। শিল্পবিপ্লব।

ফসিলাইজড ফুয়েল (নন-রিনিউয়েবল) পুড়ে চালানো হলো কারখানা-মেশিন। মেশিনে ধোঁয়া হল। ধোঁয়ায় কার্বন ডাই অক্সাইড, বাষ্প (H2O Vapor), নাইট্রাস অক্সাইড, সিএফসি ছড়িয়ে গেল বায়ুমণ্ডলে। এদের নাম কী? এই গ্যাসগুলোর নাম-গ্রীনহাউস গ্যাস।

গ্রীনহাউস গ্যাস বাড়ার কারণে এরপর কী হলো? আমরা যে বায়ুমণ্ডলে নিঃশ্বাস নিই, সেই বায়ুমণ্ডল উপরে উঠতে উঠতে একটা সময় থেমে গেছে। থেমে যাবার সীমানার নাম ট্রপোস্ফেয়ার। সীমানাটাকে ধরা যাক- পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের একটা কম্বল। যে আমাদের বায়ুমন্ডলকে জড়িয়ে আছে। যার জন্য পৃথিবীর তাপমাত্রা খুব কমেও না, খুব বাড়েও না।
এই কম্বল কী দিয়ে তৈরি? উপরে যে গ্রীনহাউস গ্যাসগুলোর নাম বললাম, সেগুলো দিয়ে তৈরি। এরা একত্রে কম্বল তৈরি করে। যদি কারখানায় খুব বেশি ফসিল ফুয়েল (কয়লা, গ্যাস, তেল) পোড়ানো হয়, ঐ গ্যাসগুলো বেশি বেশি তৈরি হবে। বেশি গ্যাস পৌছে যাবে ট্রপোস্ফেয়ারে। আগে এরা একটা পাতলা কম্বল তৈরি করেছিল, এখন তৈরি হবে ভারী কম্বল। ভারী কম্বল হলে অসুবিধা কী?

ধরা যাক, সূর্য থেকে আলো আসছে পৃথিবীর মাটিতে। পৃথিবী তার প্রয়োজন মেটায়। গাছ সালোকসংশ্লেষণ করে ফল-ফুল-লতা-পাতা-খাবার দেয়। প্রাণীরা ভিটামিন-ডি তৈরি করে। নানাবিধ ব্যাপার ঘটিয়ে এই আলো দিয়ে পৃথিবী টিকে থাকে।
আলোকে কাজে লাগানো শেষে সেটা তাপে রূপান্তর হয়। এই তাপ পৃথিবীতে আটকে রাখা যাবে না। তাকে মহাশূন্যে পাঠিয়ে দিতে হবে। নইলে পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে যাবে।

তাপ বিকিরিত হয়ে উপরে উঠতে থাকে। এর কিছু অংশ কম্বল ভেদ করে চলে যায়। যদি সবটা চলে যেত (কম্বল অনেক পাতলা হলে) পৃথিবী শীতল হয়ে যেত। আবার বরফ যুগ চলে আসত। তুষার আর বরফে পুরো পৃথিবীর জীবজগৎ বিলীন হয়ে যেত। কিন্তু পাতলা কম্বল পুরো তাপ আটকায় না। আবার সব বের হতেও দেয় না। ফলে পৃথিবীতে মোটামুটি একটা স্ট্যাবল তাপমাত্রা বিরাজ করে। কিন্তু কম্বল (গ্রীনহাউস গ্যাস) যদি পুরু হয়, সেই তাপ আর ফিরে যেতে পারে না। ফলে পৃথিবীতে তাপ আটকে পৃথিবী ধীরেধীরে গরম হতে শুরু করবে। কেউ যদি গ্রীষ্মকালে কম্বল গায়ে দিয়ে রোদে শুয়ে থাকে, তাকে বাঁচানো যাবে?

তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে কী ঘটবে? পৃথিবীতে গ্লেসিয়ার হিসেবে জমে থাকা বরফগুলো গলে যাবে। অতিরিক্ত পানি সমুদ্রে চলে যাবে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়তে থাকবে। ধীরে ধীরে সমুদ্রনিকটবর্তী স্থলের দেশগুলো ডুবে যেতে থাকবে। (নিচের ছবিতে নিউইয়র্কের ছবি দিয়েছি। দুটো লাল সীমানা। বাইরেরটা আগে স্থল ছিল। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় সেই অংশটা এখন ডুবে গেছে। স্থল কমে ভেতরে প্রবেশ করছে)

সমুদ্রের পর ‘পরিবেশ’। ঝড়, বজ্রপাত বাড়বে। বন্যা হবে অসময়ে। জল উঠবে বিপদসীমার উপরে। কয়েক বছর ধরে আমরা তো নিজে দেখছি ব্যাপারটা। ইজ নট ইট রিয়েল?

