রিডিং রুমলেখালেখি

ফেয়ার এন্ড লাভলী ‘HD’ গ্লো কিংবা গোয়েবেলসের ফর্মূলার যথার্থ প্রয়োগ!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হিটলারের প্রচারণা মন্ত্রী ছিলেন “যোসেফ গোয়েবেলস্”। এই ভদ্রলোক প্রচারণার এক অভুতপূর্ব, কিছুটা জঘন্য কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী এক ফর্মূলা দিয়েছিলেন। ফর্মূলাটি কিন্তু ছিল খুবই সাধারণ কিন্তু কাজ করত ম্যাজিকের মতো! কী ছিল সেই ফর্মূলা?

ফর্মূলাটি ছিল- “যখন মিথ্যা বলবে, তখন একই মিথ্যা বারবার বলতে থাকো, যেন একসময় তা সত্যি মনে হওয়া শুরু করে।”

এখনকার সময়ে ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনেও মাঝে মাঝে সেই গোয়েবেলসের ফর্মূলা প্রয়োগ চোখে পড়ে। পুরো মিথ্যা, আধা-মিথ্যা অথবা সম্পূর্ণ লজিক ছাড়া কথা বারবার-বারবার বলে যাওয়া হয়। শুনতে প্রথম প্রথম হয়তো একটু অস্বস্থি, একটু কেমন-কেমন যেন লাগে; কিন্তু তারপর আস্তে আস্তে বক্তব্যটি অবচেতন মনের ভেতর গ্রহণ করা শুরু হয়ে যায়। একসময় মাথার ভেতর গেঁথেও যায়।

যেমন ধরুণ, ‘ফেয়ার-এন্ড-লাভলী’র এই মুহূর্তের চলা ক্যাম্পেইন ‘HD Glow’। HD কী এই সংগা খুঁজলে দেখবেন- HD হচ্ছে বিভিন্ন মনিটর কিংবা স্ক্রীনের মাপে প্রয়োজনীয় নূন্যতম পিক্সেলের উপস্থিতি। যাতে করে দর্শকের চোখে ছবিটি ঝকঝকে, প্রানবন্ত ও একদম ডিটেইল সহ ধরা দেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের চামড়ায় HD এফেক্ট আসে কিভাবে? চামড়ার রং সাদা হোক কিংবা কালো, উজ্জ্বল হোক কিংবা ম্যাড়ম্যাড়ে- চোখ দিয়ে যখন সরাসরি তাঁকে দেখা হয়, তখন তাঁকে ঠিক একই রকম রেজ্যুলেশনে দেখা যাবে। সে কোন ক্রীম মাখল কিংবা কী কাপড় পরল, সেটি যে দেখছে তার চোখের কিংবা দেখার রেজ্যুলেশনে কোনো পার্থক্য করে না, করা সম্ভবও নয়।

তাহলে ‘ফেয়ার-এন্ড-লাভলী’র এই হাস্যকর এবং সম্পূর্ণ উদ্ভট এই ধরণের কথা-বার্তার কারণ কী? কারণটি আসলে ঐ যে বললাম- গোয়েবেলসের ফর্মূলা, যেখানে কী বলছি সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, কতবার বলছি সেটি আসল ব্যপার।

দক্ষিণ এশিয়ার মানুষজনের সাদা রংয়ের প্রতি দুর্বলতার কারণে ‘ফেয়ার-এন্ড-লাভলী’র বিজসেন সাইজ এই অঞ্চলে অনেক বিশাল। বাস্তবিক পক্ষে ইউনিলিভারের অন্যতম ক্যাশ-কাউ এই ব্র্যান্ডটি। সুতরাং, মার্কেটিং বাজেটের পরিমাণও চোখ কপালে তোলার মতো! এই বাজেট দিয়ে অনায়াসে জলস্রোতের মতো মিডিয়া কাভারেজ কেনা যায়। এই বিশাল পরিমান মিডিয়া কভারেজে আপনি যতবার ইচ্ছা ততবার আপনার কথাটা বলে যেতে পারবেন, সেটি যতটা আজব কিংবা কিম্ভুতই হোক না কেন!

