অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

‘লিটল এম্পেরর’- চীনের ‘দানব শিশু’ প্রজন্মের গল্প!

অনেক জনসংখ্যার একটা অত্যাধুনিক সুবিশাল শহরের কথা ভাবুন তো। যেখানে আধুনিক শহরের সবকিছুই আছে। আকাশছোঁয়া সব দালান, প্রশস্ত আর ঝকঝকে রাস্তাঘাট, বিশ্বখ্যাত চেইনগুলোর বড় বড় সব আউটলেট সেখানে আছে। রাতের বেলা আলো ঝলমল করতে থাকে। শহর ঘুমায় না এক মুহূর্তের জন্যেও! যেমনটা আমরা ভেবে থাকি আর কি!

এতক্ষণ যা বলা হল এসবের সাথে যদি আরেকটা অবস্থা যোগ করি। যদি বলি, এমন অনেক শহর আছে এই যেখানের সব কিশোর-তরুণ বয়সী ছেলেমেয়েরাই তাদের বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান! তাদের কোন ভাই-বোন নেই। তখন নিশ্চয়ই খানিকটা ভ্রু কুঁচকে তাকাবেন। বলেও বসতে পারেন “ধুর, এমনটা আবার হয় নাকি?” এসব কথাকে মনে করবেন না যেন এটা কোন ডিস্টোপিয়ান সময়ের কথা, যেমনটা ছিল এল্ডস হাক্সলির ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’ উপন্যাসে। ঐ উপন্যাসে এমন একটা দুনিয়ার গল্প ছিল যেখানে সবগুলি জন্মই পরিকল্পিত আর নিয়ন্ত্রিত। কোথাও কোন ‘অপ্রয়োজনীয়’ মানুষ নেই। যে শহরের কথা বলছি এমন শহর আসলে একটা দুটো না, পুরো চীনজুড়েই সবগুলো শহরই আসলে এমন।

৭০ এর দশকের যে সময়টায় কোল্ড ওয়ার একেবারে মধ্যগগনে, নাসা আর চাঁদে মানুষ পাঠাবে না বলে ঠিক করল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুটি দেশে যুদ্ধ শেষ হল এবং দক্ষিণ এশিয়ার নবীনতম দেশে স্বৈরশাসন শুরু হল, ঠিক তখন চীনদেশের মানুষ মুখোমুখি হয় এক তিতকুটে বাস্তবতার। সেটা হচ্ছে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ! সত্তরের একেবারে শেষে এসে যখন চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি তখন চীন সরকার সে দেশের দম্পতিদের সন্তান সংখ্যাটা একেবারে আইন করে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। ১৯৭৯ সালে চীন সরকার ‘ওয়ান চাইল্ড পলিসি’ নামে এক বিল পাশ করে, যেখানে বলা হয় চীনের কোন শহুরে দম্পতি এক সন্তানের বেশি নিতে পারবে না। কৃষিনির্ভর গ্রামাঞ্চলে এই আইন এতটা কড়াকড়ি ছিল না যদিও, কিছু কিছু প্রদেশেও আইনটি খানিকটা শিথিল ছিল (যেমন তিব্বতের দম্পতিরা নিজেদের ইচ্ছাতেই সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারত)। তারপরেও চীনের প্রায় সব শহরে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বড় সব শহরের সব দম্পতিরা ছিল এই আইনের শক্ত অধীনে।

বিশেষ কিছু বিবেচনায়, যেমন ধরুন প্রথম সন্তান কোন কারণে মারা গেলে কিংবা সন্তান যদি শারীরিক বা মানসিকভাবে পিছিয়ে থাকে, অথবা কৃষিনির্ভর কিছু অঞ্চলে প্রথম সন্তান মেয়ে হলে সেইসব দম্পতি দ্বিতীয় সন্তান গ্রহণের সুযোগ পেত। তবে এ সুযোগও যে এমনি এমনি পেয়ে যেত তা কিন্তু না, রীতিমত আবেদন করে এই অনুমতি নিতে হত। আর এই আইন অমান্য করলে, অর্থাৎ কোন দম্পতি যদি এসব কারণ ছাড়াই দ্বিতীয়বার সন্তান নিত তাহলে দম্পতির উভয়ের জন্যই শাস্তি হিসেবে ছিল চাকরিচ্যুতি অথবা জরিমানার বিধান। ২০১৫ সাল শেষ হবার সাথে সাথে এই আইনটিও চীনে স্থগিত করা হয়।

কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে এতো কথা বলার আসলে দরকারটা কোথায়? কয়েকটা প্রজন্মের সবাই যদি তাদের বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হয়ে থাকে, তাহলে ক্ষতিটা হচ্ছে কোথায়? বরং এতে তো ভালোই হবার কথা। একে তো জনসংখ্যার লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে। আর ছেলে হোক মেয়ে হোক, একটি মাত্র সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্যান্য সুযোগ সুবিধা সবকিছুর প্রতিই তো মা-বাবা অনেক বেশি খেয়াল রাখতে পারবে। একমাত্র সন্তান হিসেবে সফল জীবন নিয়েই বেড়ে উঠবার কথা তার।

