তারুণ্যপিংক এন্ড ব্লু

‘জন্মেছিস যখন, চিহ্ন রেখে যা’

মন খারাপ, ভালো লাগে না, অস্থিরতা, হতাশা এই শব্দগুলো প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে ঘুরে ফিরে আসে। মাঝেমাঝেই জীবন অর্থহীন লাগে। মনে হয় এই ছুটে চলার তাগিদটা কি শুধুই মৃত্যুর জন্য! তারপর আর কোন কিছুতেই আগ্রহ থাকে না। পরে থাকে মুখ খোলা পারফিউমের ঘ্রাণ, নৈঃশব্দ জমে যায় সুগন্ধের শরীর জুড়ে। নিজেকে মনেহয় একটা আগন্তুক গাছ। সুন্দর গোছানো নির্লিপ্ততা ঘাড়ের বাম পাশটায় জমে ওঠে সকাল-বিকাল।

তারপর আবার একদিন সব অস্থিরতা থেমে যায়, ধুয়ে যায় ভূমি আর বুকের সমকোণী অসুখ। তখন ছোট ছোট কারণেও ভালো লাগা তৈরি হয়। বারান্দার রেলিঙ ধরে দশ-দিগন্ত মেলে মানিপ্ল্যান্টটার আকাশ যাত্রাও তখন খুশি আর ভালো থাকার কারণ হয়ে ওঠে। কিন্তু অস্থির আর স্থির হবার মাঝখানে যে সময়টা চলে যায়, সেই সময়টা আমাদেরকে বেশকিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে।

ভালো থাকার ব্যাপারগুলো যেমন আপেক্ষিক, ভালো না-থাকার বিষয়টিও তেমনি আপেক্ষিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত। তাই ভালো না লাগার ফর্মগুলোকে পাশ কাটিয়ে চলা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে ভালো না লাগাকে অসুখ না বানিয়ে, বিষয়গুলোকে ওভারল্যাপ করে এগিয়ে যাবার নামই, জীবন। লাগাতার খারাপ থাকলে, ভালো থাকার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। তখন মানুষ ডিপ্রেশন বা বিষন্নতায় পরে। এই বিষন্নতা এক ভায়ানক অসুখ, যা থেকে বের হওয়া প্রায় সময়ই কঠিন হয়ে যায়। ফলে মানুষ আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। নিজেকে অযাচিত এবং অকেজো লাগে।

অনেকেই  ডিপ্রেশনকে  মন খারাপ কিংবা অ্যাক্সাইটির সাথে মিলিয়ে ফেলে। আমরা যদি কাউকে কান্নাকাটি করতে দেখি কিংবা মনমরা হয়ে থাকতে দেখি আমরা ভাবি মানুষটা বিষন্নতায় ভুগছে। বিষয়টি কিন্তু অতো সোজা নয়। মানুষ কখন, কেনো, ডিপ্রেসড হয়ে যায়, বলা মুশকিল। কান্নাকাটি, চুপচাপ থাকা, মন খারাপ করা কিংবা হতাশা, এগুলো ডিপ্রেশনের লক্ষণ কিন্তু কেউ এসব করছে মানেই যে সে বিষন্নতায় ভুগছে তেমন নয়। এমন অনেক লোকের সাথে আমি কথা বলেছি, যারা ব্যক্তি জীবনে খুবই সফল, পারিবারিক জীবনে সুখী, হাসি-খুশি, কিন্তু পুরো জীবন নিয়ে তারা ডিপ্রেসড। বিষন্নতায় ভোগা এইসব মানুষদের সবকিছু খালি খালি লাগে, এক কৃষ্ণগহ্বর সমান শূন্যতা নিয়ে তাদের মনেহয় এই জীবনের কি মূল্য? আর ঠিক সেই প্রশ্নের উত্তর জানতেই অনেকে সুইসাইডের পথ বেছে নেয়। কিন্তু সেই উত্তর আর জানা হয় না।

শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক আঘাত, হতাশা, লাইফ স্ট্রেস, এই বিষয়গুলো মানুষকে ডিপ্রেশনের দিকে ঠেলে দেয়। যে ডিপ্রেশন মানুষকে আত্মহত্যার প্ররোচণা দেয়। কিন্তু আত্মহত্যা কি কোন সমাধান? প্রত্যেকটা সান টু সান মুহূর্তে হতাশ হবার হাজারটা কারণ ভেসে বেড়ায় চারপাশে। একই সময়ে ভালো থাকারও অজস্র কারণ তৈরি হয়। নিজেকে বিষন্নতার সর্বোচ্চ স্টেইজ এ না নিয়ে গিয়ে ভালো থাকার সেই মুহূর্তগুলোকে নিজের জন্য এবং কাছের মানুষগুলোর জন্য ধরে রাখাটাই, চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ অ্যাক্সেপ্ট করেই জীবন যাপন করে সবাই।

চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগ যখন বেঁচে ছিলেন, চরম হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে মানসিক হাসপাতালেও চিকিৎসা নিয়েছেন। ‘তার জীবন পুরোপুরিই ব্যর্থ’, এই ধারণা থেকে বের হতে পারেননি কোন ভাবেই। শেষ পর্যন্ত, মাত্র ৩৭ বছর বয়সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন ভ্যান গগ। বেঁচে থাকতে নিজের অঙ্কিত শিল্পকর্ম তিনি বিক্রি করতে পারেননি। অথচ বর্তমানে তার একেকটি শিল্পকর্ম মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। এই গল্পের দুইটা ভাবনার জায়গা আছে। এক, আসলেই তো হতাশ হবার কারণ ছিলো তাঁর। দুই, সুইসাইড না করলে কি তিনি নিজের খ্যাতি দেখে যেতে পারতেন? কি জানি হয়তো, হয়তো না।

ভ্যান গগের গল্পটা বাদ দেই, সেতো অনেক পুরনো কথা। সাম্প্রতিক সময়ের গল্প বলি; আমাদের সবার প্রিয় নায়িকা দীপিকা পাড়ুকোন এই কিছুদিন আগেই চরম বিষন্নতায় পরেছিলেন। একদিন দেখলাম এক ইন্টার্ভিউ দিতে দিতে মেয়েটা কেঁদেই ফেললো। কি যে খারাপ লাগছিলো দেখে। মনে হলো, যে মানুষগুলোকে আমরা সবচেয়ে সফল আর সুখী ভাবি তারা কেন বিষন্নতায় ভোগে? নিজেকে খুব অসহায় লাগছিলো অইদিন। এরপর প্রিয় শিল্পী চেস্টার বেনিংটনও তো ডিপ্রেশনের কারণে সুইসাইডই করলেন। এ রকম আরো অনেক তারকা আছেন, যারা চরম ডিপ্রেশনে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। তার মানে ডিপ্রেশনের সাথে সফলতা কিংবা আর্থিক স্বচ্ছলতার খুব একটা সম্পর্ক নেই। তবে চাইলেই ডিপ্রেশনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা যায়। দীপিকা পাড়ুকোন তারই উদাহরণ। বিষণ্নতা কাটিয়ে আবার জীবনকে নতুন করে দেখেছিলো বলেই, আজকে সে একজন সুখী ও সফল মানুষ। একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা দর্শককে উপহার দেয়ার পাশাপাশি, নিজের জীবনকেও গুছিয়ে নিতে বিয়ে করছেন ভালোবাসার মানুষকে। অ্যান্টি ডিপ্রেশন ক্যাম্পেইনের জন্য একটা ফাউন্ডেশনও খুলেছেন ‘লিভ, লাভ, লাফ’ নামে।

তারকাদের কথা বললাম এই কারণে যে, তাদেরকে অনেকেই আইডল ভাবেন। আবার, যে কেউ বলতেই পারে তারকারা সব পারে ভাই, ওদের জীবনে অনেক অপশন আছে। ঠিক আছে, তাদের কথা বাদ দেই, আমি খুব সাধারন একজন মানুষ; আমিও বিষন্নতায় পরতে পরতে জেগে উঠেছি। আমার মতো আরো অনেকেই আছে, যারা জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে ঘুরে দাঁড়ায়। আমারো মাঝে মাঝে মনে হয় কি পেলাম জীবনে, কেন বেঁচে আছি, আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। দিনের পর দিন মন খারাপ করে, না খেয়ে, না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেই শুধু টেনশন করে। কিংবা কখনো কখনো ভালোবাসার মানুষগুলোকে বদলে যেতে দেখলে কষ্ট পাই। দিন শেষে বুঝি শুধু চিন্তা করে, আর কষ্ট পেয়ে আসলে ভালো কিছু হয় না। আবার নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে হাঁটা দেই জীবনের দিকে। কারন আমি জীবনের শেষটা দেখতে চাই। আমি জীবনটাকে ভালোবাসি।

