অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

সফলতার যে গল্পগুলো শুরু হয়েছিল ব্যর্থতা দিয়ে

ধৈর্য আর অধ্যবসায় মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে পৃথিবীতে। দু’একবার ব্যর্থ হলেই হাল ছেড়ে দিই আমরা অনেকেই। ভাবি, আমি অন্যের মতো মেধাবী নই বা আমি অন্যদের মতো ভাগ্যবান নই, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। এই ভাবনাটাই আমাদের সফলতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। যে এই বাধা ডিঙ্গিয়ে যেতে পারবে, সাফল্যের সিঁড়ি তো তার জন্যই। এমনই, প্রথম জীবনে ব্যর্থতা দিয়ে শুরু কিন্তু একসময় এসে সাফল্যের সিঁড়ি খুঁজে পেয়েছিলেন, উঠেছিলেন সফলতার উচ্চ শিখরে- এমন দশজন ব্যক্তিত্বের কথা চলুন জেনে আসি।

আব্রাহাম লিংকন 

১৮৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পূর্ব পর্যন্ত জীবনের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপেই ব্যর্থ হয়েছেন আব্রাহাম লিংকন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে ১৮৩২ সালে চাকরি হারিয়ে রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে তার। কিন্তু রাজনীতিতে প্রবেশ করে আইনসভার প্রথম নির্বাচনেই পরাজয় ঘটে তার। এরপর জীবনের বাঁকে বাঁকে আরও অনেক নির্বাচনে তার পরাজয় ঘটে। ব্যবসা করতে গিয়ে ব্যর্থ হন, প্রিয়তমা বাগদত্তাকে হারান, স্নায়ুবৈকল্যের শিকার হন…আরও কত ব্যর্থতা। শেষ পর্যন্ত, ১৮৬০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন লিংকন। হয়ে ওঠেন আমেরিকার অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট।

জে.কে. রাউলিং 

আমেরিকার নবম সর্বাধিক বিক্রিত বই “হ্যারি পটার” এর লেখিকা জে.কে.রাউলিং। প্রথম সন্তান জন্ম দেবার পরই স্বামী পরিত্যক্তা হন তিনি। চাকরি ছিল না, ছিলেন সরকারী ভাতার উপর নির্ভরশীল একজন সিঙ্গেল মাদার। তার লেখা হ্যারি পটার সিরিজের প্রথম বইটি ১২ জন প্রকাশকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়। আজ ৫২ বছর বয়সে তিনি মিলিয়ন ডলারের মালিক এক হ্যারি পটার সিরিজের বইয়ের কল্যাণে।

স্টিভেন স্পিলবার্গ 

ডিসলেক্সিয়া রোগে আক্রান্ত স্টিভেন স্পিলবার্গ স্কুল ছেড়েছিলেন পড়তে পারার অক্ষমতার কারণে। বয়স ৬০ বছর হওয়ার আগে জানতেই পারেননি তার এ রোগ ছিল। সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া স্কুল অব সিনেমাটিক আর্টস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য তার আবেদন তিন বার নাকচ করা হয়। অথচ, এখন তিনি ইতিহাসের অন্যতম সফল নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃত। চলচ্চিত্রের সব বড় বড় পুরস্কার আর সন্মাননা লাভের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি অর্থ উপার্জনকারী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন তিনি।

সইচিরো হোন্ডা 

পেশা জীবনের শুরুতে টয়োটা কোম্পানিতে চাকরির চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন জাপানের সইচিরো হোন্ডা। তার ডিজাইন করা মোটরসাইকেলের একটি পার্টসের কারণে সহকর্মীদের টিটকারির স্বীকারও হয়েছিলেন কর্মজীবনের প্রথমদিকে। তার প্রতিষ্ঠিত ফ্যাক্টরি তিন তিনবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। প্রতিবারই তিনি ভেঙে না পড়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। নতুন করে দাঁড় করিয়েছেন নিজের ফ্যাক্টরি। ছোট্ট কাঠের সাইকেল ফাক্টরির কারিগর থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের সেরা একটি বহুজাতিক মোটরযান ও মোটরসাইকেল তৈরির কারখানার প্রতিষ্ঠাতা। তার প্রতিষ্ঠিত হোন্ডা করপোরেশনে বর্তমানে দশ হাজারেরও বেশি মানুষ কর্মরত রয়েছে।

