অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

টানা ৪৯টি ট্রেন চলে গিয়েছিল পায়ের উপর দিয়ে, অতঃপর এভারেস্ট জয়ের গল্প!

লাক, মিরাকল বা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন? করে দেখতে পারেন যে কোন একটাতে। বিশ্বাস অনেক দূরে নিয়ে যেতে পারে আপনাকে। এগুলা কেন বলা?

১১ এপ্রিল ২০১১ সাল। ইন্ডিয়ার উত্তর প্রদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে অরুনিমা সিনহা লাক্ষ্ণো থেকে দিল্লি যাবার ট্রেন ধরেছিল৷ ২৩ বছরের ছোট মেয়েটা ততদিনে ন্যাশনাল ভলিবলে চ্যাম্পিয়ন। এবার পরিবারের জন্য কিছু একটা করতে হবে। আর এ চিন্তাতেই “সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স” এর চাকরির পরীক্ষা দিতে ট্রেনে উঠেছিল। শরীরে গহনা তেমন আহামরি কিছুই নেই, গলায় শুধু একটা ছোট সোনার চেইন। রাতের সেই ট্রেনে কিছু মানুষের আড়ালে থাকা শয়তানের নজর পড়েছিল সেই গলার চেইনে। চেইনটা ছিনিয়ে নিতে চাইলো। জাত খেলোয়াড় সহজে দিতে চাইলো না চেইনটা৷ তার উপর মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সেই স্বর্ণের চেইনটার দাম যে অনেক৷ জোরাজুরির এক পর্যায়ে তাকে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে চেইনটা নিয়ে নিল। এতগুলো লোক ছিল সে রাতের ট্রেনে, তবুও কেউই কিছু বললো না।

অরুনিমা যখন ট্রেন থেকে পড়ে যায়, ঠিক তখনই পাশের লাইন দিয়ে আরেকটা ট্রেন ক্রস করছিল। উঠে লাইন থেকে সরে যাবে সেই সময়টাও পায় নি। তার আগেই পায়ের উপর দিয়ে ট্রেন চলে গেছে৷ কিছুক্ষন জ্ঞান ছিল না। যখন আবার জ্ঞান ফিরে পেল, শরীর প্যারালাইজড হয়ে গেছে। এক পা কাটা পড়েছে অন্য পায়ের হাড় চূর্ন-বিচুর্ন হয়ে গেছে৷ অরুনিমার মনে হচ্ছিল সে সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল৷ কিন্তু সে জানে না সে চিৎকার বাহিরে পৌছেছে কিনা। মাথা কাজ করছিল, কিন্তু শরীর সায় দিচ্ছিল না। আচ্ছা ধারণা করতে পারেন ঠিক কয়টা ট্রেন গেছে সে রাতে তার উপর দিয়ে? একটা দুইটা না ৪৯ টা ট্রেন প্যারালালি গিয়েছিল সে রাতে৷ অনূভুতিহীন হয়ে পরেছিল৷ শুধু ট্রেন গেলে ভাইব্রেশনটা বুঝতো। প্রতিটা ট্রেন যাবার সময় পায়ের হাড়গুলো বের হয়ে যেতে চাইতো। অরুনিমা তবুও বেঁচে ছিল৷ কারণ তাকে বাঁচতেই হতো।

সকাল হলে পরে অথর্ব এই শরীরটাকে গ্রামবাসীরা হাসপাতালে নিয়ে আসে৷ প্রথমে ডাক্তাররা বলে হসপিটালে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই, রক্ত নেই। তার চিকিৎসা হবে না। তখন ডাক্তারকে শুধু একটা কথাই বলতে পেরেছিল, “আমার পা দুটি কেটে গেছে”। তার কথায় কী ছিল সেও জানে না। কিন্তু তারপর সেই ডাক্তাররা নিজেরাই রক্ত দিয়েছিল অরুনিমার জন্য৷

