অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

‘হেলমেট বাহিনী’, ‘গেস্টরুম নির্যাতন’ কিংবা প্রতিবাদের এক অদ্ভুত ভাষা!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি আবেগের নাম৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু এখানকার যারা শিক্ষার্থী তাদেরই প্রতিষ্ঠান নয়, এই প্রতিষ্ঠানটিই যেন একটুকরো বাংলাদেশ। অগণিত মানুষের আবেগের সাথে জড়িয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি, টিএসসির উন্মুক্ত চত্বর। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতি সকলের আশা আকাঙ্ক্ষা তাই একটু বেশি থাকে সবসময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসই আসলে প্রত্যাশা তৈরি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি ভাষা, দেশ, জাতি গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও এই বিশ্ববিদ্যালয় বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, গুণী মানুষদের তীর্থস্থান। কিন্তু, কালের পরিক্রমায় আজ সেই জৌলুস কি খানিকটা ফিকে হয়েছে? হয়ে থাকলে কেন হয়েছে?

সাম্প্রতিককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু কিছু ঘটনায় অনেক মানুষকে মর্মাহত করেছে, সাধারণ ছাত্রদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। বিশেষ করে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে টিয়ারশেল নিক্ষেপ, হেলমেট পরিহিতদের দ্বারা শিক্ষার্থী নিপীড়ন, শিক্ষকদের হেনস্থা হওয়ার ঘটনা এগুলো তো বেশ সাম্প্রতিক। এছাড়া অনেক দিনের পুরানো গেস্টরুম কালচার তো আছেই। যেখানে প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের ‘ম্যানার’ শেখানোর নামে কখনো কখনো মানসিক চাপের মুখে ফেলা হয়। হলের অব্যবস্থাপনা, প্রশাসনের অব্যবস্থাপনা এসব তো আছেই৷ প্রয়োজনের তুলনায় বাস সংখ্যা কম, ছাত্রের তুলনায় হলের সিট সংকট, নিম্নমানের খাবার, রাজনৈতিক তেলবাজি এগুলো গতানুগতিক দৃশ্য হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাসে৷ এগুলোকে যদি একেকটা ময়লা হিসেবে ধরা হয়, তাহলে দেখা যাবে এই ময়লা পরিষ্কার করার কোনো উদ্যোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায়নি খুব একটা। ডাকসু স্থবির হয় ছিলো দীর্ঘকাল, ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর, দাবি দাওয়া, চাওয়া পাওয়া- সেভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

ময়লা উৎসব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এমনই এক সময়ে এইসব আবর্জনা ময়লা পরিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জৌলুস আবার ফিরিয়ে আনা যেন সময়ের দাবি। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? ঘন্টা কেউ বাঁধার সাহস, স্বদিচ্ছা সেভাবে না দেখালেও প্রতিকী অর্থে একটি প্রতিবাদ দিয়ে এসব ময়লার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী। টিএসসিতে চলছে অভিনব ময়লা উৎসব। চলবে ১৪ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আদনান আজিজ, মার্কেটিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের নাজমুল ইসলাম ও পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র মাঈনউদ্দিন আহমেদ অভিনব এ প্রতিবাদের মূল উদ্যোক্তা। সাথে আছেন মেঘমল্লার বসু, মীম আরাফাত মানব, মাহমুদুল হাসান ইশাদী, জাহিদ জামিল, সাইনুর রহমান সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও অনেক শিক্ষার্থী।

তাদের উদ্যোগটি দুর্দান্ত, প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এটি বেশ সাহসী এবং সুন্দরও বটে। টিএসসি এলাকায় এই শিক্ষার্থীরা ময়লা আবর্জনা কুড়িয়ে তারা ডাস্টবিনে ফেলছেন। কিন্তু ডাস্টবিনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় কালো অধ্যায়গুলোর নামে নামকরণ করা হয়েছে। যেমন একটি ডাস্টবিনের নাম ‘গেস্টরুম নির্যাতন’, আছে ‘হেলমেট বাহিনী’ নামক ডাস্টবিন। এছাড়া ‘নারী নিপীড়ন’, ‘ম্যানার শেখানো’, ‘শিক্ষককে হেনস্তা’, ‘ক্যাম্পাসে টিয়ারশেল’, ‘ডালের নামে পানি’, ‘রড-চাপাতি-হাতুড়ি’, ‘ভাইদের প্রটোকল’ – এইসব নামেরও ডাস্টবিন আছে। অনেকেই কৌতূহলী হয়ে এইসব ডাস্টবিনে ময়লা ফেলছেন। কেউ কেউ এই ডাস্টবিনে প্রতিবাদ স্বরুপ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করতে থুথু ফেলছেন। রাতে এই এই ডাস্টবিনগুলোর ময়লা পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। যার অর্থ, শুধু ক্যাম্পাস পরিষ্কার নয়, অনিয়মকেও ধ্বংস করে সব ময়লা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে পাঠানো হচ্ছে।

