অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

একটি অভিশপ্ত প্রাণঘাতী পারিবারিক রোগের গল্প

“আমি খুবই দুঃখিত তোমার জন্মদিনে তোমাকে এমন একটি কথা বলতে হচ্ছে বলে। আমি আর মাত্র ছয় মাস বেঁচে আছি।” কেমন লাগবে কারো সুস্থ-স্বাভাবিক মা যদি হঠাৎ এসে একদিন এই কথা বলে? অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশন রিপোর্টার, হেলি ওয়েবের মা ঠিক এই কথাটাই বলেছিল তাকে ২০১২ সালে।

এ কথা বলার, এক মাসের মাথায়ই হেলি ওয়েবের মা, নেরিলের অসুস্থতার নানা ধরণের উপসর্গ দেখা দেয়। সবকিছু ভুলে যাওয়া, হেল্যুসিনেশন, জ্ঞান হারিয়ে ফেলা এবং আরও অনেক ধরণের সমস্যা দেখা দিতে থাকে।

কি কারণে তাদের মা’র এমন সব সমস্যা হচ্ছে, চেষ্টা করেও সেটা জানতে পারেনি হেলি ও তার ভাই ল্যাকলান ওয়েব। তারা ধারণা করে, সম্ভবত তাদের মা ঘুমাতে পারেন না। অনিদ্রার কারণেই সম্ভবত মহিলা সে বছরের জুলাইয়ে মারা যান। ল্যাকলান এবং হেলির মায়ের মত, তাদের নানীও একইভাবে মারা গিয়েছিলেন বলে তারা জানতে পারেন। তারা ধারণা করেন, এই অনিদ্রা রোগটি বংশগত।

ল্যাকলানদের পরিবারের মত এমন একটি ইন্ডিয়ান পরিবারের কথা জানা যায়, যারা এই একই ধরণের ভয়ানক অনিদ্রা রোগে আক্রান্ত।

সোনিয়া ভল্লব নামের ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভুত এক মহিলা ২০১০ সালে হার্ভার্ড ল’কলেজে পড়ার সময়, হঠাৎই তার মা অসুস্থ হয়ে পরেন। অথচ ক’মাস আগেও তার মা পুরোপুরি সুস্থ আর হাসিখুশি ছিলেন। খুব সাড়ম্বরে মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন।

সোনিয়ার মার অসুস্থতা লক্ষণ দেখা দেয় দৃষ্টিশক্তির কমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। যখন রোগটা বাড়তে থাকে, তখন ধীরে ধীরে আরও অনেক উপসর্গ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত তো তার স্মৃতিশক্তি এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, তিনি নিজের মেয়েকেও চিনতে পারছিলেন না। মহিলা অসম্ভব কষ্টে, হাসপাতালের বেডে কিছুদিন লাইফ সাপোর্টে থেকে, সে বছরেরই শেষ দিকে ৫২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

মায়ের মৃত্যুর কিছুদিন পরে সোনিয়ার ডাক্তার বাবা তাকে জানান যে, তার মায়ের অসুখটা জেনেটিক ছিল। 

এক মারাত্মক রোগের আবিষ্কার

১৯৮৬ সালে মারাত্মক এক রোগ আবিষ্কৃত হয় যার নাম “ফ্যাটাল ফেমিলিয়াল ইনসমনিয়া” বা এফএফআই। সহজ বাংলায় যাকে বলা যায়, প্রাণঘাতী পারিবারিক অনিদ্রা রোগ।

এই রোগ সম্পর্কে ডাক্তাররা সর্বপ্রথম বিস্তারিতভাবে জানতে পারেন ইতালির ভেনিসের এক পরিবার থেকে। সে পরিবারের সদস্যরা বংশানুক্রমে ২০০ বছর ধরে এ রোগের নিষ্ঠুর শিকারে পরিণত হয়েছিলেন।

ডি.টি. মাক্স নামের নিউইয়র্কের একজন লেখক এ রোগ সম্পর্কে একটি বই লেখেন, “The Family That Couldn’t Sleep”। তিনি রোগটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখেন, যদি এ রোগে আক্রান্ত কোন পরিবারের এক জেনারেশনে ১৪ টি সন্তান জন্ম নেয়, তবে কমপক্ষে ৬-৭ জন এ রোগের শিকার হবে।