জানাজানি হয়ে যায় বাচ্চা মেয়েটা ন্যাশনাল লেভেল প্লেয়ার। তাকে আরো ভাল চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয় সরকার৷ সাত দিন পর যখন একটু ভাল অবস্থায় পৌছে টিভি আর পত্রিকায় দেখে তাকে নিয়ে অনেক উল্টো-পালটা বলা হচ্ছে, লিখা হচ্ছে। পত্রিকা বলছে তাকে কেউ ধাক্কা দেয় নি। সে নিজেই আত্মহত্যা করতে চেয়েছে। পুলিশ রিপোর্ট বলেছে, “হয় সে আত্মহত্যা করতে চেয়েছে বা রেল লাইন পার হতে গিয়ে দূর্ঘটনায় পড়েছে। তাকে ধাক্কা দেয়া হয়নি”। প্রচন্ড রাগ জমেছিল। সেদিন সেই হাসপাতালের বিছায় শুয়েই সে বলেছিল, “যেহেতু ভগবান আমাকে বাঁচিয়েই রেখেছে, সুতরাং আমাকে নিয়ে তার কোনো একটা আশা তো আছেই। আমি এবার মাউন্টেরিয়ান হবো। চড়বো এভারেস্টের চূড়ায়।”

লোকে গালাগাল করেছে, কাছের লোকেরা অনেকভাবে বুঝিয়েছে৷ কারণ পা ছাড়া পাহাড় চড়তে চাওয়া পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছুই না। অনেকেই বলেছে, “ন্যাশনাল লেভেলের প্লেয়ার ছিলে, সরকারের অনুকম্পা নিয়ে বাকিটা জীবন কাটিয়েই দাও না বাপু! কী দরকার এসবের? অলরেডি তো জব আর অনুদান আসা শুরুই হয়েছে৷” কিন্তু পরিবার আর বিশেষ করে ভাই সমর্থন দিয়ে গেছে তাকে৷ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে নিজের বাড়িতেও যায় নি প্রথমে। সোজা গিয়েছে ১৯৮৪ সালে প্রথম ইন্ডিয়ান নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করা বেসেন্দ্রী পালের কাছে। তার ইচ্ছের কথা শুনে বেসেন্দ্রী পাল শুধু বলেছিল, “পাগলী তুই যে এ অবস্থায়ও এভারেস্টে চড়ার স্বপ্ন দেখেছিস, তোকে আর ঠেকায় কে? এখন তো শুধু তোর সার্টিফিকেটে ডেট উঠানো বাকি।”

আস্তে আস্তে ট্রেনিং শুরু হয়। কঠিন ছিল সময়টা। কারণ একটা পায়ে প্রস্থেটিক লেগ বসানো, অন্যটায় লোহা বসানো। যেখানে অন্য ক্লাইম্ভাররা পাঁচ মিনিটে পৌছে যেত৷ সেখানে তার লেগে যেত দুই-আড়াই ঘন্টা। সবাই তবুও সমর্থন দিতো, “সমস্যা নেই, তুমি আস্তে আস্তে আসো” বলে। কিন্তু মনে জিদ চেপেছিল পাহাড় শাসনের৷ নিজেকে বারবার বলেছিল বাকিদের সাথে স্পিড ম্যাচ করতেই হবে যেকোনো ভাবে৷ একটা সময় সেটাও হয়ে গেল। শুধু হলোই না। অন্যদের অনেক আগেই দেখা যেত পৌছে যেত। এবার বাকিরা তাকে প্রশ্ন করতো “তুমি কী খাও? পা নেই তবুও এত স্পিড কিভাবে আসে?” অরুনিমা হাসতো৷

অরুনিমা এবার এভারেস্টে উঠার জন্য তৈরি ছিল৷ কিন্তু স্ট্রাগল এখনো শেষ হয় নি। কারণ তার স্পন্সর লাগবে এভারেস্ট জয় করতে। কিন্তু এই পায়ের উপর কেউই ভরসা করে না। শেষে স্পন্সর পেলেও কোনো শেরপা তাকে নিতে চায় না। সবার এক কথা- একে নিলে তারাও মারা পরবে এভারেস্টে। একসময় সেটাও জোগাড় হয়।

শুরু হয় এভারেস্ট জার্নি। প্রথম তিন ক্যাম্প মোটামুটি ভালই ছিল। সবার আগেই ছিল সে৷ কিন্তু তার পরেই শুরু হয় সমস্যা৷ টিভিতে যে ব্লু আইস দেখা যায়, সেরকম আইসের স্তর শুরু হয় সেখান থেকে। তার ভাষায়, “যতটা সুন্দর দেখা যায় তার থেকেও কয়েক গুন বেশি ঝুকিপূর্ণ সেটা।” যখনই ডানপায়ের প্রস্থেটিক লেগে স্টেপ করে বাম পায়ে ব্যথা শুরু হয়৷ সেটা তবুও মানা যায়, কিন্তু পা বারবার পিছলে যাচ্ছিল। যে কোনো সময় পড়ে যাবার মত অবস্থা। টিম লিডার বলে অরুনিমা নিজের সাথে জবরদস্তি না করে তুমি নেমে যাও৷ উত্তরে সে বলে, “আমার পা আমি জানি কিভাবে হ্যান্ডেল করতে হবে”।