মানসিক অশান্তির কারনে সুইসাইড করতে চাওয়াটা খুবই কমন একটা বিষয়। প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে, প্রায় বিশ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো! শুধু মানুষ নয়, পশু-পাখিরাও সুইসাইড করে কিংবা করার চেষ্টা করে। ইন্টারনেটে পড়েছিলাম প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে ভারতের আসাম প্রদেশের জাটিঙ্গা গ্রামে পাখিরা দল বেঁধে আত্মহত্যা করে। অনেকে আবার বলে আত্মহত্যা নয় কুয়াশা আর অন্ধকারের কারনে বিভ্রান্ত হয়ে অ্যাক্সিডেন্টালি মারা যায় পাখিগুলো। এদিকে, স্কটল্যান্ডের ওভার টাউন ব্রীজ থেকেও নাকি লাফিয়ে পরে, প্রতি বছর শত শত কুকুর আত্মহত্যা করে। হতে পারে এগুলো শুধুই গল্প। কিন্তু এই কাহিনী দুটো জেনে পরস্পরবিরোধী দুটো প্রশ্ন, আমার মাথায় এসেছে। এক. পশু-পাখি কেন আত্মহত্যা করে ওরাও কি হতাশ হয় কিংবা ওদেরও কি খুব মন খারাপ হয়? দুই. পশু-পাখির হতাশ হবার অনেক কারণ আছে, ওরা হতাশ হতেই পারে আত্মহত্যাও করতে পারে। কিন্তু মানুষ কেনো আত্মহত্যা করে?

বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ চারটি কারনে আত্মহত্যা করে__
১.অভিমান
২.হতাশা
৩.আত্মবিশ্বাসের অভাব
৪.ভালোবাসাহীনতা।

এই চারটি ঘটনা যখন কারো জীবনে ঘটে তখন, মন খারাপ হয়, খেতে ইচ্ছা করেনা, ইনসমনিয়া হয়, মেজাজ খিটখিটে লাগে, একা থাকতেও খারাপ লাগে আবার অনেক লোকজনও ভালো লাগে না। আর এই বিষয়গুলো নিয়ে চলতে চলতে মানুষ বিষন্নতার চোরাবালিতে ঢুকে যায়। অনেক সময় জেনেটিক্যালিও ডিপ্রেশনের সূত্রপাত হয়। যে কারনেই হোক ডিপ্রেশনকে বাড়তে দেয়া মানেই বিপদ। সেই বিপদ থেকে নিজেকে উদ্ধার করার জন্য প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন। যদি তাতেও কাজ নাহয় তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। বিষন্নতার দিনগুলোতে একা একা না থেকে, পরিবার ও কাছের মানুষগুলোকে সময় দেয়ার অভ্যাস তৈরি করা আর যা করতে ইচ্ছা করে তাই করাটা খুব দরকার। একাকিত্ব ডিপ্রেশনের ডালপালা ছড়াতে সাহায্য করে। তাই পরিবারের কাউকে ডিপ্রেশড হতে দেখলে বা তার মধ্যে বিষন্নতার লক্ষণগুলো দেখলে, মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করুন। তাঁর পাশে থাকুন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত, কারণ একা একা স্বাভাবিক হবার মতো মানসিক শক্তি সবার থাকে না।

মৃত্যু; সবারই আল্টিমেট ডেস্টিনেশন।  তাই কারো উপর অভিমান করে কিংবা নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে চলে যাওয়াটা কিন্তু বোকামি। হ্যাঁ অবশ্যই কখনো কখনো রাগ, অভিমান আর হতাশা এতোটাই বেড়ে যায় যে, নিজেকে ব্যর্থ মনে হয়, মনে হয় পৃথিবীকে দেবার আর কিছুই নাই। বলতেই পারি ‘মইরা যাবো’। কিন্তু কোন কিছুরই সুন্দর সমাধান মৃত্যু নয়। অবশ্যই নয়। পরিবারে, চাকরিক্ষেত্রে আর রিলেশনশীপে প্রতিনিয়ত উত্থান-পতন আসতেই থাকবে। সমস্যা থেকে না পালিয়ে বরং সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে ভালো কিছুর জন্য। সময় সবকিছু বদলিয়ে দেয়- কষ্ট কিংবা ভালো লাগার প্রচন্ডতা।

মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় বা হতাশায় পরে আর্থিক বা কর্মজীবন বিষয়ক সমস্যা ও রিলেশনশিপ নিয়ে। একটা চাকরি চলে গেলো, অনেকদিন আপনি আর কোন চাকরি পাচ্ছেন না, বেকার মানুষ, অতল সমস্যায় পরে আপনি দিশেহারা; কি করবেন কিছুই জানেন না। ইচ্ছা করছে মরেই যাই। এই দোলাচলের মধ্যে থেকে যদি আপনি ধৈর্য্য ধরেন তাহলে দেখবেন, ঠিক একদিন একটা কাজ পেয়ে যাবেন। নতুন অফিস, প্যাশন আর প্রফেশন মিলে একাকার। আপনি এতোটাই সুখী যে অফিস ছেড়ে বাড়িতে ফিরতেই ইচ্ছা করেনা। তখন নিশ্চই আর মরতে চাইবেন না? অই সুখী সুখী সময় শেষে আবার যে সমস্যায় পরবেন না তারও কিন্তু গ্যারান্টি কেউ দিতে পারেনা। তাই সব পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। আর মনে মনে খুশি হতে হবে এটা ভেবে যে, আমি আদিম যুগে নেই, আমি অনেকের চেয়ে ভালো আছি।

অপরদিকে, রিলেশনশীপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কমন যে ঘটনাটা ঘটে- ভালোবাসার মানুষ খুব কষ্ট দিয়ে চলে যায়। সহজ বাংলায় যাকে আমরা বলি ছ্যাঁকা দেয়। তারপর কি হয়? আমরা সেই মানুষটার সাথে কাটানো ভালো সময়গুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে কিংবা তাকে মিস করতে করতে একদিন নিজেই মিসিং লিস্টে ঢুকে যাই। বিশ্বাস করুন তাতে কারো কিচ্ছু আসে যায় না। কেউ যেদিন আপনাকে কষ্ট দিয়ে চলে গেলো, সেদিনই বুঝতে শুরু করতে হবে, সে আসলে আপনাকে ভালো রাখবার যোগ্যতা রাখেনা। আপনার খারাপ লাগা বা ভালো লাগায় তার কিছুই যায় আসে না। আপনার থাকা না থাকা নিয়েও সে বদার করেনা। সেই তার জন্য আপনি হারিয়ে যাবেন কিংবা হেরে যাবেন? মিস অবশ্যই করবেন, খারাপও লাগবে, কিন্তু নিজেকে হারিয়ে নয়। হিপোক্রেট নাহয়ে স্বাভাবিক মানুষ হলে অনুভূতি থাকবেই, তবুও নিজেকে শামুকের মতো করে তুলুন- ভেতরে যাইহোক, বাইরে থাকুন শক্ত।

তারপর, মিস করতে করতে এক সকালে দেখবেন আর মিস করছেন না তাকে, খারাপ লাগছেনা তার জন্য। বরং একদিন আপনি ঠিক উপলব্ধি করবেন, মানুষটা চলে গিয়ে আপনাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে তা নাহলে সঠিক মানুষটাকে আপনি খুঁজেই পেতেন না কখনো। সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি পাল্টায়, পাল্টাবেই। একদিন যার হাসিতে আপনার সুখ হতো, আপনি চেষ্টা করেও সেই হাসি মনে করতে পারবেন না, লিখে দিলাম। একদিন যে অসুখ কাঁটার মতো বিঁধে ছিলো বুকে, সময়ে দেখবেন সেটা শিমুল তুলো হয়ে উড়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকটা মানুষ বুকের ভেতর অসংখ্য কষ্টের পাহাড় নিয়ে ঘোরে। প্রত্যেকটা মানুষ। যে আজ আপনাকে ঠকিয়েছে, তারো ঠকার গল্প কিন্তু কম নয়। পরিস্থিতি যেকোন সময় ভালো বা খারাপ হতে পারে, এটাই বাস্তবতা। সেটা মেনে নিতে শিখতে হবে। নিজেকে সম্মান করুন, যা আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে সেটা অ্যাভয়েড করুন। যে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে আপনি সবচেয়ে বেশি ভয় পান সেই পরিস্থিতিতে পড়ে যেদিন সেখান থেকে বের হতে পারবেন স্বাভাবিকভাবে, সেদিন থেকে আপনি- মুক্ত।