HD Glow’র ব্যাপারটা যে এমনই এক কিম্ভুত ক্লেইম, সেটি কি ইউনিলিভারের লোকেরা জানে না? অবশ্যই জানেন। আমার চেয়ে অনেক অনেক তীক্ষ্ণ এবং অনেক বেশী তুখোর মার্কেটিয়ারগণ ইউনিলিভারে কাজ করছেন। তাঁদের হাত ধরে ‘সার্ফ এক্সেলের দাগই ভাল’, ‘কাপর কাচার সেরা সাবান হুইল, হুইল’ এর মতো কালজয়ী সব ক্যাম্পেইন কিংবা ‘ক্লোজ-আপ ওয়ান’ এর মতো এদেশের মার্কেটিং ক্যালেন্ডারের আগাপাশতলা পাল্টে দেয়া সব এক্টিভিটি বের হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হাত ধোয়ার জন্য লিক্যুইড সোপ কিংবা বাসন-কোসন ধোয়ার জন্য আলাদা সাবানের মতো অসাধারণ সব প্রোডাক্ট কনসেপ্ট, নতুন সব ক্যাটাগরী!

তবে সেই তুখোর-তীক্ষ্ণ মাথাগুলো থেকে এরকম কিম্ভুত ক্যাম্পেইন নামলো কি করে? নামলো কারণ লজিক আছে। লজিকটি হচ্ছে এখানে এ্যাডে কী বলা হচ্ছে, সেটি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসল ব্যপারটি হচ্ছে- যখন মানুষ অসংখ্যবার ফেয়ার-এন্ড-লাভলী’র এই নতুন এ্যাডটি দেখবে, তখন আসলে তার মাথায় দুটি জিনিষ গেঁথে যাবে।

১) ফেয়ার-এন্ড-লাভলী ব্র্যান্ডটির নাম
২) ফেয়ার-এন্ড-লাভলী নতুন কিছু একটা এনেছে

এখানে লক্ষ্য করুন, ফেয়ার-এন্ড-লাভলী’র টিপিক্যাল টার্গেট কনজ্যুমারদের কথা, তাঁদের চিন্তা-ভাবনার ধরণ। তাঁরা দিনশেষে মনে রাখেবে ঐ দুটি জিনিষই। ব্র্যান্ডের ভাষায় একে বলে ‘টপ-অফ-মাইন্ড’ বা TOM। যেকোন ক্যাটাগরীতে এই TOM কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। যে ব্র্যান্ড যতবেশী সংখ্যক কনজ্যুমারের মাথায় ‘টপ-অফ-মাইন্ড’ হিসেবে থাকে, সে ব্র্যান্ডের ক্ষমতা এবং দিনশেষে সেলস্ জেনারেট করার ক্ষমতা তত বেশী।

ফলস্বরুপ, একজন মানুষের মনে যখনই ‘আরেকটু ফর্সা দেখানোর’ সেই আদি ইচ্ছাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, তখনই তাঁর সবচেয়ে প্রথমেই মনে পড়বে ‘ফেয়ার-এন্ড-লাভলী’র কথা। এবং সেক্ষেত্রে তাঁর বাজারের বাকী অন্যসব ক্রীমের মাঝে ‘ফেয়ার-এন্ড-লাভলী’র কিনে বাড়ি ফেরার সম্ভাবনাও সবচেয়ে বেশী।

ফেয়ার এন্ড লাভলী, গোয়েবেলসের ফর্মূলা

এখানেই ‘ফেয়ার-এন্ড-লাভলী’র টেকনিকটা, যা কিনা শুরুতে বলা গোয়েবেলসের ফর্মূলা মতো- কী বলা হলো সেটি গুরুত্বপূর্ণ না, কতবার বলা হলো সেটিই মূল কথা।

এখন কথা হচ্ছে সবার পক্ষে কি এই ফর্মূলা প্রয়োগ করা সম্ভব? নাহ্। কখনই না। এটি সম্ভব একমাত্র ‘ফেয়ার-এন্ড-লাভলী’র মতো প্রতিষ্ঠিত ক্যাশ-কাউ ব্র্যান্ডের পক্ষেই, যার বিশাল মার্কেটিং বাজেট আছে এবং সাথে বিশাল একদল লয়াল কনজ্যুমার গ্রুপ আছেন। এই সত্যিটা ইউনিলিভারের তুখোর মার্কেটিয়ারগণ জানেন। আর জানেন বলেই তাঁরা এর সুবিধাটাও নিচ্ছেন একদম ঠিকঠাক মতন, চমৎকার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে।

বলেছিলাম না আমার চেয়ে অনেক অনেক তীক্ষ্ণ এবং অনেক বেশী তুখোর মার্কেটিয়ারগণ ইউনিলিভারে কাজ করছেন। তাইতো এরকম যুক্তিহীন অদ্ভুতুরে কথাবার্তা দিয়েও মানুষকে পটিয়ে সেলস্ তুলে আনতে পারেন। তাইতো বলি, আমাদের আম-মার্কেটিয়ারদের শেখার আছে অনেক কিছুই তাঁদের থেকে। 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button