 

এভাবে করেই উপরে উঠা হচ্ছিলো। কিছুদিন যেতেই দেখে মানুষের মৃত দেহ। সবাই এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন দেখা। অক্সিজেনের অভাবে বা কোনো দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া। সেখানে একজন বাংলাদেশীকেও দেখতে পায় সে। শরীরে প্রান অল্প একটু তখনো ছিল। কিন্তু কিছুই করার নেই তার। ভয়ে শরীর অবশ হয়ে আসে৷ ১০-১৫ মিনিট আর কিছুই করতে পারে না সে। তারপর তার টিমের বাকি ছয়জনের দিকে তাকিয়ে বলে, “যদি তোমরা সবাই এভারেস্ট জয় করতে পার তাহলে তো খুবই ভাল। কিন্তু যদি একজনও না পার, তবে মনে রেখ আমি তোমাদের হয়ে এভারেস্ট জয় করেই ফিরছি।” এভাবে করে যখন প্রায় হিলারি স্টেপ সাউথ সামিটের কাছাকাছি পৌছে গেছে তখন তার শেরপা তাকে বলে, “অরুনিমা তুমি নিচে নেমে যাও, তোমার অক্সিজেন শেষের দিকে।” জবাব ছিল, “আমি নামবো না।” বারবার টিম লিডারকে বলে গেছে হিলারি স্টেপের পরেই এভারেস্ট স্টেপ। টার্গেটের এত কাছে এসে হার মানতে সে পারে না। সে বলেছিল; “সবার জন্য গোল্ড চান্স বারবার আসে না। আর এই গোল্ড চান্স আমি ছাড়ছি না। আমি জানি কত কষ্টে আমার স্পন্সর মিলেছে। যদি আজ আমি নেমে যাই তাহলে আমি জানি আমি আর স্পন্সর পাচ্ছি না কখনো।” তবুও শেরপো না মানলে এবার নিজেই এক স্টেপ আগে বাড়িয়ে দেয়। ততক্ষনে শেরপাও বুঝে নেয় এই মেয়ে থামার জন্য আসে নি। এর ঠিক দেড় ঘন্টা পর সকাল ১০.৫৫ মিনিটে এভারেস্টের চূড়ায় নিজের পায়ের চিহ্ন ফেলে অরুনিমা সিনহা। সবাই ছবি তুলছিল নিজেদের। অরুনিমাও এবার শেরপাকে বলে আমারও ছবি তুলে দাও৷ নিজের জাতীয় পতাকার সাথে। শেরপা বলে, ছবি তুলতে হবে না তোমার অক্সিজেন শেষ দিকে তুমি তাড়াতাড়ি নাম। তার কথা সে ছবি তুলবেই। জোরাজুরিতে শেষে ছবি তুলে দেয়। এবার অরুনিমা আবার বলে এবার ভিডিও কর। শেরপা এবার রেগে যায়। অরুনিমার জোরাজুরিতে ভিডিও করে দিতে হয়৷ পরে বলে, “আমি জানি না আমি বেঁচে নামতে পারবো কি না। কিন্তু আমি মরে গেলে এই ভিডিও আমার দেশে পাঠিয়ে দিও৷ সবাই যেন জানে আমি এই বিশ্বের সবচেয়ে টপে ছিলাম”।

এভারেস্টে উঠার থেকেও ভয়াবহ নামাটা। কারন সবচেয়ে বেশি মৃত্যু এই নামতে গিয়েই হয়৷ এদিকে অরুনিমার অক্সিজেন প্রায় শেষ। নামার পথে কিছুদূর যেতেই তার অক্সিজেন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়৷ সে পুরোপুরি পড়ে যায়। আর চলার মত অবস্থায়ও থাকে না। শেরপা বারবার তাকে সাহস দিলেও কিছুই হয় না। কারন অক্সিজেনের অভাবে শরীর একদমই নড়ছিল না। ভাগ্য খেলে গেছে সেখানেই। যখন ভাবছিল এই বুঝি মৃত্যু আসন্ন, তখনই এক ব্রিটিশ মাউন্টেইনার সেখানে আসে৷ যার কাছে এক্সট্রা অক্সিজেন ছিল। ততক্ষনে দিনের ১১টার বেশিও বেজে গেছে৷ আর ১১টার পর কেউ এভারেস্টে উঠে না বিপদজ্জনক বলে৷ তাই সে ব্রিটিশ মাউন্টেইনার নিচে নেমে যাচ্ছিল সেদিনের মত৷ তখন সেই মাউন্টেইনার তাকে তার এক্সট্রা এক্সিজেন দিলে সেটার সাহায্যেই নিচে নেমে আসে৷ সবাই অরুনিমাকে লাকি বলছিল। কিন্তু অরুনিমা বলেছিল, “আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি না। আমি শুধু জানি তুমি যেটা বিশ্বাস করবে তোমার বডিও সেভাবেই জেনারেট হবে।”