খুব কষ্ট হচ্ছে মন ভরে কান্না-কাটি করুন। যা করতে ইচ্ছা করে করুন। কাউকে মিস করছেন, বিশাল একটা মেসেজ লিখুন তাকে, আর পরে পাঠাবেন বলে মেসেজটা ড্রাফট বক্সে রেখে দিন, চার ঘন্টা পর ড্রাফট বক্সে গিয়ে মেসেজটা পড়ে যদি পাঠাতে ইচ্ছা করে, তাহলে সেন্ট করুন। তবে আমি জানি, চার ঘন্টা আগে যে মেসেজ আপনি লিখেছেন, যে ইমোশন দিয়ে, চার ঘন্টা পর অই মেসেজে ঠিক অই পরিমান ইমোশন, আপনি নিজেও আর খুঁজে পাবেন না। তার মানে ইমোশন ঘন্টায় ঘন্টায় বদলায়। কারো ক্ষেত্রে হয়তো সেটা চার ঘন্টার বদলে ২৪ঘন্টা কিংবা ২৪ সপ্তাহ সময় নেয়, কিন্তু বদলায়।

মন খারাপ, অবসন্নতা আর বিষন্নতার দিনগুলোতে একা একা না থেকে  নিজেকে জানার চেষ্টা করা সবচেয়ে ফলদায়ক। কিছুদিন আগেও এসব কথাকে গালভরা গপ্প বলে আমি উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু পরিস্থিতির মধ্যে থেকেই আমি জানি, নিজেকে ভালোবাসার মতো আর কিছু নাই। আপনার মধ্যে কিছু তো একটা আছে, যেটা অন্যকারো সুখের সাথে সম্পর্কিত নয়। অন্য কেউ আপনার কাছ থেকে যেটা কেড়ে নিতে পারবে না। অন্য কেউ আপনাকে গিফট করেনি বা ধার দেয়নি; সেই কাজটা করুন। লিখুন, গান করুন, ছবি আঁকুন। এগুলোর একটাও না করলে গান শুনুন, সিনেমা দেখুন, গল্পের বই পড়ুন, বাগান করুন, নিজেকে সময় দিন। পরিবার আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিন। নিজের খারাপ লাগার বিষয়গুলো অন্তত একজন কারো সাথে শেয়ার করুন, তাতে খারাপ লাগা কিছুটা হাল্কা হবে। জীবন একটাই, নিজেকে গুরুত্ব দিন। নেগেটিভিটিকে বলুন গুডবাই।

আপনাকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা এই কথা না ভেবে, এখন থেকে ভাবুন আপনাকে দিয়ে আসলে কি কি হতে পারে। সফল হতে হবে সবকিছুতেই এমন কোন কথা নেই। কিন্তু নিজের জন্য ভালো থাকাটা মৌলিক অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে পরে। আজ খারাপ থেকে যে সময় চলে যেতে দিচ্ছেন, ভবিষ্যতে সেই সময়ের কথা ভেবে আবার খারাপ থাকার মতো সময় আসলে, এক জীবনে পাওয়া যায় না। তাই প্রতিটিদিনের জন্য ভালো থাকা শিখতে হবে। সুখ ছোট ছোট, সেগুলো তুলে রাখতে হয়, বড়ো বড়ো কষ্টকে ঢাকতে। কষ্ট হলে, পাগলামি করুন, যা ইচ্ছা হয় তাই করুন, কিন্তু বেঁচে থেকে। কারণ, প্রত্যেকটা মানুষই বিশেষ কিছু গুণ নিয়ে জন্মায়। প্রত্যেকেই রাজা নিজের রাজ্যে। নিজেকে আবিষ্কার করার মতো, নিজেকে ভালোবাসার মতো সুখের আর কিছু নাই। জীবন অদ্ভুত সুন্দর! সেই সৌন্দর্য তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করবার অসংখ্য উপকরণ আপনার চারপাশেই আছে, সেগুলো খুঁজে খুঁজে জমাতে শুরু করুন আজ থেকেই। স্বামী বিবেকানন্দ বলে গেছেন- ‘জন্মেছিস যখন, দেয়ালের গায়ে একটা আঁচড় রেখে যা’, আমিও নিজেকে সব সময় বলি- জন্মেছিস যখন চিহ্ন রেখে যা; অন্যকারো জন্য না হলেও, নিজের জন্য। এই পৃথিবীতে আমরা আগন্তুকের মতো। তাই যাকিছু আপন আর ভালোলাগার সেসব হারাতে চাই না। কিন্তু চলার পথে কখনো কখনো সবাই একা। তারপর আবার কারো সাথে দেখা হয়, সখ্যতা হয়, এটা একটা সাইকেল এর মতো। এই বৃত্ত পারি দিতে হবে নিজের সাথে, নিজেকে নিয়ে। তাই ধৈর্য আর ইচ্ছাশক্তিতে এগিয়ে যান নতুন সম্ভাবনার দিকে। জয় করুন প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দিন।

 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button