শুধু পানি নয়, খরা হবে দীর্ঘমেয়াদী। ঋতুর প্যাটার্ন বদলে যাবে। অসময়ের বন্যার মতো, অসময়ে গরম, অসময়ে শীত নামবে। যাদের বয়স বিশের বেশি, তারাও জানেন, আজ থেকে দশ বছর আগেও বাংলাদেশের ঋতু ঠিকঠাক সময়ে আসত। এত গরম ছিল না। এখন? গ্রীষ্ম ঢুকে আছে বর্ষার পেটে। বর্ষা চলে শীতকাল পর্যন্ত। শরৎ হেমন্ত আলাদা করাই যায় না। ঋতু বদলে গেলে ফুল-ফল-ফসল ঠিকঠাক হবে না। দেখা দিবে খাদ্যে ঘাটতি। স্বাস্থ্যের কথা আর কী বলি! ক্যান্সার-হার্ট ডিজিস-ফুসফুসের রোগগুলো আগের চেয়ে বাড়েনি? আগামী দশ বছর পর কী ঘটবে ভাবতে পারেন?

লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও কেন অস্কারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং ইজ রিয়েল’ বলেছিল, এখন স্পষ্ট হচ্ছে? আপনি আমি কী করতে পারি?

গন সচেতনতা শুরু করতে হবে প্রথমে। সবাইকে বিষয়তা জানাতে হবে। এরপর? গভমেন্ট লেভেল থেকে আসতে হবে ইনিশিয়েটিভ। এরপর? ভুটানের দিকে তাকাতে হবে। বিদ্যুৎ আসবে পানি থেকে, বাতাস থেকে। কয়লা-পারমানবিক ইলেকট্রিসিটি পরিবেশের জন্য ভয়ানক খারাপ। পেট্রোল ডিজেলের গাড়ি ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলতে হবে। তারা প্রচুর পরিমাণে গ্রীন হাউস গ্যাস তৈরি করে। ভুটান ভ্যালির পানি থেকে বিদ্যুৎ বানায়। সেই বিদ্যুৎ নিজেরা ভোগ করে। অতিরিক্ত অংশ ভারতে বিক্রি করে। তেলের গাড়ি কমিয়ে ইলেক্ট্রিক গাড়ি নামাচ্ছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ কমাতে স্ট্রিট লাইট পর্যন্ত তুলে ফেলেছে (থিম্পু ছাড়া)। ভুটান পারলে আমরা কেন পারব না?

সিংগাপুরের দিকে তাকালেই ক্লিয়ার হবে পলি আর প্লাস্টিক কীভাবে রিসাইকেল করে। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তারা সেগুলোকে ইনসিনারেট করে ফেলে চুল্লিতে। সেখানে তাপ থেকে উৎপন্ন করে বিদ্যুৎ। ছাইগুলোকে দূরে লেকে পুতে ফেলে। চুল্লির যে ধোয়াটা বের হয় সেটাকে তারা এমনভাবে ফিল্টার করে, যখন বায়ুমন্ডলে ফিরে যায় সেটা আর ক্ষতিকর থাকে না।

আর কী করতে পারি? আপনি ঘরে বসে কীভাবে পৃথিবীকে প্রটেক্ট করবেন?

ওকে… পলিব্যাগ, প্লাস্টিকের বোতলটা যেখানে সেখানে ফেলব না। ট্যুরে বীচে- পাহাড়ে গেলেও চেষ্টা করব ব্যাগে ভরে সেটাকে ফিরিয়ে আনতে। কারণ এই বোতলটা আপনি আজ ফেলে আসবেন। সেটা পচতে সময় নিবে ৫ হাজার বছর। ক্যান ইউ ইমাজিন? চিপসের যে প্যাকেটটা কাজে লাগে না, কাপড়ের মতো সেটাও রাখব ব্যাগে। ফিরে এনে ডাস্টবিনে ফেলব।

আর? ম্যাজিক্যাল উপায় কী? যেটা আমরা ঘরে বসেই করতে পারি! গাছ লাগান। ট্রাস্ট মি… এই পৃথিবীটা এখনো টিকে আছে কারণ- গাছ আছে, গাছের বন আছে। তাপমাত্রা কমাবেন? গাছ লাগান। গাছ অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নিবে। ট্রপোস্ফেয়ারে গ্রীনহাউস গ্যাসগুলো কম জমবে। তাপমাত্রা বাড়বে না। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এক ধাক্কায় কমিয়ে ফেলবে।
আমাদের এই ছোট্ট পৃথিবীটা সুস্থ থাকবে…টিকে থাকবে… 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button