অরুনিমা তারপর থেকে শুধু বিশ্বজয়ই করেছে। এশিয়ার এভারেস্ট হয়ে আফ্রিকার কিলামানজারো, ইউরোপের আলবারুস সহ একে একে জয় করেছে সকল শৃঙ্গ। আর সর্বশেষ এ বছরের ৪ জানুয়ারি এন্টার্টিকার মাউন্ট ভিনশন জয় করে নিজের সামিট কমপ্লিট করেছে৷ আর সাথে সাথে হয়েছে এক রেকর্ডের ভাগিদার। প্রথম পঙ্গু নারী হিসেবে মাউন্ট এভারেস্ট ও মাইন্ট ভিনশন জিতেছে। এই এচিভমেন্টটা কত বড় সেটা হয়তো আপনি-আমি আন্দাজও করতে পারবো না।

ব্যক্তিগত ট্রফি ক্যাবিনেট হয়েছে ভারী৷ পেয়েছে পদ্মশ্রী এওয়ার্ড। ২০১৫ ও ২০১৬ দুই বছর পেয়েছে তেনজিং নোরগে ন্যাশনাল এডভেঞ্চার এওয়ার্ড, গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট এওয়ার্ড পেয়েছে ২০১৮ সালে। তাছাড়া ২০১৮ সালে ইউনিভার্সিটি অফ স্ট্রেথক্লাইড, গ্লাসগো থেকে পেয়েছে ফার্স্ট লেডি এওয়ার্ড৷

শুরুতে বলেছিলাম মিরাকেল, লাক বা ঈশ্বরে বিশ্বাসের কথা। এমনিতেই বলেছিলাম। নিজের উপর বিশ্বাস করুন। হার্ড ওয়ার্ক আর ডিটারমিনেশন অভিয়াসলি পেইড এনাফ। কখনো যদি মনে হয় আপনি শেষ বা আপনাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না শুধু অরুনিমা সিনহার দিকে তাকান। ১১ ই এপ্রিল ২০১১ সালে ২৩ বছরের যে মেয়েটা দুই পা হারিয়েছিল সেই মেয়েটাই ২১ মে ২০১৩ সালে মাত্র দুই বছরের মাথায় দুনিয়ার সবচেয়ে উচু পর্বত জয় করেছিল। তার ভাষায়, “এভারেস্টের চূড়ায় আমি অনেক জোরে চিৎকার করতে চেয়েছিলাম তাদের উদ্দেশ্যে, যারা বলেছিল আমি পারবো না, যারা আমাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে রখতে চেয়েছিল। যারা চেয়েছিল আমি স্টেট গভার্নমেন্টের অনুকম্পায় বেঁচে থাকি।”

লাস্ট বাট নট দ্যা লিস্ট। যে পুলিশ বলেছিল এটা আত্মহত্যা চেষ্টা ছিল, যে পত্রিকা বলেছিল তাকে মতের অমতে বিয়ে দেয়া হচ্ছিলো বলে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। তাদের এক হাত দেখে নিয়েছিল অরুনিমা সিনহা। এই রিপোর্টকে সরাসরি প্রত্যাখান করে আদালতে গিয়েছিল। হাইকোর্টের রায়ে তাকে ধাক্কা দেয়া হয়েছিল এটাই প্রমান হয়েছিল। এবং তাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে কে পাঁচ লক্ষ রূপি দিতে বলা হয়েছিল। ইন্ডিয়ান রেলওয়ে তাকে শুধু ক্ষতিপূরণই না যে জবের এক্সাম দিতে সেদিন যাচ্ছিলো সেই জবও তাকে অফার করা হয়।

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button