ময়লা উৎসব

উদ্যোক্তারা বলছেন, “ময়লা যে শুধু মনোঃকষ্টই দেয় তা তো নয়। স্বাস্থ্যের জন্যও তা ক্ষতিকারক। মাঝে মাঝে হাত-পাও ভেঙে ফেলে। ফুটপাতে পড়ে থাকা ইটে উষ্টা খেয়ে নখ ভেঙে যেতে পারে। ইটটি সরিয়ে রাখা ভালো কাজ। কোন ছাত্রের হাতে থাকা হাতুড়ি পড়ে অন্য ছাত্রের হাঁটু ভেঙে যেতে পারে, হলে পড়ে থাকা কাঁচ লেগে গোড়ালির রগ কেটে যেতে পারে। পয়লা বৈশাখে নারী শিক্ষার্থী ও পথচারীদের উপরে লম্পটের হাত, ছুঁড়ে দেওয়া নোংরা কথাগুলো ময়লা। পথচারীর মাথায় হেলমেট, হাতে রড, ইট, পাটকেল ইত্যাদিও ময়লা। যেইটা যেখানে থাকার কথা না সেখানে সেটা ময়লা। হলের সিটে ময়লা জমতে জমতে দেখা যায় ছাত্রদের থাকা লাগে গণরুমে। সেখানেও জায়গা না পেয়ে বারান্দায় নিউমোনিয়া বাঁধিয়ে মারা যায় ছাত্র। জুনিয়ররা হলে সুন্দর, ময়লা ডাস্টবিনে। এই উপযুক্ত ময়লাগুলোর জন্য আমাদের অনুপযুক্ত ডাস্টবিন বসানোর উদ্যোগ ময়লা উৎসবে।”

ময়লা উৎসব

এই অভিনব উদ্যোগকে তারা আরো বিস্তৃত করতে চান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নয়, টিএসসি শুধু নয় ময়লা ছড়িয়ে গেছে দেশের আনাচে কানাচে। এই ময়লা পরিষ্কার করার দায়িত্ব, ময়লাকে ময়লা হিসেবে স্বীকার করার শিক্ষা, ময়লাকে ময়লা বলে চিহ্নিত করে উপযুক্ত ডাস্টবিনে তাকে ফেলাই যেন এই উদ্যোগের লক্ষ্য। তাদের কথাতেই সেই সুর, “আমরা চাই আমাদের এই উৎসব ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে। যাতে আর কোথাও কোনদিন কোন শিক্ষককে কোন রাজনৈতিক প্রভাব হেনস্তা করতে না পারে, কোন ছাত্রকে গেস্টরুম নির্যাতনের শিকার না হতে হয়, না দিতে হয় ক্লাস বাদ দিয়ে কোন ভাইদের প্রটোকল, কোন নারী নিপীড়িত না হোন আর কোন আন্দোলনকারী যেন হেলমেট বাহিনীর কাছে রড-চাপাতি-হাতুড়ি দ্বারা নির্যাতিত না হয়। ডাস্টবিনগুলোতে আপনার ময়লা ফেলে এই সকল ময়লা চর্চাগুলোকে ডাস্টবিন হিসাবে চেনার সাথে সাথে পরিবেশটা পরিষ্কার করতে সাহায্য করুন।”

এই ময়লা উৎসবে যোগ দিতে পারেন আপনি, ভালবাসা দিবস পর্যন্ত চলবে এই উৎসব। ময়লার প্রতি ধিক্কারও পরিষ্কারের পক্ষে ভালবাসা। এই ভালবাসার পক্ষে থাকার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আপনিও একমুঠো ময়লা ফেলতে পারেন, কিংবা একদলা থুথু!

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Back to top button