মাক্স জানান, ইতালির পরিবারটি রোগটিকে অনেক বছর ধরে তাদের পরিবারের মধ্যে গোপন করে রেখেছিল। তারা নিজেদের অভিশপ্ত ভাবত, তাই লোকের কাছ থেকে এ রোগ লুকিয়ে রেখেছিল। ডাক্তাররা বিভিন্ন সময়, তাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে অতিরিক্ত স্নায়বিক দুর্বলতা, এনকেফ্যালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহ এবং সিজোফ্রেনিয়াকে দায়ী করেছেন। 

এ রোগটির ভয়াবহতার কথা বলতে গিয়ে ইতালিয়ান পরিবারটির ৬৩ বছর বয়সী একজন নারী লুসিয়া জানান, তিনি এ রোগে তার বাবা, ভাই, বোনসহ আরও অনেক অত্মীয়স্বজনকে হারিয়েছেন। ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক আর প্রাণঘাতী এ রোগ। অন্য একজন সদস্য সিলভানো এ রোগ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, নীরবে অনেক সহ্য করেছেন তারা। অনেক প্রাণ নীরবেই ঝরে গেছে তাদের পরিবার থেকে। আর লুকিয়ে না রেখে তারা এখন এ রোগের সাথে লড়াই করতে চান।

এটা ছিল ১৯৮৪ সালের কথা। ৫৩ বছর বয়সী সিলভানো ইতালির বলগনা ইউনিভার্সিটিতে যান। সেখানকার গবেষকদের বলেন, যদিও তিনি কদিন পরেই মারা যাবেন, তবু যেন গবেষকরা খুঁজে বের করেন তার পরিবারের এই অভিশাপের কারণ কি, কেন তারা ঘুমোতে পারেন না। গবেষকরা, সিলভানোর শেষ দিনগুলো ক্যামেরাবন্দী করেন গবেষণায় কাজে লাগানোর জন্য।  

সেসময়ের করা কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, সিলভানোর চোখ অর্ধেক খোলা, তিনি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন। ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে নিদ্রা আর জাগরণের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করছেন তিনি। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটা বিছানায় শুয়ে আছেন সিলভানো। ঘুমোতে পারছেন না, ভান করছেন যেন নিজের চুল ঠিক করছেন, বা কাল্পনিক কোন শার্টের বোতাম লাগাচ্ছেন। এ অবস্থায় ঘুমের ঔষধ কোন কাজে দেয় না। সিলভানোর মস্তিষ্ক কোনোভাবেই তাকে গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে দেয়না, জাগিয়ে রাখে।

সিলভানো মারা যান ১৯৮৪ সালের জুলাইয়ে। মৃত্যুর পর তার মস্তিষ্কের টিস্যু সংগ্রহ করে সেখানকার গবেষকরা আরো বিস্তারিত গবেষণার জন্য পাঠিয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্যাথোলোজিস্ট, ডা. পিয়ারলুইজি গ্যামবেট্টির কাছে।

ওহিওর কেস ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ডা. পিয়ারলুইজি গ্যামবেট্টি এই টিস্যুগুলো ভালভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন। সেগুলো নরমাল টিস্যুর মতই দেখা যায়। তবে মস্তিষ্কের কেন্দ্রস্থলে ছোট্ট একটা বৈসাদৃশ্য খুঁজে পান তিনি। সেখানে খুব ক্ষুদ্রাকৃতির স্পঞ্জের মত একটা কিছু তার চোখে পরে। সেসময়ই তিনি জানতে পারেন,“ফ্যাটাল ফেমিলিয়াল ইনসমনিয়া” বা এফএফআই আসলে কি।

প্রফেসর গ্যামবেট্টি স্পঞ্জের মত আকৃতির এমন বস্তু আগেও দেখেছেন, কিন্তু সেগুলো একটু আলাদা ছিল। এটি দেখার পর তৎক্ষণাৎ তার মাথায় আসে এক ধরণের রোগের কথা, যেটি প্রোটিনের কারণে সৃষ্টি হয়, প্রোটিনের নাম প্রিয়ন। এফএফআই রোগের মূলেও রয়েছে এই বিশেষ ধরণের প্রোটিন, প্রিয়ন। সব মানুষের মস্তিষ্কেই এই প্রোটিন রয়েছে। এটি জীবের স্বাভাবিক জীবন-যাপনেরই অংশ। কিন্তু এটি আবার, মানবমস্তিষ্কের জন্য ভয়াবহ হয়ে ওঠার ক্ষমতাও রাখে।  