দুটো ব্যাপারই সত্যি। এই নীতি তিন যুগ কার্যকর থাকার পরে চীনের জনসংখ্যা অনেকটাই সহনশীল একটা পর্যায়ে থেকে গেছে, এবং বেশ কয়েকটা প্রজন্ম মা-বাবার নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে উঠেছে। শেষ দিকে এসে এই পলিসির ভেতরেই যাদের জন্ম, তারাই যখন নিজেরাও মা-বাবা হতে থাকল তখন তাদের সন্তানেরা বাবা-মায়ের সাথে সাথে দাদা-দাদী, নানা-নানী সবার আদর যত্নে বড় হয়েছে।

সত্যি বলতে এই এতো এতো যত্ন পাওয়াটাই একটা সময়ে এসে একটা বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সময়ে চীনের তরুণ বয়সীদের একটা বড় অংশই ‘ওয়ান চাইল্ড পলিসি’র অধীনে জন্ম নেয়া, বড় বড় শহরে যারা থাকে তাদের প্রায় সবাইই। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের একমাত্র সন্তান হবার কারণে বাবা-মা থেকে শুরু করে একেবারে তাদেরও বাবা-মায়েদের কাছে তারাই ছিল একেবারে যক্ষের ধন। একমাত্র ছেলে অথবা মেয়েকে ‘মানুষ’ বানাবার জন্যে তার পড়ালেখা থেকে শুরু করে সবকিছুর প্রতি নিবিড় পরিচর্যা, সেটাই আসলে কাল হয়ে দাঁড়ায় পরবর্তী বয়সে যেয়ে।

কিশোর বয়সের একটা সময় যেয়ে সাধারণত মানুষ ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে শেখে, এরপর আরো কিছুটা বড় হয়ে তরুণ বয়সে এসে জীবনের বেশ গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত তার নিতে হয়। কিন্তু পরিবারের একমাত্র সন্তান হবার কারণে ছোটবেলা থেকেই তাদের জীবনের ভালো-মন্দ সবকিছুর সিদ্ধান্ত নেয় বাবা-মায়েরা। ফলে তরুণ বয়সে যেয়ে যখন হয়ত দূরের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতে হয় কিংবা কর্মজীবনে যাবার পর যখন নিজের মতো করে চলতে হয়, তখন তারা দাঁড়ায় কঠিন বাস্তবতার সামনে।

পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতির সাথে তাদের অনেকেই খাপ খাওয়াতে পারে না। একে স্বকীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারার দুর্বলতা আর তার সাথে জীবনের নতুন নতুন সংকট! এই দুয়ের টানাপোড়েনে ক্যারিয়ার থেকে শুরু করে সঙ্গী বাছাই, প্রতিটা ক্ষেত্রেই তাদের পড়তে হয় ঝামেলায়। যারা দেশের বাইরে পড়ালেখা করতে যায় কিংবা বাড়ি থেকে অনেক দূরে থাকে, তাদের জন্যে এই সংকট হয় আরো তীব্র। ছোটবেলায় পরিবারে কাছাকাছি বয়সী কাউকে না পাওয়া, একলা থেকে থেকে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়া ছেলে বা মেয়েটাকে ভুগতে হয় প্রচণ্ড মানসিক অবসাদে। প্রচুর চাইনিজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেমেয়ে আছে, যারা একটা সময় ক্লাস ছেড়ে দেয়। সারাদিন ধরে ভিডিও গেমের নেশা পেয়ে বসে।

নির্ভাবনায় দিন কাটানো এ প্রজন্মকে দীর্ঘদিন ধরেই ‘লিটল এম্পেরর’ বা ‘ছোট নবাব’ বলে আসছে চাইনিজরা। আর বেস্ট সেলিং বই ‘A Country of Giant Infants’ এর লেখক মনোবিজ্ঞানী উ ঝিহং এই প্রজন্মকে চিহ্নিত করেছেন ‘giant infant’ বা ‘দানব শিশু’ বলে। তিনি বলেছেন যে, আদতে এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বড় হয়েও নিজের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে না। একটা বাচ্চার মতোই তাদেরকে নির্ভর করে থাকতে হয় পরিবারের উপর। সেটা সবরকম ক্ষেত্রেই।

পড়ালেখা আর পরিশ্রমের দিকে একনিষ্ঠ মনযোগ দিতে যেয়ে, যেটা আসলে বাবা-মা এক প্রকারে চাপিয়েই দেন, এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা খুব একটা সামাজিক হতে পারে না। ফলে একটা বয়সে যেয়ে তারা ঝুঁকে পড়ে কনজ্যুমারিজমের দিকে। অর্থাৎ কেনাকাটা, অনলাইন গেমিং থেকে শুরু করে কসমেটিক, অবসাদে থাকা তরুণ প্রজন্ম দেদারসে খরচ করছে টাকা।

কনজ্যুমারিজম সে দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে অনেকটা ধর্মীয় প্রার্থনার মতন হয়ে গিয়েছে। প্রতি বছর আবার এই ধর্মের একটা উৎসবের দিনও আছে। প্রতি বছরের নভেম্বরের একটা দিন, চাইনিজ শপিং সাইটগুলো ঘটা করে ডিসকাউন্ট/সেল দেয়। এই নিঃসঙ্গ একলা প্রজন্মের জন্যে সেই দিনটা ১১ তারিখ!

(নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে)

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button