রিডিং রুমলেখালেখি

কাঁসা ঝুলানো থিউরি কিংবা পরিবারের মৃত্যুঝুঁকি কমানোর পদ্ধতি!

বাড়ির চারকোণায় চারটা পোড়ামাটির কাঁসা ঝুলত। কাঁসায় নয় ঘর থাকত। তার ভেতর আরবী বর্ণ। চারটা মাটির কাঁসা জ্বীন-ভূত তাড়ানোর ফার্স্ট লাইন ডিফেন্স। কাঁসা যতদিন থাকত, ভূতপ্রেত আসত না। যেদিন ভেঙ্গে যেত ক্রিকেট বল লেগে, সেদিন রাতে শুরু হত অত্যাচার। টিনের চালে ঢিলের শব্দ। রাত বাড়লে শোঁ শোঁ করে কী যেন চলে যেত ঘরের পাশ দিয়ে।

সকালবেলা দাদা আসত। তিনি গম্ভীরমুখে আবার কাঁসা টানাতেন। কাঁসায় তাবিজ-কবজের ব্যাপারটা নিয়ে আমি প্রথমবার আলোচনা করি গ্রামের হুজুরের সাথে। তিনি জবাব দিলেন- এসব ফাইজলামি। তাহলে টিনের চালে কে ঢিল ছুড়ল? রাত গভীর হলে ঘরের পাশ দিয়ে কে শোঁ করে চলে যায়? হুজুর উত্তর দেয়নি। আমি উত্তর খুঁজে বের করেছিলাম। অনেক পরে। তারও অনেক পরে, মেডিকেলে পড়ার সময় আমি প্রথমবার বুঝতে পারি- পোড়ামাটির কাঁসার ব্যাপারটা খুব বৈজ্ঞানিক ছিল। আঁকিবুঁকিটা অবৈজ্ঞানিক হলেও কাঁসার ব্যাপারটা আমাদের মানসিকভাবে সাপোর্ট দিত। ভয় পেয়ো না। খারাপ কিছুই হবে না সীমানার ভেতরে।

Image Source: vector stock

পুরাতন ফ্যাশন ঘুরেফিরে আবার আসে। কাঁসার ব্যাপারটা আমাদের আবার ফিরিয়ে আনা উচিৎ। শহরের ফ্ল্যাটে নিশ্চয় বাড়ির মালিক কাঁসা ঝুলাতে দিবে না। তখন? ঘরের ভেতর ঝুলাতে হবে। কাঁসা ঝুলানোর উপায় নেই। তাহলে বরং কাঁসার বদলে একটা সাদা কাগজ ঝুলান। সাদা কাগজ কেন? সেখানে দশটা মানুষের নাম লেখা থাকবে। তাদের ফোন নাম্বার লেখা থাকবে। কাঁসার বদলে মানুষের লিস্ট কেন? মিল আছে। কাঁসা যেমন মানসিক সাপোর্ট দিত, এই লিস্ট আপনাকে বিপদে সাপোর্ট দিবে। কীভাবে? বলছি।

আপনার বোন বা স্ত্রী গর্ভবতী হলে গার্ডিয়ান হিসেবে আপনি তার ভবিষ্যত বিপদকে মোকাবেলা করতে কী কী করেছেন? বাচ্চার কাথা, গরম কাপড়, খেলনা হ্যান ত্যান ইত্যাদি। রক্তের জন্য কী করেছেন? রক্ত মানে? স্ত্রী তো যেকোন মুহুর্তে সিজারে যেতে পারে কিংবা যেকোন মুহুর্তে রক্ত লাগতে পারে। এজন্য পুরো নয়মাস কী করেছেন? কাল যদি তিনব্যাগ রক্ত লাগে এবং সেটা যদি বি নেগেটিভ হয়, কীভাবে খুঁজবেন? টাকা দিয়ে? টাকায় রক্ত কেনা যায় না। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে? যদি না ম্যানেজ হয়?