যখন প্রিয়নের আকৃতির পরিবর্তন ঘটে এটা মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এই প্রোটিনের সংখ্যা যদি কোন কারণে বাড়তে থাকে তবে তা ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কোষগুলোকে মেরে ফেলে। ফলে মস্তিষ্কে অনেক ধরণের মারাত্মক রোগের আবির্ভাব ঘটে। কি কারণে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোন স্থানে প্রিয়নের এই পরিবর্তন ঘটে তা অবশ্য গবেষকরা এখনো খুঁজে বের করতে সক্ষম হয় নি।

এই প্রিয়ন নামক প্রোটিনটিই এফএফআই রোগের কারণ। ঘুম আর জাগরণের প্রক্রিয়া মস্তিষ্কের যে অংশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, সে অংশে এ প্রোটিন বৃদ্ধি পেলে তা ‍ঘুম আর জাগরণের চক্রটাকে ব্যাহত করে। এর ফলেই এফএফআই নামক এ ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী রোগটি দেখা দেয়।

এফএফআই রোগটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পরে। পরিবারের কারো এ রোগ থাকলে অন্যদের ভেতর এটি সংক্রমিত  হবার সম্ভাবনা ৫০%। এ থেকে বাঁচার কোন উপায় নেই।

একটা নির্দিষ্ট বয়সের আগে পর্যন্ত অবশ্য জীবনযাত্রা স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকে। জেনেটিক কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করলে বোঝার উপায় নেই, কোন ভয়াবহ রোগের জীবাণু আছে শরীরে। হঠাৎ করেই জীবনের শেষভাগে এ রোগের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পরে মানুষ। রাতের পর রাত, দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে আক্রান্ত ব্যক্তি।

প্রতিকারের সন্ধানে

ফিরে আসি সোনিয়া ভল্লব এবং হেলি ওয়েবদের পরিবারে। তারা যখন জানতে পারেন অসুখটা জেনেটিক তখন দু’পরিবারের সব ভাইবোনরা নিজেদের জিন টেস্ট করান, এবং দূর্ভাগ্যজনকভাবে দেখেন যে, তাদের সবার শরীরেই এই মরণঘাতী অনিদ্রা রোগটি পজিটিভ।  

তারা ভীষণ ভয় পেয়ে যান প্রথমে। নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারের কথা ভেবে শঙ্কিত বোধ করেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত নিজেদের শঙ্কাকেই শক্তিতে পরিণত করার লড়াইয়ে নামেন তারা। সিলভানো এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই এর যে সংকল্প করে গিয়েছিলেন, সেই সংকল্পই নতুন করে প্রতিফলিত হয় তাদের মধ্যে।

এ রোগ নিয়ে জানতে এবং এ সম্পর্কে পড়াশুনা করার জন্য হেলি এবং ল্যাকলন ওয়েব দুই ভাই যোগ দিলেন সানফ্রান্সিসকোর ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির জেসউইন্ড’স স্টাডিতে। ৩৩ বছর বয়সী সোনিয়াও কন্সাল্টিং ফার্মের চাকরি ছেড়ে হার্ভার্ড এক্সটেনশন স্কুলে ব্যায়োলোজির একটা কোর্সে ভর্তি হন। সোনিয়া এবং তার স্বামী নিজেদের ক্যারিয়ার পরিবর্তন করে বর্তমানে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে পি.এইচ.ডি করছেন। খুব বেশি দেরি হয়ে যাবার আগেই তারা চায় এ মরণঘাতী রোগের একটা প্রতিকার খুঁজে বের করতে।

যদিও সম্পূর্ণ জিরো সাইন্টিফিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা দু’জন মানুষ এফএফআই এর মত এমন মারাত্মক রোগের প্রতিকার বের করে ফেলবে এই চিন্তাটা অসম্ভবই মনে হয়, তবু বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তো এমন অসম্ভব কতবারই সম্ভব হয়েছে। এমনটিই বলেছেন, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রেসিডেন্ট, নিউরোলোজিস্ট এরিক এস. ল্যানডার। 

কে জানে কবে এ রোগের প্রতিকার করা সম্ভব হবে। আদৌ কি হবে! যদি কখনো সম্ভব হয় এ রোগের প্রতিকারের উপায় বের করা, তবে কিছু দুর্ভাগা পরিবার মুক্তি পাবে তাদের সীমাহীন কষ্ট আর দুর্ভাগ্যের ইতিহাস থেকে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button