ওয়াল্ট ডিজনি 

যথেষ্ট সৃজনশীল নয় বলে এক সংবাদ সংস্থায় ইলাস্ট্রেটর হিসেবে কর্মরত ওয়াল্ট ডিজনির চাকরি চলে গিয়েছিল। ১৯২১ সালে তিনি তার ভাইয়ের সাথে হলিউডে রয় ষ্টুডিও নামে একটি প্রযোজনা সংস্থা গড়ে তোলেন। তার প্রথম প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থাটি হারিয়ে তিনি দেউলিয়া হয়েছিলেন। তার মিকি-মাউস তৈরির আইডিয়া আমেরিকার সেসময়ের শীর্ষস্থানীয় এমজিএম মিডিয়া কোম্পানি দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল একটা কথা বলা ইঁদুরের ধারণা তাদের কাছে ঠিক যুতসই মনে হয়নি বলে। আজ ওয়াল্ট ডিজনির মৃত্যুর ৫১ বছর পরেও কে না জানে তার নাম!

ভিনসেন্ট ভ্যান গগ 

চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগ চরম হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কিছুদিন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে মানসিক হাসপাতালেও চিকিৎসা নিয়েছেন। ‘তার জীবন পুরোপুরিই ব্যর্থ’ এই ধারণা থেকে বের হতে পারেননি বলে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩৭ বছর বয়সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন ভ্যান গগ। বেঁচে থাকতে নিজের অঙ্কিত শিল্পকর্ম তিনি বিক্রি করতে পারেননি। অথচ বর্তমানে তার একেকটি শিল্পকর্ম মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়।

জিম ক্যারি 

মার্কিন অভিনেতা জিম ক্যারি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরিবারকে সাহায্য করার জন্য কিশোর বয়সে তিনি একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। স্টিভেন স্পিলবার্গের মত তিনিও ডিসলেক্সিয়া রোগে আক্রান্ত ছিলেন বলে ঠিকমত পড়াশুনা করতে পারতেন না এবং তার বন্ধুর সংখ্যাও ছিল খুব কম। জিম ক্যারি বর্তমানে আমেরিকার সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতাদের একজন। প্রতিটি সিনেমায় অভিনয় করার জন্য তিনি পারিশ্রমিক নেন কত জানেন? ২০ মিলিয়ন ডলার!

কর্ণেল স্যান্ডার্স 

কর্ণেল স্যান্ডার্স একেবারেই কপর্দকহীন হয়ে পড়েছিলেন ৬৫ বছর বয়সে যখন তার রেস্টুরেন্টের ব্যবসায় ধ্বস নামে এবং রেস্টুরেন্টটি বিক্রি করে দিতে হয়। এরপর দু’বছর যাবত তিনি তার গাড়িতে ঘুমিয়েছিলেন এবং রেস্টুরেন্ট মালিকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন তার চিকেনের রেসিপি বিক্রির জন্য। ১,০০৯ বার তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন রেস্টুরেন্ট মালিকদের কাছ থেকে। ১,০০৯ বার! হাল ছাড়েননি তবুও। আর হাল ছাড়েননি বলেই তার নয় বছর পর তার রেসিপির চিকেন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ৬০০ রেস্টুরেন্টে বিক্রি হয়েছিল। তিনি কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেন(কেএফসি) বিক্রি করেছিলেন ২ মিলিয়ন ডলারে!

ফার্ডিনেন্ড আলেক্সান্ডার পোর্শে  

একজন জার্মান মোটরভেহিকল ডিজাইনার আলেক্সান্ডার পোর্শে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইন থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন যথেষ্ট মেধাবী নন বলে। তার করা প্রথম ডিজাইন তাদের কোম্পানির ডিজাইন ডিরেক্টর বাতিল করে দিয়েছিল। এরপরই পোর্শে ৯১১ কারটির ডিজাইন করেন, যেটি আজও সর্বাধিক বিক্রিত কারের তালিকায় জায়গা করে আছে।

অপরাহ উইনফ্রে 

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের রাজ্য মিসিসিপির নিভৃত পল্লীতে এক অবিবাহিত মায়ের ঘরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন অপরাহ উইনফ্রে। তিনি নয় বছর বয়সে ধর্ষিত হন। চৌদ্দ বছর বয়সে পুনরায় ধর্ষিত হন এবং অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। বাড়ি থেকে পালিয়ে যান এবং এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। সেই সন্তানটিও জন্মের কিছুদিন পরেই মারা যায়। এত কিছুর পরেও তিনি হেরে যাননি। সকল প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তিনি হয়েছেন বিশ্বের প্রথম আফ্রো-আমেরিকান বিলিওনিয়ার। তাকে বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী নারীদের একজন বলে বিবেচনা করা হয়।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button