আপনি নয়মাসে কিছুই করেন নি। এজন্য আপনাকে এইদিন পাগলের মত উদভ্রান্ত হয়ে ছোটাছুটি করতে হবে। ধরুন, কাল আপনার ভাইয়ের ফোন পেলেন। রোড অ্যাক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে আছে। দশব্যাগ রক্ত লাগবে। সবাই ছোটাছুটি শুরু করলেন। এই ব্যাংক সেই সংগঠন, আত্মীয় স্বজন সবাইকে ফোন দিচ্ছেন। কিছুতেই দশব্যাগ ম্যানেজ করতে পারছেন না। ফেসবুকে পোস্টের পর পোস্ট দিচ্ছেন। এরপর এক এক করে হাসপাতালে আনা আরেক হ্যাপা। কিন্তু সব সমস্যা এক মিনিটেই কাভার করে ফেলতে পারবেন, সেটা ভেবেছেন কখনো?

নিয়মটা বলি। আগামী রবিবার বাবা দিবস। বাবা দিবসের জন্য একটা স্পেশাল গিফট বানাতে শুরু করুন। আপনার যত নিকটাত্মীয় আছে, সবাইকে ফোন করুন। এবার এক এক করে তাদের রক্তের গ্রুপ জেনে নিন। একটা সাদা কাগজে নাম লিখে পাশে মোবাইল নাম্বার এবং রক্তের গ্রুপ লিখে ফেলুন। সবার রক্তের গ্রুপ আলাদা আলাদা। এবার কী করবেন?

এবার ফিল্টার করুন। আপনার রক্তের গ্রুপ কী? এ-পজিটিভ? তাহলে আপনার নাম লিখুন কাগজের উপরে। বড় করে। এরপর এক দুই করে দশটা নাম লিখুন। যাদের যাদের এ-পজিটিভ তারা আপনার নামের নিচের লিস্টে বসবে। আপনার বোনের ও-পজিটিভ? তার নাম লিখে নিচে দশটা ও-পজিটিভ আত্মীয়ের নাম লিখুন। এভাবে বাড়ির সবার জন্য একটা করে আলাদা করে লিস্ট করুন।

Image Source: nafarma

NB: যদি একই গ্রুপ অনেকের হয় তাহলে তাদের কমন লিস্ট হবে। আরেকটা কথাঃ একটা কাজ কখনই করবেন না। আপনার ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেশনের কারো নাম (বাবা-মা-আপন ভাইবোন-সন্তান) যেন আপনার নামের লিস্টে না থাকে। এদের রক্ত নেওয়া বিপদজনক। Transfusion-Associated graft-versus-host Disease (TA-GVHD) হতে পারে। এটা নিয়ে আরেকদিন আলোচনা হবে।

ভাবুন তো, আপনার ছোটভাইটার রক্তের গ্রুপঃ এবি নেগেটিভ। পাকেচক্রে তার দুইব্যাগ রক্ত লাগবেই। তখন কী হবে? নিশ্চয়ই আত্মীয়দের মাঝে এতজনের এবি-নেগেটিভ নেই, তাহলে কী করবেন? ফ্রেন্ড সার্কেলের সবার সাথে যোগাযোগ করুন। না পেলে তাদের শাখা ফ্রেন্ডের নাম, নাম্বারের তালিকা করে ফেলুন। তাও না পেলে ক্লাশমেট, অফিসের কলিগদের সাথে কথাচ্ছলে জেনে নিন রক্তের গ্রুপ। বিপদে পড়লে ফোন করে অনুরোধ করবেন রক্তের জন্য।

বিপদ থেকে সেইফ থাকতে হবে শুরুতে। কিন্তু একবার হয়েই গেলে? বিপদের সময় প্রত্যেকটা মিনিট গোল্ডেন মিনিট। যে কৌশলী, যে দ্রুত কাজ করবে সেই বেঁচে থাকবে।

মাটির কাঁসা ঝুলানো ট্রেন্ডটা খারাপ ছিল না। সেটা না ঝুলালে আজকে রক্তের গ্রুপ ঝুলানোর আইডিয়াটাই আসত না। আগামী রবিবারের আগেই…বাবা দিবসের আগেই, আমি আমার বাবা-মা এবং ভাইয়ের জন্য লিস্ট করে ফেলব। আপনার ফ্যামিলি মেম্বারেরটার দায়িত্ব কিন্তু আপনার। গুড লাক! 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button